হালদা: অন্য ভূবনে আড়াই ঘণ্টা

এক ডিসেম্বর, সকাল হতে না হতেই সিনেমাহলগুলোর মুখে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। প্রত্যেকের একটাই অপেক্ষা ‘হালদা’র প্রথম শো কখন শুরু হবে! দূর থেকেই টিকেটের জন্য দর্শকদের লাইন দেখা যায়। টিকিট হাতে অবশেষে হল-এ ঢোকার সৌভাগ্য হলো।

হালদা সিনেমার প্লট নিয়ে পরিচালক কিংবা কলাকুশলীদের কখনই আলোচনা করতে শোনা যায়নি। পুরোটাই একটা রহস্যের জালে বেঁধে রাখতে চেয়েছে সম্পূর্ণ হালদা টিম। সেই জাল যে জেলেদের জালের মতই শক্ত করে দর্শকদের টেনে নিয়ে গিয়েছে হলের দিকে তার প্রমাণ মিলেছে আজ সকালেই।

অপেক্ষার প্রহরে ইতি টেনে অবশেষে স্ক্রিনে জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠলো। সবার মুখে আনন্দের হাসি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাতীয় সঙ্গীত শেষ হতেই, পর্দা কালো হয়ে শুরু হলো ‘হালদা’। তীব্র আনন্দের নীরব চিৎকার বেজে উঠলো মনে।

তৌকির আহমেদ হালদা বিষয়ক আলোচনা করতে অনেকগুলো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। প্রতিটি সাক্ষাতৎকারেই একটি বাক্য ধ্রুব ছিলো, ‘হালদা সিনেমায় নদী এবং নারী এই দু’টি চরিত্রে একটা মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।’ শুরু থেকেই এই বাক্যটা মনে হতে লাগলো এবং পুরোটা সিনেমাজুড়েই খুঁজেছি সেই বাক্যের স্বার্থকতা।

হালদা সিনেমার মূল প্রেক্ষাপট হালদা তীরবর্তী মানুষ এবং তাদের জীবন-যাপন ঘিরে তৈরি করা। হালদা নদীটি এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস প্রজনন কেন্দ্র। যেই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক জনবসতি। সেই নদী বিপর্যয়ের ঘটনার সাথে লেখক হাসু নামের একজন নারীর তুলনা করেছেন।

এই প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা হাজার শিল্প-কারখানা, ইটের ভাটা যার ফলে হচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এর এরই সমন্বিত একটি রূপ ফুঁটে উঠেছে হালদা সিনেমায়। পরিচালক তৌকির আহমেদ এর নিখুঁত পরিচালনায় সিনেমার বিষয়বস্তু সত্যিই অসাধারণভাবে ফুঁটে উঠেছে।

 

তৌকির আহমেদ এর সেই ধ্রুব উক্তির যথার্থতা ধরতে পেরেছি একেবারে সিনেমার শেষে। পুরোটা সিনেমা জুড়েই ছিলো এক ঘোর লাগা বিষ্ময়। যেমনটা জাহিদ হাসান বলেছিলেন, ‘হালদা সিনেমার আড়াইঘন্টা আপনি একটি অন্যভূবনে চলে যাবেন।’ সত্যিই একটি অন্যরকম ভূবনে চলে গিয়েছিলাম।

সিনেমার প্রথম দৃশ্যটাই যেন ছিলো একটি বিস্ফোরকের মত। আহা জীবন, কত ভালোবাসাবাসি, নোনা জলে নোনা জলে কত হাসাহাসি। পুরোটা সিনেমা দেখার পর এই লাইনটি আশা করি কোনো দর্শকের মন থেকেই উড়ে যেতে পারবে না। শেষ দৃশ্য দেখার পর আপনার হল ছেড়ে উঠে যেতে ইচ্ছে না-ও হতে পারে। শক্তিশালী সংলাপ ব্যবহারে সিনেমাটি আরো বেশি আকৃষ্ট করতে পেরেছে দর্শককে।

 

এবার  অভিনয় নিয়ে কিছু কথা বলা যাক, ব্যাক্তিগতভাবে জাহিদ হাসানের অভিনয় আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। অভিনয়শিল্পীরা বেশ নিখুঁত অভিনয় চালিয়ে যেতে চেয়েছেন। তিশা’র অভিনয়ে সামান্য কিছু ঘাটতি দেখতে পেয়েছি আমি।

পুরো সিনেমাটি করা হয়েছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। প্রতিটি শিল্পীই আঞ্চলিক ভাষায় অভিনয় করে রীতিমত পর্দা কাঁপিয়ে দিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রেও তিশার ভাষাগত কিছু ত্রুটি ধরা গেছে।

মোশাররফ করিমের অভিনয় এবারও মনোমুগ্ধকর। ফজলুর রহমান বাবু বেশ চমৎকারভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন সিনেমার চরিত্রকে। ঋনাত্মক চরিত্র আমার সবসময়ই পছন্দের। যার কারণে সেই চরিত্রে খুঁত ধরতে চেষ্টা করে বেশি। তবে চেষ্টা একেবারেই বিফলে গেলো। জাহিদ হাসান এতো ভালো অভিনয় করেছেন যে এই চরিত্রে তার কোনো ত্রুটিই আমার চোখে পড়েনি।

মিউজিক ডিস্ট্রিবিউশন বেশ ভালো ছিলো। সঙ্গীত পরিচালক পিন্টো ঘোষ বেশ চমৎকারভাবে সাউন্ড ডিরেকশান দিয়েছেন। সবদিক মিলিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে হালদা সিনেমা নি:সন্দেহে একটি ভালো সিনেমা।

ব্যাক্তিগত রেটিং- ৮/১০

https://www.mega888cuci.com