অথচ, বিশ্বকাপ খেলারই সুযোগ হয়নি তাদের

যত দিন যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের সময় ঘনিয়ে আসছে। ইতালি, চিলি, ন্যাদারল্যান্ড আর যুক্তরাষ্ট্রের মত দলকে ছাড়াই চূড়ান্ত হয়ে গেছে বিশ্বকাপের সময়সূচী। দর্শকদের জন্য ব্যাপারটা হতাশাজনক, তবে বড় দলের বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়ার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে অনেকবার। প্রতিভা কিংবা সামর্থ্য থাকা স্বত্বেও খেলার সুযোগ পায়নি বেশ কিছু জাতীয় দল। এখানে সেরকম দশটা দলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব।

ইংল্যান্ড (১৯৭৪)

৬৬ এর চ্যাম্পিয়নরা ১৯৭০ এর পর থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত কোন মেজর টুর্নামেন্টেই অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়নি, তবে এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যার্থতা হচ্ছে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই না করা। বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে জয় ভিন্ন কোন বিকল্প ছিলনা থ্রি লায়ন্স দের জন্য, কিন্তু ইংল্যান্ডকে ১-১ ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় পোলিশ গোলকিপার ইয়ান টমাসভস্কির অতিমানবীয় প্রদর্শনীর জন্য যাকে খেলার আগে ‘সার্কাস ক্লাউন’ বলেছিলেন ইংলিশ স্ট্রাইকার ব্রায়ান ক্লফ। ওই ম্যাচে পোল্যান্ডের মাত্র দুইটি শটের বিপরীতে ইংল্যান্ড শট নিয়েছিল ৩৬ টি যার মধ্যে শুধু একবারই বল জালে ঢুকতে পেরেছিল ‘টমাসভস্কি দেয়াল’ ভেদ করে।

নেদারল্যান্ডস (১৯৮৬)

বিশ্বকাপে ডাচদের আক্ষেপ আজীবনের। সবসময়ই প্রতিভাবান দল থাকা স্বত্বেও সাফল্য ধরা দেয়নি কমলাদের হাতে। ক্রুইফদের স্মৃতি তখনো ছিল কাঁচা। এর মধ্যেই আশির দশকের মাঝামাঝিতে ন্যাদারল্যান্ড পেয়ে যায় একদল মেধাবি তরুন খেলোয়াড়। মার্কো ভ্যান বাস্তেন, রুদ খুলিত আর ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড এর ত্রিফলা ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয়। আর তারাই কিনা ব্যার্থ হয় ৮৬ বিশ্বকাপে নাম লেখাতে। বিশ্বকাপ প্লে-অফ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বেলজিয়াম। কিন্তু নিজের মাঠে প্লে-অফের দ্বিতীয় লেগে জর্জ গ্রুনের শেষ মুহুর্তের গোলে ছিটকে পড়ে বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব থেকে। পরে অবশ্য এই দলটিই ১৯৮৮ ইউরো জিতে নেয় যেটা তাদের ইতিহাসের একমাত্র বড় সাফল্য।

সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৭৮)

ডায়নামো কিয়েভের হয়ে খেলা ১৯৭৫ ‘ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপ’ জয়ী দলের অনেক খেলোয়াড়ই ছিল ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) দলে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কিংবদন্তি ওলেগ ব্লখিন। কিন্তু বাছাইপর্বের ম্যাচে গ্রিসের সাথে অনাকাঙখিত ১-০ গোলের হারে নয় নাম্বার গ্রুপে হাঙ্গেরির পর দ্বিতীয় হয়ে হারায় চুড়ান্ত পর্বের জায়গা।

ইতালি (১৯৫৮)

৫০ এর দশক ছিল ইতালির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে বছর। ১৯৪৯ সালে প্লেন দুর্ঘটনায় গ্রান্দে তোরিনোর প্রায় সব খেলোয়াড় নিহত হয় যেটার প্রভাব পড়ে ইতালির স্কোয়াডেও। তারপরও তখন পর্যন্ত রেকর্ড দুবারের চ্যাম্পিয়নদেরা বিশ্বকাপে সুযোগ পাবেনা কেউ আশা করেনি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের শেষ রাউন্ডের ম্যাচে ইতালি জিতবে ভাবা হয়েছিল কিন্তু বেলফাস্টে অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্বাগতিক নর্দান আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে যায় ইতালি। ওই সময়টা ছিল ইতালি ফুটবলের ক্রান্তিকাল, বাছাই পর্বের সেই হারের পর আরো প্রায় দুই বছর জয় বঞ্চিত ছিল আজ্জুরিরা।

পর্তুগাল (১৯৯৮)

ষাট এর দশকের ইউসেবিও যুগের পর শুধু একবারই বিশ্বকাপে (১৯৮৬) খেলেছিল পর্তুগাল। এরপর লুইস ফিগো, রুই কস্তা আর পিন্টো দের নিয়ে গড়া পর্তুগালের সোনালী প্রজন্ম নিয়ে এসেছিল বিশ্বকাপে খেলার সবচেয়ে সেরা সুযোগ নিয়ে। কিন্তু বরাবরের মতই ১৯৯৮ তে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যার্থ হয় পর্তুগাল। বার্লিনে জার্মানির সাথে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে রুই কস্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ লালকার্ড দেখালে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল যেটা তাদেরকে বাছাইপর্ব থেকে ছিটকে দেয়। নিজেদের গ্রুপে জার্মানি আর ইউক্রেনের পর তৃতীয় হয় পর্তুগাল। অবশ্য পর্তুগাল এর পরের প্রতিটা বিশ্বকাপই খেলেছে কিন্তু ১৯৯৮ এ খেলতে না পারাটা অঘটনই ছিল।

ইংল্যান্ড (১৯৯৪)

৯২ ইউরোর গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েও কোনরকমে চাকরিচ্যুত হওয়া থেকে রেহায় পান ততকালীন ইংল্যান্ড কোচ গ্রাহাম টেইলর, কিন্তু ১৯৯৪ বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই করতে ব্যার্থ হওয়ায় আর ভাগ্য সহায় হয়নি তার। কোয়ালিফাইং রাউন্ডে নরওয়ে আর হল্যান্ডের সাথে হারে ইংল্যান্ড। তবে সবচেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে ইংল্যান্ড যখন গ্রুপের সবচেয়ে দুর্বল দল সান মারিনোর কাছে ম্যাচের শুরুতে গোল খেয়ে বসে। গ্রুপে তৃতীয় হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যার্থ হয় ইংল্যান্ড।

যুগোস্লাভিয়া (১৯৯৪)

শুধু বিশ্বকাপ না, নিষেধাজ্ঞার কারণে সেবার বাছাইপর্বেও অংশগ্রহণ করতে পারেনি যুগোস্লাভিয়া । ওই অঞ্চলে তখন চলছিল গৃহযুদ্ধ; যেটা পরে যুগস্লাভিয়াকে বসনিয়া ও হার্জেগুভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া সহ আরো বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে। কিন্তু কলহ চলাকালীন সময়ে যুগোস্লাভিয়া ছিল বিশ্বের সেরা একটি দল। সে দলে ছিলেন দেভর সুকের, ভনিমির বোবান, ড্রাগান স্টোচকোভিচ, সিনিসা মিহাজলোভিচ, রবার্ট প্রসিনেচকি এর মতো তারকারা। এদের বেশিরভাগই ছিলেন মূলত ১৯৯১ এর ইউরোপীয়ান কাপ (বর্তমান উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জয়ী দল রেড স্টার বেলদ্রেড এবং ১৯৮৭ যুব বিশ্বকাপ জয়ী যুগোস্লাভিয়া দলের সদস্য। এই দলটি ১৯৯২ ইউরোর অন্যতম ফেভারিট ছিল, কিন্তু সেই টুর্নামেন্টও খেলা হয়নি যুদ্ধের কারণে। ১৯৯৮ তে যুগোস্লাভিয়ে থেকে বের হওয়া ক্রয়োশিয়া সেমিফাইনাল খেলে যেটা ততকালীন যুগোস্লাভিয়া দলের শক্তিমত্তা সম্পর্কে ধারনা দেয়, তাই ১৯৯৪ তে এই দলের বিশ্বকাপ না খেলা ছিল অনাকাঙখিতই।

নেদারল্যান্ডস (২০০২)

ক্লুইভার্ট, এজার ডেভিডস, ক্লারেন্স সিডর্ফ, রুদ ভ্যান নিস্টলরয়, স্টেম, ভ্যান ডার বার্ট দের মত প্রতিভাবান আর অভিজ্ঞ প্লেয়ারে পরিপূর্ণ একটি দল। আগের বিশ্বকাপ ও ইউরোর সেমিফাইনালিস্ট। সেই দল কিনা ব্যার্থ হয় বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে। ডাচদের যেন নিয়তিই এটা। সেবার লুইস ফন হাল এর দল বাছাই পর্বের গ্রুপে তৃতীয় হয়। আয়ারল্যান্ডের সাথে গ্রুপ নির্ধারণী ম্যাচে নিজেদের মাঠে ১-০ গোলে হারে অরেঞ্জরা। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ছিল পর্তুগাল।

স্কটল্যান্ড (১৯৭০)

ষাটের দশকের শেষের দিকে আর সত্তরের শুরুর দিকে স্কটল্যান্ড ছিল সমীহ করার মত দল। ১৯৬৭ তে সেলটিক আর ১৯৭২ এ রেঞ্জারস ইউরোপিয়ান কাপ জিতে। দুই গ্লাসগো জায়ান্টের সেরা প্লেয়ারদের নিয়ে গড়া ছিল স্কটিশ স্কোয়াড, সাথে ছিল ইংল্যান্ড এ খেলা ডেনিস ল’ আর বিলি ব্রেমনার দের মত তারকা। কিন্তু হামবার্গে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানীর সাথে ধ্রুপদী লড়াইয়ে ৩-২ গোলে হেরে গ্রুপ রানারআপ হয়ে বাছাই থেকে বাদ পড়ে স্কটল্যান্ড।

ফ্রান্স (১৯৯৪)

সেই ফ্রান্স দলে খেলছিলেন পিয়েরে পাপিন, এরিক ক্যান্টোনা, দিদিয়ের দেশম, মার্সেল ডিসলিদের মত তারকারা। বুলগেরিয়া আর সুইডেন সমৃদ্ধ গ্রুপ অফ ডেথে পড়া ফ্রান্স অবশ্য প্রথম আট ম্যাচের সম্ভাব্য ১৬ পয়েন্টের মধ্যে ১৩ পয়েন্টই নিয়ে বিশ্বকাপের টিকেট অনেকটা নিশ্চিতই করে ফেলেছিল। শেষ দুই ম্যাচে লাগত একটা ড্র, তার মধ্যে আবার একটি প্রতিপক্ষ দুর্বল ইজরাইল। দুটা ম্যাচই ছিল নিজেদের মাঠে। সব ক্রাইটেরিয়া নিজের পক্ষে থেকেও শেষ দুই ম্যাচেই ইনজুরি টাইমের গোলে হেরে বসে ফ্রান্স। স্কোরালাইন – ফ্রান্স ২-৩ ইজরাইল, ফ্রান্স ১-২ বুলগেরিয়া। ফলাফল সুইডেন ও বুলগেরিয়ার পর তৃতীয় হয়ে বাছাইপর্ব থেকে বিদায়। পরে এই দুই দলই সে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলে। তবে এটাই হয়ত বাছাইপর্ব হতে কোন শক্তিশালী দলের সবচেয়ে নাটকীয় বিদায়। ফ্রান্স চার বছর পর নিজের দেশে বিশ্বকাপ জেতে।

https://www.mega888cuci.com