একটি ইতিহাস কাঁপানো ঝুঁকি

‘আমাকে ১০ টুকরা কাঠ আর জিদান দাও, আমি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ফেলবো।’ বিখ্যাত কথাটা ফুটবলার জিনেদিন জিদানের সম্পর্কে বলেছিলেন কিংবদন্তিতুল্য কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন!

একটা দেশকে একাই কিভাবে বিশ্বকাপ জেতাতে হয় রঙিন পর্দায় সেটা বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিলেন জিনেদিন ইয়েজিদ জিদান।

৯৮ সালের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত রোনালদোর ব্রাজিলকে ফাইনালে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিলেন, ০৬ সালের বিশ্বকাপে দলকে টেনে তুলেছিলেন ফাইনালে, বিখ্যাত ‘ঢুঁস’ কাহিনী না হলে হয়তো সেবারো শিরোপা টা ফ্রান্সের শোকেসেই যেতো। তবে কোয়ার্টারে রোনালদিনহো, কাকা, রোনালদোদের অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিলকে একাই হারিয়েছিলেন, সেমিফাইনালে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ফিগো, ডেকো, ক্রিশ্চিয়ানোদের সোনালী প্রজন্মের পর্তুগালকে!

এরপর ফুটবল ছেড়েছেন কিন্তু আদতে ফুটবল ছাড়া থাকেননি, খেলোয়াড়ী জীবন ছেড়ে কোচিংয়ে হাত দিয়েছিলেন, আর বাজিমাৎ টা এখানেও করেছেন। ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের যখন বাজার মন্দা, দলের বাজে অবস্থা, ফুটবলারদের ফর্মহীনতা, কোচের সাথে খেলোয়াড়দের মন কষাকষি। লা লিগায় অন্য দলগুলোর চেয়ে ঢের পিছিয়ে ছিলো, কোচের ভুল সিদ্ধান্তে কোপা দেল রে থেকে নিষিদ্ধ গ্যালাকটিকোরা। স্বভাবতই তাই কোচের পদ থেকে বরখাস্ত হলেন রাফায়েল বেনিতেজ, তাও আবার মৌসুমের মাঝপথেই।

চারদিকেই তখন হৈচৈ, কে হতে যাচ্ছেন রিয়াল মাদ্রিদের নতুন কোচ? রিয়ালের সভাপতি ফ্লোরেন্তিনা পেরেজ ভরসা করলেন কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের ওপর, যার কোচিং অভিজ্ঞতা বলতে গ্যালাকটিকোদের বয়সভিত্তিক দল ক্যাসিলায় দেড় বছর আর এক বছর কার্লো আনচেলত্তির সহকারী হিসেবে মূল দলের পাশে থাকা। সেদিনের সেই ‘আনকোরা’ জিদানের কাঁধেই পেরেজ তুলে দিয়েছিলেন মাদ্রিদের বড়দের দায়িত্বটা। ঝুঁকি নিয়েছিলেন, বাজি ধরেছিলেন ফুটবলার হিসেবে ক্লাব কিংবা জাতীয় দলের কিংবদন্তি জিদানের ওপরে। আর এটাই সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সবচেয়ে সফল বাজিগুলোর একটি।

কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই জয় পেয়েছিলেন ৫-০ গোলে, হাফ ছাড়লো মাদ্রিদিস্তারা, সামনে ভালো কিছুই আসছে হয়তো? ধীরে ধীরে দলকে গুছিয়ে আনলেন, দলের ভিতরের বোঝাপড়া টা বৃদ্ধি করলেন, খেলোয়াড় দের সাথে শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুরুপেই বেশী সহযোগীটা করতে থাকলেন। যে রিয়াল মাদ্রিদই কয়েকমাস আগে ছন্ন ছাড়া ছিলো, সেই মাদ্রিদকেই জিতালেন চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা, আরাধ্যের লা উন ডেসিমা।

সেই সাথে খেলোয়াড় হিসেবে নবম, সহকারী হিসেবে দশম আর প্রধান কোচ হিসেবে দলীয় ১১তম শিরোপা জয়ের ভাগীদার হয়ে অনন্য এক রেকর্ড গড়লেন। যে লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদ ধুকতে ছিলো, সেই লীগেই ১ পয়েন্টের জন্যে ট্রফি হাতছাড়া করলেন। টাক মাথার ভেলকিটা এখানেই থামান নি, নূ ক্যাম্পে গিয়ে বার্সা কে হারিয়ে পূর্ন ৩ পয়েন্ট লাভ কিংবা ভিসেন্তে ক্যালদারনতে গিয়ে মাদ্রিদের আরেক ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে নাকানিচুবানি খাওয়ানো, জিদান জয় করেছে ইতালিও।

১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে লিও বেনহ্যাকারের রিয়াল মাদ্রিদ টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার ক্লাব রেকর্ড গড়েছিলেন, জিনেদিন জিদানের অধীনে থাকা এ দলটা নিজেদের এ রেকর্ড টপকিয়ে বার্সার গড়া স্প্যানিশ রেকর্ড টাও ভেঙ্গে দিয়েছিলো। কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম বছরেই জিতেছিলেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা, প্রথম ১৭ মাসে মূল্যবান পাঁচটি শিরোপা। লা লিগা উদ্ধার করেছিলেন,  প্রথম দল হিসেবে রিয়ালকে টানা দু’টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছেন, নিজেও কোচ হিসেবে সবচেয়ে কম সময়ে দু’টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন।

ইতিহাসের সপ্তম জাদুকর হিসেবে কোচ ও ফুটবলার উভয় ভুমিকাতেই ইউসিএল জেতা এই লোকটার অধীনে টানা সবচেয়ে বেশী ম্যাচে গোল করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে জয়রথ টা সেখানেই থামান নি, প্রথম ফুটবল দল হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা তিনবার শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে এই টেকো মাথার লোকটার অধীনেই ভালো খেলোয়াড় নাকি ভালো কোচ হতে পারেন না, বহুল প্রচলিত এ প্রবাদ টাকেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন একজন জিদান।

ক’দিন আগেই হোয়াইট হান্টারদের চ্যাম্পিয়নস লিগের ১৩ তম শিরোপা উপহার দিয়েছেন, মাত্র আড়াই বছরে নয়টা শিরোপা জিতেছেন, ঈর্ষনীয় সাফল্যতে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়নস লিগ, টানা দু’বার উয়েফা সুপার কাপ,  টানা দু’বার ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ,  কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত একটা সিজনও শিরোপা ছাড়া শেষ করেননি।

নতুন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ জিদানের অধীনে কেমন করবে এই প্রশ্নে যখন ফুটবল পাড়া মুখর, ঠিক তখনই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সবাইকে স্তব্ধ করে ক্লাব ছাড়ার ঘোষনা টা দিয়ে বসলেন এই ফুটবল কিংবদন্তি। অথচ রিয়াল মাদ্রিদ তার অধীনে এ পর্যন্ত খেলা ১৪৯ ম্যাচে ১০৪ ম্যাচেই জয়ের মুখ দেখেছে, ২৯ টা ড্র’র পাশাপাশি মাত্র ১৬ টা হার। তার অধীনেই প্রায় ৪০০ বার বিপক্ষের জালে বল জড়িয়েছিলো গ্যালাকটিকোরা, নজরকাড়া ৬৯.৮০ % জয়ের হার।

সব গল্প নাকি শেষ হয়েও শেষ হয় না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প গুলো এমনই ছিলো! একজন জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের মাদ্রিদ ক্যারিয়ার টাও ঠিক ঐ রকমই,  অল্প সময়ের মধ্যে মন জয় করলেন, ফুটবলার হিসেবে নিজেকে চেনানোর পর কোচ হিসেবেও নিজের জাত চেনালেন।

জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের জন্য শ্রদ্ধা, যেখানেই থাকবেন ভালো রইবেন কিংবদন্তি! রিয়াল মাদ্রিদের ডাগ-আউট আপনাকে বড্ড মিস করবে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।