ইউটিউব কনটেন্ট ও ক্লিকের অসুস্থ নেশায় অবসাদগ্রস্থ শৈশব

একজন পুরোনো ইউটিউব ভিডিও নির্মাতা এলগোরিদমের কারচুপিতে তাঁর উপার্জন কমে গিয়েছে এমন অভিযোগ করে গুগলের ক্যালিফোর্নিয়া অফিসে হামলা চালিয়ে একাধিক মানুষকে হত্যা করার পর বিবিসিতে অনলাইন সেলিব্রিটিদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ছোট একটা প্রতিবেদন দেখেছিলাম। গুগল কিংবা ইউটিউবের এলগোরিদম যেমনই হোক না কেনো প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে প্রতিনিয়ত কনটেন্ট আপলোড করতে হয়। অনিয়মিত মানুষদের খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না গুগল এলগোরিদম।

প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কনটেন্ট আইডিয়া তৈরী করা সহজ না। এলগোরিদমের এমনই ঝামেলা যে সকল সাবস্ক্রাইবারকে নতুন কনটেন্টের সংবাদ পাঠানো হয় না। সুতরাং বাঘাবাঘা ইউটিউব সেলিব্রিটিরা কনটেন্ট আইডিয়া ম্যানেজার রেখেছে, তাঁরা নিজস্ব ক্যামেরা ম্যান, এডিটর সমেত একটা আলাদা প্রোডাকশন হাউজ – ইউটিউবে ভিডিও কনটেন্ট আপলোড করে বিজ্ঞাপনের টাকায় জীবনযাপন যেমন বিলাসিতা মনে হয়, বাস্তবতা হলো যেকোনো নাটক-সিনেমা ব্যবসার মতো এটাও একটা ব্যবসাই।

সর্বক্ষণ প্রাসঙ্গিক থাকার মানসিক চাপ, সর্বক্ষণ উৎপাদনক্ষম থাকার মানসিক চাপ নিয়ে এরা অসুস্থ হচ্ছে, তারপর নেশাগ্রস্ত হয়ে আবার এডিটিং টেবিলে ফিরে যাচ্ছে। অন্য ইউটিউব সেলিব্রিটির সাথে বৈরীতা কিংবা প্রণয়ের গল্প তৈরী করছে। এদের অনলাইন জীবনযাপন সম্পূর্ণটাই একটা রিয়েলিটি শো। তাঁরা নিজের জীবনে নাটকীয়তা তৈরী করছে।

এক শিশু সেলিব্রিটি যে তাঁর পুতুল খেলা, বন্ধুর সাথে ভাব অভিমান, ভাইয়ের সাথে খুনসুটি সবকিছুই জানাচ্ছে ইউটিউবে – আরও একদল গৃহবন্দী শিশু সেসব অ্যাডভেঞ্চার দেখে মুগ্ধ হচ্ছে – এদের দু’জনেরই এ জীবন প্রাপ্য ছিলো না।

মাঝে এই মেয়েটির মা মারা যায়। মায়ের মৃত্যুর শোক সহ্য করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়া হিসেবে মেয়েটা আবার ইউটিউব ভিডিও কনটেন্ড আপলোড করে, তবে এই সামান্য বিরতির পরতার ভিডিও ভিউ মিলিয়ন থেকে কমে হাজারের ঘরে চলে আসেছে। সে প্রতিবেদককে জানাচ্ছে খারাপ তো একটু লাগেই, আগে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ আমার ভিডিও দেখতো এখন দেখছে না। তারপরও আমি এটা করে যাবো, আমার মা এটা খুব ভালোবাসতো।

বাবা-মা ভালোবেসে এক ধরণের মানসিক ব্যাধির সূচনা করে গেলো, তাদের প্রত্যাশার চাপ, বিজ্ঞাপনদাতাদের পণ্যবিক্রির ঝোঁক সব মিলিয়ে গুগল-ফেসবুক-ইন্সট্রাগ্রাম- লাইক আর হেট বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলো যারা ক্লিকে ক্লিকে টাকা বিনিময় করছে এরা ইউটিউবার, ইন্সট্রাগ্রাম স্টার, ফেসবুক সেলিব্রিটি বানাচ্ছে- স্টারডম, সেলিব্রিটিজম হজম করার পাকস্থলী সবার নেই।

শিশুর সুন্দর শৈশব এই শহরে তৈরী করা কঠিন, তবে যখনই দেখি একটা পরিবার তাদের ছেলে-মেয়েদের শোবার ঘর, তাদের বাসার উঠান- সব জায়গায় ক্যামেরা বসিয়ে এসব শিশুদের তাড়া করছে, তাঁদের প্রতিদিন উপহার কিনে দিচ্ছে, তাঁদের স্কুল ব্যাগ, তাঁদের পেনসিল, তাঁদের জামা জুতা সবকিছুই কোন না কোনো প্রতিষ্ঠানের উপহার, আমি ইউটিউবে সেসব ভিডিও কনটেন্ট দেখা সমর্থন করি না, মনে হয় মানসিক অবসাদগ্রস্ত একদল শিশু তৈরীতে সরাসরি ভুমিকা রাখছে আমাদের এই ক্লিকের নেশা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।