জ্বি, এটা আমাদের টেস্ট ভেন্যু!

সেপ্টেম্বর ২০১৭। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। নিরাপত্তাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকেছিলাম খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে। কিভাবে? গ্যালারীর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখি দেয়াল ভাঙা! সেখান দিয়েই। ঢুকে দেখি অবস্থা শোচনীয়

গ্যালারির চেয়ারগুলা কে বা কারা খুলে নিয়ে গিয়েছে, সাইট স্ক্রিন ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ড্রেসিং রুমের উপরের ভি.আই.পি স্ট্যান্ডের কাঁচ ভেঙে ভেতরের রড় লাইট ঝুলে আছে। আর ম্যানুয়াল স্কোরবোর্ড, ক্যামেরা পার্সনদের জন্য বানানো উঁচু কাঠামো সব কিছু ভাঙাচোরা।

গ্যালারি, সিঁড়িমুখ সব জায়গায় বুনো আগাছা আর ঘাস জন্মেছে। রংচটা হয়ে পড়েছে ‘মানজারুল ইসলাম রানা’ স্ট্যান্ড। এইরকম ভয়াবহ অবস্থা দেখে মনেই হয়না মাত্র দুই বছর আগেও এখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়েছে।

ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো এই স্টেডিয়াম। তারপর আর সংস্কারকাজ হয়নি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বরাবর কয়েকদফা চিঠি দিয়েও লাভ হয়নি।

ক্রিকেটে খুলনা বিভাগের অবদান নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়েনা। ‘ক্রিকেটার তৈরীর কারখানা’ এই খুলনা বিভাগ। সবচেয়ে বেশি তারকা ক্রিকেটার এই বিভাগ থেকেই খেলছেন চলতি সময়ের জাতীয় দলে। এই শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামেই বাংলাদেশ তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিলো।

এখানেই আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৬০ রানের ব্যবধানে ওয়ানডে জয়, আছে তামিম-ইমরুলের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে প্রথম উইকেটের সবচেয়ে বড় জুটি (ওপেনিং জুটি, আছে আবুল হাসান রাজুর সেই ঐতিহাসিক টেস্ট সেঞ্চরি।

আউট ফিল্ডের অবস্থা এখনো চমৎকার, ২০১১ বিশ্বকাপের রিজার্ভ ভেন্যু হিসেবে আইসিসি থেকে পাওয়া অনুদান দিয়ে চমৎকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয়েছিলো এখানে। কিন্তু গ্যালারী, ড্রেসিং রুম, স্কোরবোর্ড ইত্যাদি দেখে এখন পরিত্যক্ত একটি স্টেডিয়াম মনেহয়।

খুলনা বিভাগ, খুলনাবাসী, খুলনার ক্রিকেট এটা ডিজার্ভ করেনা। এই শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম জাতীয় লিগে খুলনা বিভাগের হোমগ্রাউন্ড, বিসিএলে দক্ষিণাঞ্চলের হোমগ্রাউন্ড। ছোট বড় অনেক বিভাগীয় টুর্নামেন্টের আসর বসে এখানে। চলে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট। সারা বছরই ব্যস্ত থাকা এই স্টেডিয়ামের প্রতি কেন এই অবহেলা?

স্টেডিয়ামের ছবি তুলতে যেয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম। এতো বড় স্টেডিয়ামে মাত্র দুইজন নিরাপত্তাকর্মী দেখেছিলাম সেদিন। ভেতরে প্রবেশ করার অনেক সময় পর একজন এসে জিজ্ঞেস করেছিলো আমি কে! আমি কি ঠিকাদার না সাংবাদিক? ঠিকাদার হলে সরাসরি ভেন্যু পরিচালকের সাথে কথা বলার জন্য।

সেই নিরাপত্তাকর্মী আবার স্টেডিয়ামের ছবি তুলতে দিবেনা, আমাকে প্রশ্ন করেছিলো ‘আমি কিভাবে আর কেন ঢুকলাম?”। আমি উল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আপনি তখন ডিউটি বাদে কই ছিলেন?’ ছবি যেন কোন পত্রিকার না যায় সেজন্য অনেক অনুরোধ করেছিলো।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জৈষ্ঠ ভ্রাতা মরহুম শেখ আবু নাসেরের নামে এই স্টেডিয়াম, এভাবে অবহেলা এই স্টেডিয়ামের প্রাপ্য নয়।

মরহুম শেখ আবু নাসের সাহেবের পুত্র জনাব শেখ সোহেল বর্তমানে বিসিবির একজন পরিচালক, এই স্টেডিয়ামের মালিকানা যদিও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের, তবুও আমি আশাকরি জনাব শেখ সোহেল বিসিবির মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সবসময় আয়োজন করা সম্ভব না হলেও এই স্টেডিয়াম সংস্কার করা হলে এখানে বিপিএলের ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব। অতীতে হয়েছে। ঘরের মাঠে খুলনা টাইটান্স খেলবে সেটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে খুলনাবাসী।

অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের দ্রুত সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি। দেশের একটা টেস্ট ভেন্যুর বেহাল দশা মেনে নেওয়া যায় না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।