বিশ্বকাপ ফাইনাল প্রিভিউ

বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এত বেশি লেখা হয়েছে, ভিন্ন কিছু লেখা দুরূহ হয়ে উঠেছে। তবু একজন ক্রিকেট পর্যবেক্ষক হিসেবে লেখা উচিত।

আমরা যদি ১৯৯৬ বিশ্বকাপ থেকে পর্যালোচনা করি, প্রতিটি আসরের ফাইনাল হয়েছে অত্যন্ত পানসে। কেবলমাত্র ২০১১ এর ফাইনালটাতেই প্রায় ৯০ ওভার পর্যন্ত দুই দলের হাতেই ম্যাচ ছিল। ১৯৯৬ বিশ্বকাপেও ৭০ ওভার পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল, পরে আরবিন্দ ডি সিলভা সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। অন্য ফাইনালগুলো প্রথম ইনিংসের ২০ ওভারের মধ্যেই মীমাংসিত হয়ে গিয়েছিল।

তুলনায়, প্রতিটি আসরে দুটো সেমিফাইনালের অন্তত একটা, বা কোনো কোনো আসরে দুইটাই হয়েছে টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ।

কেন ফাইনাল বিবর্ণ? এর প্রধান কারণ, ২০১১ বাদে প্রতিটি আসরের ফাইনালেই অস্ট্রেলিয়ার থাকা। তাঁরা মানসিকভাবে এতোটা শক্ত যে ফাইনালের চাপকে তারা পাত্তাই দেয় না, অন্য দল নার্ভের কাছে হেরে বসে। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেমিতে হেরেছে অস্ট্রেলিয়া, এবং সেটাও বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের দুর্বলতম দল নিয়ে। এখান থেকেই পার্থক্যটা ধরা পড়ে।

নিউজিল্যান্ড মূলত সেমিফাইনালের দল। এখনো পর্যন্ত ৮ বার সেমিফাইনাল খেলেছে, ফাইনালে পৌঁছেছে মাত্র দু’বার, তাও সর্বশেষ দুই আসরে। তবে দলগত পারফরম্যান্স যদি তুলনা করি, ব্রেন্ডন ম্যাককালামের নেতৃত্বে গতবারের নিউজিল্যান্ড অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং ডেসপারেট ছিল। এবারের নিউজিল্যান্ডকে ৯০ দশকের ক্রিকেট মডেলের অনুসারী মনে হচ্ছে।

এখনকার ওয়ানডে ক্রিকেট টপ অর্ডার নির্ভর খেলা, যাদের টপ অর্ডার যত বিধ্বংসী, ম্যাচ জয়ের সম্ভাব্যতায় তারা এগিয়ে। গত আসরে মার্টিন গাপটিল ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন, এবারে ফিল্ডিংয়ে রান বাঁচানো আর ধোনিকে রান আউট করা ব্যতীত তার কোনোরকম অবদান নেই ব্যাটিংয়ে। রান করা নির্ভর করে রিদম, রিফ্লেক্স আর কনফিডেন্সের ওপর।

প্রথম দুটো কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে কনফিডেন্স এমনিতেই কমে যায়। গাপটিলের কনফিডেন্সের অবস্থা এখন সেরকম। রান করতে হবে এই চাপে না ভুগে তিনি যদি উইকেটে গিয়ে টি-টোয়েন্টি স্টাইলে ব্যাটিং শুরু করেন, এবং ভাগ্যের কিছুটা সহায়তা পান, একমাত্র সেক্ষেত্রেই তার পক্ষে আজ বড়ো রান তোলা সম্ভব।

কেন উইলিয়ামসন ৫৪৮ রান করেছেন, তবু নিউজিল্যান্ডের ৩০০+ স্কোর একটিও নেই, আগফানিস্তান বাদে তারাই একমাত্র দল যারা এই রেকর্ড গড়েছে। বলতে পারেন নয় ম্যাচের মধ্যে ছয়টাতেই ফিল্ডিং করা দল মাত্র তিনটা সুযোগে ৩০০ না-ই করতে পারে। কিন্তু শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচটা বাদ দিলে কোনটাতে তারা খুব ডমিনেটিং ব্যাটিং করেছে?

সাকিব যেমন একাই ব্যাটিং করেছে, কয়েক ম্যাচে মুশফিক আর এক ম্যাচে লিটন সাপোর্ট দিয়েছে, উইলিয়ামসন সেটা পায়নি, পুরো দলের ব্যাটিং নড়বড়ে। রস টেলর যতটুকু সাপোর্ট দিয়েছে তা যথেষ্ট নয়। তবু গ্র‍্যান্ডহোম আর নিশামের মধ্যে একজনকে বসিয়ে ব্যাটিং শক্তিশালী না করে ক্রমাগত একই দল খেলিয়ে যাওয়া থিংকট্যাংকের দুর্বলতা।

উইলিয়ামসনের চাইতে আমি বরং ফার্গুসনের অবদানকে বড়ো করে দেখতে চাই, কারণ বোলিংয়ে তার থ্রেট না থাকলে প্রতিপক্ষ আরো বেশি রান তুলতো, এবং উইলিয়ামসন যেরকম সতর্ক ব্যাটিং করেন, তাতে ২৮০-৯০ তাড়া করে জেতা যে তাদের পক্ষে কঠিন তা টুর্নামেন্টে তাদের চেজিং রেকর্ড দেখলেই বুঝতে পারা যায়।

গত আসরে ট্রেন্ট বোল্ট যেমন দুরন্ত ছিলেন, এবার তার এফিশিয়েন্সি ৫০%-এ নেমে এসেছে। ম্যাট হেনরি যদিওবা সেমি ফাইনালে জিতিয়েছেন, তবু টিম সাউদিকে বোলার হিসেবে তার তুলনায় অনেক এগিয়ে রাখবো। হেনরি-বোল্টের তুলনায় সাউদি- বোল্ট ভয়ংকর বেশি। সাউদিকে না খেলানো নিউজিল্যান্ডের আরেকটি ভুল; শুধু বোলিং নয়, সাউদির সিক্স হিটিং এবিলিটিও ক্লোজ ম্যাচে কাজে আসতো।

অন্যদিকে যত সময় এগিয়েছে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। বেয়ারস্টো প্রথম দিকে নিষ্প্রভ থাকলেও সময়মতো ফিরে পেয়েছে নিজেকে, আর জেসন রয় তো বর্তমান ওয়ানডেরই সবচেয়ে আগ্রাসী ব্যাটসম্যান বোধহয়। জো রুট ধারাবাহিকভাবে রান করে গেলেও নজরে আসেনি ওপেনার কিংবা বেন স্টোকস এর পারফরম্যান্সের কারণে।

মরগ্যান আর বাটলারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সার্ভিস না পাওয়া একটা বড়ো ভাবনা থেকে যায়। তাছাড়া ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা প্রত্যেকেই স্ট্রোক প্লেয়ার এবং রুট ব্যতীত কেউই রক অ্যান্ড সলিড নয়, ফলে ব্যাটিং কলাপ্স করার একটা ঝুঁকি থেকেই যায় সবসময়, এটাই নিউজিল্যান্ডের জন্য সুযোগ হতে পারে।

ইংল্যান্ডের ওপেনিং বোলারদ্বয় ক্রিস ওকস আর আর্চার পাওয়ার প্লে তেই মোমেন্টাম নিজেদের দিকে নিয়ে নিচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে ফার্গুসন যে কাজটা করছে ইংল্যান্ড লাইন আপ এ মার্ক উড বা প্লাংকেট সেই ভূমিকায় খুব বেশি কার্যকর হতে পারেনি। অন্যদিকে রশিদ খান প্রতি ম্যাচেই প্রচুর রান দিলেও সেমি ফাইনাল বাদে অন্য ম্যাচগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট এনে দিতে পারেনি। স্যান্টনার রান আটকে রেখেছে, গুরত্বপূর্ণ সময়ে উইকেটও পেয়েছে।

ম্যাচ উইনারের তালিকা করলে – ইংল্যান্ডে ৮ জন ( রয়, বেয়ারস্টো, রুট, মরগান, স্টোকস, বাটলার, ওকস, আর্চার)। আর নিউজিল্যান্ডে ৪ জন ( ফার্গুসন, বোল্ট, উইলিয়ামসন, হেনরি); গাপটিল, রস টেলর ম্যাচ উইনার হলেও এবারের বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে তারা বিবেচনার বাইরেই থাকবে। লড়াইটা তাই ৮ বনাম ৪ এর অসম প্রতিযোগিতা।

এক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতে পারে দুটো –

  • ইংল্যান্ডের কলাপ্স প্রবণতা এবং পরের দিকের বোলারদের তুলনামূলক রক্ষণশীলতা
  • স্যান্টনার, গ্র‍্যান্ডহোম, নিশামের অপ্রত্যাশিত কোনো পারফরম্যান্স দেখানো।

টস কতটা গুরত্বপূর্ণ? ইংল্যান্ডের জন্য আপাতত গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের যে দশা তাতে ২৫০ তোলাই তাদের জন্য কঠিন। নিউজিল্যান্ডের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইংল্যান্ড আগে ব্যাট করে ২৫০+ করে ফেললে সেটা তাড়া করার সামর্থ্য তাদের নেই বলা চলে।

তাই সামগ্রিক বিচারে টস ভাইটাল, এবং নিউজিল্যান্ডের আগে ব্যাট পাওয়ার উপর ম্যাচের উত্তেজনা বহুলাংশে নির্ভরশীল। তবে আমি জীবনে প্রথম যে ক্রিকেট ম্যাচ দেখেছি, সেটা ছিল ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম নিউজিল্যান্ড ম্যাচ, এবং তাতে বিজয়ী দলের নাম ছিল নিউজিল্যান্ড!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।