ফেবারিট নয় বলেই চোকার্সরাও ‘ফেবারিট’!

বরাবরই বিশ্বকাপে ফেবারিটের তকমা নিয়ে আসে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে, বিশ্বকাপের আসরে শেষ চারে পর কখনোই এগোয়নি দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রা। চারবার সেমিফাইনাল থেকে ফিরেছে তারা। বড় ম্যাচে সব সময়ই খেই হারিয়ে ফেলার অনন্য নিদর্শন কেবল একমাত্র এই প্রোটিয়াদেরই আছে।

তবে, এবার লাইম লাইটের আড়ালে আছে দলটি। কে জানে, চাপমুক্ত থেকেই কি না, এবার বিশ্বকাপটাই না জিতে বসে দলটি!

  • দলের শক্তিমত্তা

দুর্দান্ত বোলিং লাইনআপ বর্তমান প্রোটিয়া দলের মূল শক্তি। স্টেইন, রাবাদা, এনগিডি, নর্টজে, ইমরান তাহিরের মতো দলে একাধিক উইকেট টেকার রয়েছে। ইংলিশ কন্ডিশনে গতির ঝড় তুলতে পারবে, স্কোয়াডে এমন ফার্স্ট বোলার আছে চার জন! নিজেদের দিনে এরা একাই প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপকে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। স্পিন ডিপার্টমেন্টে আছে ইমরান তাহির, ত্যাবরেইজ শামসি, জেপি ডুমিনির মতো একাধিক অপশন। মিডল ওভারে সুযোগ পেলে এরা প্রায়শই ব্যাটিং লাইনআপে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

বোলিং লাইনআপের পর দলের দ্বিতীয় শক্তিমত্তা প্রোটিয়াদের টপ অর্ডার। আমলা, ডি কক, ডু প্লেসিদের নিয়ে গড়া টপ অর্ডার এবারের বিশ্বকাপে বেশ অভিজ্ঞ। তিনজন সম্মিলিতভাবে খেলেছে ৪১৩ ম্যাচ, করেছে ১৭,৬২৬ রান! যেকোনো দলের বিরুদ্ধে এরা ভালো শুরু এনে দিয়ে ম্যাচের লাগাম টেনে ধরতে পারে।

টপ অর্ডার এবং বোলিং শক্তির পাশাপাশি প্রোটিয়াদের ফিল্ডিংও বেশ! জন্টি রোডস এর দেশ, ফিল্ডিং ভালো না হয়ে যায় কই? দূর্দান্ত সব ক্যাচ এবং রানআউটের মিশেলে যেকোনো ৫০% চান্সকে করায়ত্ত করে ম্যাচে ফিরে আসতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান দলটি।

  • অভিজ্ঞতা

দেশের হয়ে সর্বোচ্চ দুইটি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন ৫ জন। এরা হলেন – অধিনায়ক ডু প্লেসিস, ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা, অলরাউন্ডার ডুমিনি, ফার্স্ট বোলার ডেল স্টেইন এবং লেগ স্পিনার ইমরান তাহির। এছাড়া উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান কুইন্টন ডি কক এবং ব্যাটসম্যান ডেভিড মিলার খেলেছেন একটি করে বিশ্বকাপ। দলের বাকি ৮ জন এবারই প্রথম বিশ্বমঞ্চে পা রাখছেন।

  • তুরুপের তাস

কাগিসো রাবাদা হতে পারেন এই দলের সবথেকে বড় এক্স-ফ্যাক্টর! ডানহাতি এই ফার্স্ট বোলারের গতি এবং বাউন্স এবারের বিশ্বকাপের সব ব্যাটসম্যানকে বেশ ভোগাবে। ইতোমধ্যে মাত্র ৬৪ ম্যাচ খেলেই ওয়ানডেতে তিনি ১০২ উইকেট লাভ করেছেন। পেস ডিপার্টমেন্টে তার সাথে আছেন অভিজ্ঞ ডেল স্টেইন এবং দুই ট্যালেন্টেড লুঙ্গি এঙ্গিডি ও এনরিক নর্টজে। নতুন বলে এরা একেকজন যে বিস্ফোরক হয়ে উঠবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

স্পিন ডিপার্টমেন্টে আছেন আরেক অভিজ্ঞ ইমরান তাহির। ৪০ বছর বয়সী ডানহাতি এই লেগ স্পিনারের ঝুলিতে আছে দেশের হয়ে সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড (৭/৪৫)। রয়েছে প্রোটিয়াদের হয়ে সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে একশো উইকেট পাওয়ার রেকর্ডও (৫৮ ম্যাচ)। তার ঐ অদ্ভুতুড়ে বুনো উল্লাস দেখার অপেক্ষায় থাকবে কোটি দর্শক।

তরুণ ত্যাবরেজ শামসিও হতে পারেন আরেকটি ট্রাম্প কার্ড! অভিজ্ঞতা নেই, তবে এই লেফ আর্ম চায়নাম্যান একাদশে সুযোগ পেলে দারুণ কিছু করে দেখাতে পারেন।

ব্যাটিংয়ে জ্বলে উঠতে পারেন কিপার কুইন্টন ডি কক এবং ক্যাপ্টেন ডু প্লেসিস, দু’জনেই গড় ৪৫ এর উপরে। দুই আগ্রাসী ট্যালেন্টেড ব্যাটসম্যান মার্করাম এবং ভ্যান ডার ডুসেন বড় মঞ্চে এসে ব্যাপক কিছু করে ফেললে, অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না।

  • দলের দূর্বলতা

দলের প্রধানতম দূর্বলতা হলো জেনুইন অলরাউন্ডারের অভাব। অতীতে প্রোটিয়ারা জ্যাক ক্যালিস, শন পোলকদের মতো একেকজন ম্যাচ উইনারকে এই পজিশনে পেলেও, বর্তমান স্কোয়াডে কার্যকর অলরাউন্ডারের বড্ড অভাব। এন্ডিল ফেহলুকাইয়ো এবং ক্রিস মরিসকে এক্ষেত্রে বড় ভুমিকা পালন করতে হবে। ধারাবাহিক পারফরমেন্স প্রদর্শন করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের অফফর্মে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক দুশ্চিন্তা। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রায় আট হাজার রান করা হাশিম আমলা বর্তমানে নিজেকেই যেনো হারিয়ে খুঁজছেন! তার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্তি নিয়েও কম জলঘোলা হয়নি। অভিজ্ঞ ডেল স্টেইনের বোলিংয়ে আর আগের মতো ধার নেই। গতি আছে, কিন্তু প্রায়শই লাইন লেন্থ মিস করছেন। দুই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ডেভিড মিলার এবং ডুমিনিও তাদের সেরা ছন্দে নেই। বারবার তারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন।

এছাড়া দলের একাধিক খেলোয়াড়ের ইনজুরি আরেক দুশ্চিন্তার কারণ। দলের চার ফার্স্ট বোলারের সবাই হয় ছোটখাটো ইনজুরি আক্রান্ত, নাহয় সবেমাত্র ইনজুরি থেকে ফিরেছেন। বিশ্বকাপ চলাকালীন মুহূর্তে যদি কোনো দুঃসংবাদ আসে, সেক্ষেত্রে তাদের রিপ্লেসমেন্ট খুজেঁ পাওয়া বেশ চিন্তার বিষয় হবে।

  • প্রেডিকশন

১৯৯২ সাল থেকে বিশ্বকাপ খেলে আসা এই দলটি প্রতিবারই নানান রকম দূর্ঘটনার শিকার হয়ে ‘চোকার’ ট্যাগ নিয়ে বেচেঁ আছে। চাপ সামলানোর মানসিকতা না থাকায় তাদের ৯ টি নকআউট মাচ হারার রেকর্ড আছে। বিশ্বের আর কোনো দেশের এই রেকর্ড নেই। প্রতিবার আইসিসির কোনো টুর্নামেন্ট আসলে তারা ফেবারিট হয়েই মাঠে নামে, টুর্নামেন্টের শুরুটাও ভালোই করে। তবে মাঝপথে খেই হারিয়ে বসে।

বিশ্বকাপে তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য সেমিফাইনাল। মোট চারবার তারা শিরোপার এতো কাছে এসে বিদায় নিয়েছে। সবশেষ বিশ্বকাপে হট ফেবারিট থাকা সত্ত্বেও সেমিফাইনালের বাধা আর ডিঙাতে পারেনি।

বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ম্যাচ স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সাথে, টুর্নামেন্টের প্রথম দিনেই। এবার তাদের দলের যা অবস্থা তাতে তারা মোটেও ফেবারিটের তালিকায় নেই। তবে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, উইন্ডিজ এবং নিউজিল্যান্ডদের সাথে তাদের জম্পেশ লড়াই হবে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াইটা হবে পাকিস্তানের সাথে, দুইদলেরই শক্তিমত্তা তাঁদের বোলিং। এবার কি তারা পারবে চোকার ট্যাগলাইন মুছে ফাইনালের মঞ্চ ধরতে? উত্তরের জন্য সময়ের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

  • দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্কোয়াড

হাশিম আমলা, এইডেন মার্করাম, কুইন্টন ডি কক (উইকেটরক্ষক), ফাফ ডু প্লেসিস, ডেভিড মিলার, রাশি ভ্যান ডার ডুসেন, জেপি ডুমিনি, অ্যান্ডাইল ফেহলুকওয়াও, ডোয়াইন প্রেটোরিয়াস, ক্রিস মরিস, ডেল স্টেইন, ক্যাগিসো রাবাদা, লুঙ্গি এনগিডি, এনরিক নর্টজে, ইমরান তাহির, ত্যাবরেইজ শামসি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।