অধরা ট্রফি ছোয়ার মিশন

নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের মঞ্চে বা যে কোনো আইসিসি ইভেন্টেই অন্যরকম একটা শক্তি। কখনোই খুব একটা আলোচনা থাকে না তাদের ঘিরে, অথচ অধিকাংশ সময়েই সেমিফাইনালে খেলে ফেলে ব্ল্যাক ক্যাপরা। গেলবার তো ফাইনালেই চলে গিয়েছিল দলটি। আর এবারে তাদের দলটি চার বছরের ব্যবধানে আরো বেশি শক্তিশালী। এবার কি অধরা ট্রফি ছোয়া হবে?

  • দলের শক্তিমত্তা

ব্যাটিং লাইনআপের প্রথম চার ব্যাটসম্যান এই দলের মূল স্তম্ভ। এখানে যেমন গাপটিল, মুনরোদের মতো বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান আছে, তেমনি উইলিয়ামসন, টেইলরের মতো ক্লাসিক ঘরানার ব্যাটসম্যানও আছে। পরিস্থিতি বুঝে এই চার ব্যাটসম্যান তাদের ব্যাট চালাতে পারে। এই চারজন মিলে মোট ওয়ানডে খেলেছেন ৫৭৭ টি, প্রায় ৪০ গড়ে করেছেন ২১,১৬৬ রান!

দ্বিতীয় শক্তিমত্তা হলো কিউইদের আগুনে পেস অ্যাটাক। সাউদি, বোল্ট, হেনরি, ফার্গুসন – নতুন বলে একেকজন ভয়ানক! বিশেষকরে টিম সাউদির লেট আউটসুইং এবং ট্রেন্ট বোল্টের ইনসুইং প্রতিপক্ষের জন্য আতংকের নাম। প্রথম দশ ওভারে যেকোনো টপ অর্ডারকে দুমরে-মুচরে দেওয়ার ক্ষমতা এদের আছে।

ব্যাটিং,বোলিংয়ের পাশাপাশি কিউইদের ফিল্ডিং ও দুর্দান্ত। স্লিপ ক্যাচের বস রস টেইলর আছেন এদলে! এছাড়া প্রথম পাওয়ারপ্লেতে ক্লোজ ফিল্ডিংয়ে নিউজিল্যান্ড সবসময় আগুনে পারফরমেন্স প্রদর্শন করে।

এগুলোর পাশাপাশি ইংলিশ কন্ডিশন তাদের অনুকূলে কাজ করতে পারে। দূরত্বের দিক থেকে নিউজিল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ড হয়তো অনেক দূরে, কিন্তু গ্রীষ্মকালীন সময়ে ১০-১৭° সে. আবহাওয়ার মধ্যে কিউইরা দারুণ অভ্যস্ত। তাই কন্ডিশন তাদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না, উল্টো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তারা কন্ডিশনের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

  • অভিজ্ঞতা

মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান রস টেলরের এটি শেষ বিশ্বকাপ। এর আগে তিনি সর্বোচ্চ তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। দলের অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসন, ওপেনার মার্টিন গাপটিল এবং মিডিয়াম ফার্স্ট বোলার টিম সাউদি দুইটি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন। উইকেটরক্ষক টম ল্যাথাম, দুই ফার্স্ট বোলার ট্রেন্ট বোল্ট ও ম্যাট হেনরি খেলেছেন একটি করে বিশ্বকাপ।

  • তুরুপের তাস

পেস জুটি সাউদি-বোল্ট হতে পারে এ আসরের অন্যতম ভয়ংকর এক জুটি। সবশেষ বিশ্বকাপে এই জুটি মিলে ৯ ম্যাচে ৪০ উইকেট পকেটে পুরেছে। এবারও তারা ভালো রিদমে আছে। নতুন বলে এজুটি ভয়ানক তান্ডব চালায়, তাই এদের থেকে অন্যান্য দলের টপ অর্ডারকে সতর্ক থাকতে হবে। দলের অন্যতম ফ্যাক্টর হলো ব্যাটিংয়ে গাপটিল-উইলিয়ামসন-টেইলর জুটি। বড় মঞ্চে মার্টিন গাপটিল একজন ম্যাচ উইনার। ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান গত বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে ডাবল সেঞ্চুরি হাকিয়েছেন!

অধিনায়ক উইলিয়ামসন, যার ব্যাটিং গড় ছেচল্লিশ ছুঁইছুঁই, স্ট্রাইক রোটেট করে খেলায় তিনিও প্রতিপক্ষের জন্য যথেষ্ট চিন্তার কারণ হবেন। আর অভিজ্ঞ রস টেলরকে কেউ যদি পাত্তা না দেয় তাহলে সে বড় ভুল করবে। ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান বর্তমানে ভালো রিদমে আছেন। গত কয়েক মাসের ফর্ম জানান দিচ্ছে তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবেন।

দলের নতুন মুখ টম ব্লান্ডেল বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দিতে পারেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের এখনো অভিষেক হয়নি, তবে ২ টেস্ট খেলা এই খেলোয়াড়ের একটি সেঞ্চুরি রয়েছে। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তিনি কিপিং টাও বেশ ভালো করেন।

  • দুর্বলতা

নিউজিল্যান্ডের বর্তমান টিমে তেমন বড় কোনো দূর্বলতা নেই, তবে দলের লেট মিডল অর্ডার ততটা অভিজ্ঞ না। তিন অলরাউন্ডার জিমি নিশাম, কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম এবং মিচেল স্যান্টনার মিলে খেলেছেন ১৫০ ম্যাচেরও কম। যদিও এদের সবারই স্ট্রাইক রেট একশোর আশেপাশে। তবে যদি হুট করে ব্যাটিং ধস নামে, সেক্ষেত্রে এরা ততটা নির্ভরযোগ্য হবে না।

সবশেষ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির কথাই ধরুন। বাংলাদেশের সাথে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটায় এই পজিশনের কেউ বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেনি, হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো। অথচ সেখানে যদি আর ২৫ রান বেশি হতো, ম্যাচের দৃশ্যপট অন্যরকম হতো।

ক্ষুদ্র দূর্বলতা আরো আছে। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা নতুন বলে যতটা ভয়ংকর, পুরোনো বলে ততটা ভয়ানক না। ফলে ডেথ ওভারগুলোতে তারা ততটা সাবলীল না, প্রচুর রান খরচা করে। ইংল্যান্ডের তক্তা মার্কা ব্যাটিং ট্র্যাকে তাদের এই অংশটুকু বেশ ভোগাবে।

এছাড়া নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানেরা ফার্স্ট বল খেলায় যতটা সাবলীল, স্পিন খেলায় ততটা সাবলীল না। ঘূর্ণি জাদুতে এদের এখনো বেশ দূর্বলতা আছে। যদি আবহাওয়া খারাপ থাকে তাহলে প্রতিপক্ষের স্পিন সামলাতে এদের বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে।

  • প্রেডিকশন

গত বিশ্বকাপের রানার আপ  ২০১৫ এর আগে দশ বারের মধ্যে মোট ৬ বার সেমিফাইনাল খেলেছে! তাই ‘দ্য সেমিফাইনালিস্ট’ উপাধি টি তাদের সাথে যথেষ্ট মানানসই। এবারের বিশ্বকাপেও তাদের দলটি যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে এই দল।  দুই-একটা কঠিন ম্যাচ জিতে নিতে পারলে এবারো শেষ চারে ওঠা সম্ভব এই দলটির পক্ষে।

  • নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

মার্টিন গাপটিল, কলিন মুনরো, কেন উইলিয়ামসন (উইকেটরক্ষক), রস টেলর, টম ল্যাথাম (উইকেটরক্ষক), হেনরি নিকোলস, টম ব্লানডেল (উইকেটরক্ষক), কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম, জিমি নিশাম, মিশেল স্যান্টনার, টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, ম্যাট হেনরি, লোকি ফার্গুসন, ইশ সৌদি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।