বিশ্বকাপ ও শীর্ষ চারে খেলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চারটি ফ্যাক্টর

টুর্নামেন্ট আর দ্বিপাক্ষিক সিরিজের মধ্যে বিস্তর ফারাক। দ্বিপাক্ষিয় সিরিজের পরিসর-পরিধি থাকে সীমিত, চাপ থাকে কম, যে কারণে নার্ভের পরীক্ষা খুব বড়ো লেভেলে হয় না। এছাড়া টুর্নামেন্ট জেতার সাথে ক্রিকেট ঐতিহ্য, লেগাসি, টিম স্পিরিট, নির্ভীকতা প্রভৃতি নিয়ামকেরও গভীর যোগসূত্র থাকে।

যে কারণে দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বকাপ ফেবারিট নির্ধারণ করতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এবারের বিশ্বকাপে আমার বিবেচনায় ফেবারিট টিম কেবলমাত্র ভারত আর অস্ট্রেলিয়া। বাকি দু’টি পজিশনের জন্য নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, সাউথ আফ্রিকা, পাকিস্তান- এই পাঁচ দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে। শ্রীলংকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর আফগানিস্তানকে রেসের মধ্যে রাখছি না।

তবে আমার পর্যবেক্ষণ বলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই আসরের এন্টারটেইনমেন্ট এজেন্ট হতে যাচ্ছে। সুপার ফোরের রেসে না থাকলেও টপ টু এর বাইরে থাকা বাকি পাঁচ দলের অন্তত দু’টিকে হারিয়ে দিয়ে পয়েন্ট টেবিলের খেলা জমিয়ে তুলবে।

দ্বিপাক্ষীয় সিরিজগুলোতে নিয়মিত ৩০০+ রান তোলার কারণে ইংল্যান্ডকে অনেকেই নাম্বার ওয়ান ফেবারিট বানিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে তাদের ব্যাটিং অর্ডার অনেক লম্বা হওয়ায় যে কোনো ম্যাচ ফিনিশ করার ক্ষেত্রে তারা এডভান্টেজ পায় সেটা দেখা গেছে। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায় নেয়ার পর তারা ওয়ানডে ক্রিকেটকে সিরিয়াসলি নিয়েছে, এমন কথাও চাউর হয়ে গেছে। অবশ্য দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে তাদের পারফরম্যান্স দেখে এসব কথাকে ভিত্তিহীন বলারও অবকাশ থাকে না। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ভাগ্যও ইংল্যান্ডের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল, প্রথম ম্যাচে তারা যদি সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে দেয়, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার তৃতীয় ম্যাচ ভারতের বিপক্ষে- এই সাইকোলজিকাল এডভান্টেজে সাউথ আফ্রিকাকে হারানোর একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে।

অস্ট্রেলিয়া আর ভারতকে কেন শীর্ষ দু্ইয়ে রাখলাম – এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ফিকচারে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম তিন ম্যাচের প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত। প্রথম দুই ম্যাচে নিশ্চিন্তে জিতে তারা রিদমে চলে আসবে। তৃতীয় ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে তাঁরা মানসিকভাবে এগিয়ে থাকবে, যদি হেরেও যায় তবু পরের তিন ম্যাচে তারা পাকিস্তান,শ্রীলংকা আর বাংলাদেশকে পাবে। পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কাকে হারানোর কারণে বাংলাদেশের বিপক্ষে জিততেও বেগ পেতে হবে না। ছন্দে থাকা অস্ট্রেলিয়া শেষ তিন ম্যাচে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে না হারানোর কারণ দেখি না। ফলে অস্ট্রেলিয়া এক নম্বর দল হিসেবে সুপার ফোরে উঠার কথা।

ভারতের প্রথম তিন ম্যাচের প্রতিপক্ষই যথেষ্ট কঠিন। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড। ইংল্যান্ডের কাছে সাউথ আফ্রিকার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট, এমনকি বাংলাদেশের বিপক্ষেও দক্ষিণ আফ্রিকা হেরে বসতে পারে প্রথম ম্যাচের প্রভাবে, যে কারণে ভারত এডভান্টেজ পাবে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ৪০-৬০ অবস্থায় অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে থাকবে। পরের ম্যাচে তারা খেলবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। নিউজিল্যান্ড তার পূর্বে খেলে ফেলবে শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে যেখান থেকে ২ টি ম্যাচে জয় নিশ্চিত, বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটা ৫০-৫০ অবস্থায় থাকবে, যে কারণে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও ভারত কিছুটা পিছিয়ে থাকবে। কিন্তু তাদের পরের ৩ ম্যাচ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হওয়ায় সেগুলো জিতে তারা ফ্লো চলে আসবে, যার প্রভাবে ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাঁরা ফেবারিট থাকবে। এই হিসাবে তারা ২ নম্বর পেয়ে যায়।

৩য় আর ৪র্থ দল কারা হতে পারে এই আলোচনার পূর্বে আরো কয়েকটা দল ছোট করা যায় কিনা দেখি।

প্রথমেই পিক করবো পাকিস্তানকে।

প্রথম ৩ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, আর শ্রীলংকার বিপক্ষে দু’টো ম্যাচে তাদের জয় অনেকটাই নিশ্চিত। প্রথম ম্যাচের প্রভাবে ইংল্যান্ডকেও হারিয়ে দিতে পারে। যেহেতু তারা অধারাবাহিক দল, চ্যালেঞ্জটা আসবে এরপর। পরের ম্যাচগুলো দেখি। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড। ৪টি ম্যাচেই তাদের হারের সম্ভাবনা প্রবল, যার কারণে বাংলাদেশ এডভান্টেজ পাবে। একমাত্র আফগানিস্তানের ম্যাচটাতেই তাদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাকিস্তানের পক্ষে ৩-৪ টির বেশি ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

সুপার ফোরের এক দল বাদ।

দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে তাকানো যাক। প্রথম ম্যাচে তারা ইংল্যান্ডের কাছে হারবে। বাংলাদেশের বিপক্ষে যদি জিতেও যায় (যদিও সম্ভাবনা কম), ভারতের বিপক্ষে হারের সম্ভাবনাই বেশি। তার মানে প্রথম তিন ম্যাচের দু’টিতেই পরাজয় নিশ্চিত, ৩টি হওয়ারও সম্ভাবনা পর্যাপ্ত। সেখান থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, নিউজিল্যান্ড এর মধ্যে দু’েটো জিতবে। নিউজিল্যান্ড ম্যাচটা ৫০-৫০ অবস্থায় থাকবে, তবে নিউজিল্যান্ডের সম্ভাবনাই বেশি। পাকিস্তান আর শ্রীলংকার বিপক্ষে জিতলেও শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হারার সম্ভাবনা বেশি, যেহেতু অস্ট্রেলিয়া তখন ছন্দে থাকবে। সাউথ আফ্রিকার জয় সংখ্যা তাই ৪-৫ টার মধ্যে থাকার কথা।

তাদের বাদ দেয়া যাচ্ছে না, আবার নিশ্চিত করেও বলা যায় না।

ইংল্যান্ডের দিকে তাকানো যাক।

প্রথম ৩ ম্যাচের দুটিতেই তাদের জেতার সম্ভাবনা প্রবল (দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ); পাকিস্তানের সাথে সম্প্রতি সিরিজ জেতা, হাইস্কোরিং ম্যাচ এবং প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাকিস্তান জেতার সম্ভাবনা বেশি থাকা, পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিকে ৫০-৫০ অবস্থায় দেখা যায়। পরের ৩ ম্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, শ্রীলংকার বিপক্ষে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ডের ম্যাচগুলো বরাবরই ইন্টারেস্টিং হয়, কোনো এক অজানা কারণে ইংল্যান্ডের বোলিং পেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানরা দারুণ চার্জড আপ থাকে।

এই ম্যাচটা ৩৬০+ রানের হতে পারে, এবং ইংল্যান্ডের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১১ বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩০০+ করেও হেরেছিল ইংলিশরা, আফগানদের স্পিনের বিপক্ষে তাদের কলাপ্স করার সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রীলংকার বিপক্ষে হেসেখেলেই জিতবে। কিন্তু পরের ২ ম্যাচ অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের বিপক্ষে, টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্সের কারণেই ওই দুই দলের বিপক্ষে তারা পিছিয়ে থাকবে তখন। শেষ ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এই ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার পূর্বে নিউজিল্যান্ডের পরিস্থিতি দেখা যাক।

নিউজিল্যান্ডের প্রথম তিন ম্যাচ শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে। বাংলাদেশ যদি প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েই দেয় তার প্রভাবে দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এগিয়ে থাকবে। তবু প্রথম তিন ম্যাচের দুইটাতে নিউজিল্যান্ডের জেতায় বড়ো বাধা নেই। পরের ৩ ম্যাচ ভারত, সাউথ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ভারত ম্যাচে তারা কিছুটা আপার হ্যান্ডে থাকবে, বাকি ২টায় জেতার চান্সই বেশি। শেষ ৩ ম্যাচ পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। পাকিস্তানের সাথে না জেতার কারণ নেই, অস্ট্রেলিয়ার সাথে হেরে যাবে। ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচ দিয়েই তাদের বিশ্বকাপ অভিযাত্রা সমাপ্ত হবে। ইংল্যান্ডেরও এটা শেষ ম্যাচ।

এই ম্যাচের পূর্বে দুই দলকে কোন অবস্থানে থাকছে? ইংল্যান্ড খেলছে অস্ট্রেলিয়া, ভারতের বিপক্ষে, দুটোতেই হেরে যাবে। নিউজিল্যান্ড খেলবে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ফলে ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ম্যাচটা বিশ্বকাপের সবচাইতে ইন্টারেস্টিং ম্যাচ হতে যাচ্ছে আমার অনুমান, এবং মোমেন্টাম বা ফ্লো অনুসারে নিউজিল্যান্ডের জেতার সম্ভাবনা বেশি।

ফলে নিউজিল্যান্ডের জয়ের সংখ্যা হতে পারে সর্বনিম্ন ছয়টি। ফলে তাদের তিন নম্বর দল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জয়ের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে সর্বোচ্চ ৫টি। যে কারণে চার নম্বর দল হওয়ার জন্য তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে হবে সাউথ আফ্রিকা আর বাংলাদেশের সাথে।

প্রশ্ন হতে পারে, ইংল্যান্ডকে কি আমি আন্ডারএস্টিমেট করছি? আইসিসির ইভেন্টগুলোতে সবচাইতে ইন্টারেস্টিং দল ইংল্যান্ড, তাদের ম্যাচগুলো খুবই এক্সাইটিং হয়। মনে পড়ে, কোনো এক চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ১৫০ রানের নিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৮বা ৯ টি উইকেট ফেলে দেয়ার পরও টেলএন্ডারদের দৃঢ়তায় অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচটি হেরে গিয়েছিল। প্রথম পাঁচ আসরের তিনবারই তারা ফাইনালে উঠেছিলো, একবারও জিততে পারেনি। তাছাড়া র্যাং কিংয়ের পেছনে থাকা দলের বিপক্ষে তারা খেলার ধারার বিপরীতে অনেক সময়ই হেরে বসে। তাদের বোলিং একেবারেই সাদামাটা, ব্যাটিংয়ে প্রায় প্রত্যেকেই স্ট্রোক প্লেয়ার, জো-রুট ব্যতীত ইনিংস বিল্ড আপ করা ক্যালিবারের ব্যাটসম্যানের অভাব, এবং জো-রুটের মেন্টাল স্ট্রেন্থ যথেষ্ট দুর্বল।

দ্বিপাক্ষীয় সিরিজে ধুন্ধুমার ব্যাটিং করলেও বড়ো টুর্নামেন্টে ওরকম ফ্রি-ফ্লাইং ব্যাটিং করার জন্য যে টাফনেস দরকার, ইংল্যান্ডের মধ্যে সেটার ঘাটতি আছে। এর প্রধান কারণ, তাদের টিম সংকর জাতিতে ভরপুর। বিভিন্ন দেশের প্লেয়ার তাদের হয়ে খেলে, যে কারণে একীভূত কোনো কালচার তাদের মধ্যে তৈরি হয় না, এটাই বড়ো টুর্নামেন্টে ভুগায় তাদের। ক্রিকেট তো কেবল ব্যাট-বলের খেলা নয়, এর সাথে সাইকোলজিকাল ফ্যাক্টরগুলো যোগ করতে হবে তো। একারণেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা আফগানিস্তান অন্য কোনো দলকে কলাপ্স করাতে না পারলেও ইংল্যান্ড তাদের শিকার হতে পারে।

সবশেষে বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক।

বাংলাদেশের প্রথম ২ ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকা আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ২০১৭ এর পরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আর খেলা হয়নি। ফিকচারের মেন্টাল এডভান্টেজ নিয়ে সাউথ আফ্রিকাকে হারোনোর সম্ভাবনা ভালোমতই রয়েছে। ২০১৭ এর জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে ওয়ানডে, টেস্ট সবগুলোতেই হেরেছিলো বাংলাদেশ, এরপর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আর আয়ারল্যান্ডের টুর্নামেন্টে তাদের হারিয়েছিলো। এবারও বাংলাদেশ একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। নিউজিল্যান্ডকে হারানো তাই খুবই বাস্তব সম্ভাবনা। ইংল্যান্ডের সাথে জেতার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এরপরে দুটো সহজ ম্যাচ- শ্রীলংকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এদের সাথে অবধারিতভাবেই জেতা উচিত। অস্ট্রেলিয়ার সাথে জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এই ম্যাচের ফলাফলে মুষড়ে না পড়লে আফগানিস্তানের বিপক্ষে নিশ্চিতভাবেই জিতবে। তবে টস এক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে চেইজ করতে হলে জেতার সম্ভাবনা কমে যাবে।

ভারতের ম্যাচটাকেও অনুশীলন ম্যাচ হিসেবে দেখি। শেষ ম্যাচ পাকিস্তানের বিপক্ষে। গত ৪ বছরে তারা ওয়ানডেতে কোনো ম্যাচ জিতেনি আমাদের বিপক্ষে। পাকিস্তানের ম্যাচটাকে যদি বাদ রাখি বাংলাদেশের জয় সংখ্যা থাকছে ৪-৫টি, এই ম্যাচের ফলাফলের উপর সুপার ফোরে যাওয়া না যাওয়া নির্ভর করবে। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সাধারণত ম্যাচ জিতে যায়।

তবে আগের ম্যাচটা ভারতের বিপক্ষে বলেই দুশ্চিন্তা থেকে যাচ্ছে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে জাতিগতভাবেই আমাদের মধ্যে মেন্টাল ব্লক কাজ করে, সিনিয়র প্লেয়াররা আরো বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ে। এই ম্যাচে বড়ো কোনো নার্ভাস ব্রেকডাউন ঘটলে মাত্র ২ দিনের ব্যবধানে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতলে বাংলাদেশের পক্ষে ৬টা ম্যাচ জেতা সম্ভব। তাতে ইংল্যান্ড বা সাউথ আফ্রিকাকে হটিয়ে ৪ নম্বর দল হওয়াটা অসম্ভব হবে না।

তবে এর মধ্যেও দুটো ভাইটাল ফ্যাক্টরের কারণে পয়েন্ট টেবিল উল্টাপাল্টা হয়ে যেতে পারে-

  • বৃষ্টির কারণে বেশ কিছু ম্যাচ পরিত্যক্ত হতে পারে, যা পয়েন্ট টেবিলে ভারসাম্য নষ্ট করবে।
  • ওয়েস্ট ইন্ডিজ যদি উপরের সারির ২-৩ টা দলকে হারিয়ে দেয়।

মূল টুর্নামেন্টের আগে পাকিস্তান আর ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের দুটো অনুশীলন ম্যাচ রয়েছে। অনুশীলন ম্যাচ খেলা হয় মূলত বেস্ট ইলেভেনের কম্বিনেশনের ঠিক করতে, প্লেয়াররা ইনজুরি বাঁচিয়ে মোটামুটি রিল্যাক্সড মুডে খেলার চেষ্টা করে, এসব ম্যাচের ফলাফল একদমই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কম্বিনেশন খুঁজে পাওয়াটাই আসল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গত আসরে প্রস্তুতি ম্যাচও টেলিভিশনে দেখানো হয়েছিলো। বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে ৮৪ রানে অলআউট হয়েছিল। জানি না এবার প্রস্তুতি ম্যাচ কোনো চ্যানেলে দেখানো হবে কিনা, যদি হয়ও এসব ম্যাচে কোনো প্লেয়ার খারাপ করলে বা দল হেরে গেলে সেগুলো নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় কোর্ট-মার্শাল না বসানোই মঙ্গলজনক হবে।

ছয়টা ম্যাচ জিততে হলে বাংলাদেশকে অতি মানবীয় পর্যায়ের ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে। প্রায় প্রত্যেক দলেই এরকম এক বা একাধিক খেলোয়াড় থাকে যারা একাই ম্যাচ শেষ করে দিতে পারে। আমাদের সেরকম কেউ নেই, আমাদের জিততে হলে কমপক্ষে তিন জন খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ কন্ট্রিবিউশন লাগে, আমরা রিদম আর টিমওয়ার্ক নির্ভর দল। তাই সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে যদি ইংল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকাকে সরিয়ে সুপার ফোরে জায়গা নিতে হয়, অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করতে হবে। সেইসব ফ্যাক্টর পর্যালোচনা করে চারটি মৌলিক ফ্যাক্টর নির্ধারণ করেছি, যেগুলোর কোনো একটি অপূর্ণ থাকলেও সুপার ফোরে উঠার সম্ভাবনা ফিঁকে হয়ে যেতে পারে।

  • ফ্যাক্টর ১

টুর্নামেন্টজুড়ে সৌম্য সরকারের ব্যাটিং গড় ৬১ এর আশপাশে রাখা। বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সৌম্যের ব্যাটিং গড় সবচাইতে বেশি। তার ২ সেঞ্চুরি আর ১০ হাফসেঞ্চুরি করার ইনিংসগুলোতে ১ টি বাদে সবগুলো ম্যাচেই জিতেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে চেইজ করতে গেলে সে আরও বেশি বিধ্বংসী হয়ে উঠে। তার বিস্ফোরক ইনিংসের বেশিরভাগই চেইজ করতে গিয়ে।

সৌম্য দাঁড়িয়ে গেলে কোনো রানকেই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। ২৪ ওভারে ২১০ যে এতো আরামসে চেইজ করে ফেললাম তার প্রধান কারণ সৌম্যের খুনে মূর্তি। সৌম্য যদি তার বর্তমান ফর্মটা ক্যারি করতে পারে এবং ব্যাটিং গড় ৬১ বা তার বেশি রাখে সেই আত্মবিশ্বাসে মিডল অর্ডারে ব্যাটসম্যানরা ফ্লো ধরে রাখতে পারবে।

  • ফ্যাক্টর ২

সাকিবের ইকোনমিক ৪.৫ এর নিচে রাখা। বাংলাদেশের বোলিং দুর্বল, একেবারে বেসিক বজায় রেখে বোলিং করতে পারাটাই যা ভরসা। তবু এর মধ্যে সাকিব আল হাসান এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। সে অসাধারণ কোনো টার্নার নয়, ভয়ংকর কোনো ডেলিভারি নেই স্টকে, কিন্তু সে জানে বলটা কোথায় পিচ করালে ব্যাটসম্যানের খেলতে অস্বস্তি হয়।

সেটা দিয়েই সে এক যুগ ধরে বিশ্বক্রিকেটে খেলে যাচ্ছে দোর্দণ্ড ধারাবাহিকতায়। সে যদি টুর্নামেন্টজুড়ে ইকোনমি ৪.৫ এর নিচে রাখতে পারে, নিশ্চিতভাবে উইকেটও পাবে, এবং তার এই নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের প্রভাবে অপরপ্রান্তের বোলারের উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ব্যাটিংয়ে যেমন জুটি বেঁধে খেলা হয়, বোলিংয়েও জুটি কাজ করে; খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে এটা হয়তোবা সবসময় বোঝা যায় না।

  • ফ্যাক্টর ৩

সবমিলিয়ে মুশফিকের ৭০১+ বল খেলা। মুশফিক সেই ব্যাটসম্যান যে যতক্ষণ ব্যাটিং করে মনে হয় আউট করতে পারবে না বোলাররা। যদিও শারীরিক গড়নে ছোট, তবু তার মতো ধারাবাহিক স্লগিং বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানকে করতে দেখি না। সে হয়তো অবলীলায় ছক্কা মারতে পারে না, কিন্তু অবিরাম চিকি শট খেলে রান বাড়িয়ে নিতে পারে।

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বাদে বাকিগুলোতে মুশফিক যদি নার্ভাস ব্রেক ডাউন না করে তবে বড়ো স্কোর গড়া বা চেইজ করা কোনোটাতেই চ্যালেঞ্জ বোধ করবে না। মুশফিক যদি টিকে যায় শেষে সাব্বির, নাকি মোসাদ্দেক খেলছে তাতে খুব বেশি পার্থক্য হবে না।

  • ফ্যাক্টর ৪

রুবেলের ৭৯+ ওভার বোলিং করার সুযোগ পাওয়া। গত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা যদি স্মরণ করি, মরগানকে আচমকা তুলে নেয়া, এবং শেষ মুহূর্তে ব্রড আর জেমস এন্ডারসনকে যেভাবে বোল্ড করেছিলো, বাংলাদেশের হয়ে যে বোলারই বোলিং করুক ওরকম কেউ কি করতে পারবে? ওই পরিস্থিতিতে যদি সাইফুদ্দিন বোলিং করতো, ব্রড ছক্কা মেরে দিতো তার স্লোয়ার কিংবা লো-ফুলটসে।

আগে ফিল্ডিং করলে ডেথ ওভারে সাইফের বোলিং দিয়ে হয়তোবা কিছুটা রান কমিয়ে রাখা যাবে, কিন্তু ডিফেন্ড করতে গেলে যেখানে উইকেট টেকিংই একমাত্র অপশন সেখানে রুবেলের বিকল্প তৈরি হয়নি। এশিয়া কাপ গেছে মাত্র ৭ মাস আগে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে শোয়েব মালিক প্রায় দাঁড়িয়ে গেছে, তখন আচমকা তাকে মাশরাফির ক্যাচ বানানো, কিংবা ফাইনালে মাত্র ২২২ ডিফেন্ড করতে গিয়েও ম্যাচটা ক্লোজ হলো, এর প্রধান কারণ রোহিত শর্মাকে ম্যাচের ধারার বিপরীতে আউট করে দেয়া।

এগুলোই রুবেলের ইমপ্যাক্ট। ফলে তাকে রান দেয়ার অজুহাতে বসিয়ে রাখাটা লড়াকু পরাজয়ের সম্ভাবনা বাড়াবে, ম্যাচ জেতাতে পারবে না। বাংলাদেশের সিংহভাগ দর্শক অবশ্য ক্লোজ ম্যাচ আর লড়াকু হার দেখলেই খুশি। বাংলাদেশ যদি প্রতিটি ম্যাচ ৫০ তম ওভারে গিয়ে সেটাই তাদের বেশি আনন্দ দিবে। তারা তখন আফসোস করতে পারবে, হাহুতাশ করবে, প্লেযারদের কান্নাবিজড়িত চেহারা দেখে সিমপ্যাথেটিক হবে। পক্ষান্তরে ৫টা ম্যাচ জিতে ৪টা ম্যাচে যদি ১২৭ রান বা ৯ উইকেটে হারে সেটাকেই আক্রোশের কারণ হিসেবে দেখবে। এই রক্ষণাত্মক মানসিকতার কারণেই আমরা বড়ো হতে পারি না কোনো ক্ষেত্রে, মিডিওকর থেকে যাই।

সাপোর্টিভ ফ্যাক্টর

অতিরিক্ত ৩টা সাপোর্টিভ ফ্যাক্টর উল্লেখ করি, যেগুলো ৪টি ফ্যাক্টরের সাথে যুক্ত হলে ম্যাচ জয়ের সংখ্যা ৫-৬টিথেকে ৭ এ উন্নীত হতে পারে।

  • তামিম ইকবালের ৩০৭+ রান করা। এটা মোটেই উচ্চভিলাষি টার্গেট নয়, ৯ ম্যাচে ৩৪ গড় রাখতে পারলেই অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু এটাই দলের ফাউন্ডেশন তৈরি করে দেবে।
  • মাশরাফির ১১+ উইকেট নেয়া। প্রথম স্পেলের ৬ ওভারে মাশরাফি যদি ১ টা করে উইকেট তুলে নিতে পারে, এটা ম্যাচের মোমেন্টাম নিজেদের অনুকূলে আনতে সহায়তা করবে। পরের ৪ ওভারের স্পেল মিলিয়েও ৯ ম্যাচে যদি তার ১১ উইকেট থাকে সেটা দলের জয়ের ভিত্তি তৈরি করে দিবে।
  • মাহমুদউল্লাহ’র স্ট্রাইকরেট ১০১+ রাখা এবং ২৩+ ওভার বোলিং করতে পারা। এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ফিফটি বাদে মাহমুদুল্লাহ নিকট বর্তমানে ওয়ানডেতে তেমন কার্যকর কোনো ইনিংস খেলতে পারছে না। এটা ভুগাতে পারে বাংলাদেশকে। সে যদি নিচের দিকে তার দায়িত্বটা পালন করতে পারে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না। পার্টনারশিপ ব্রেকার হিসেবে তার বোলিংটাও দুর্দান্ত। আশা করি, ৩য় বা ৪র্থ ম্যাচ থেকে সে বোলিং করতে পারবে।

অনারেবল মেনশন

  • মুস্তাফিজের ইকোনমি রেট ৬ এর নিচে রাখা এবং ৭+ উইকেট পাওয়া।
  • লিটন দাসকে প্রথম ৩ ম্যাচে একাদশে রাখা। যদি ৪১+ গড় ধরে রাখতে না পারে একাদশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া।
  • সাব্বির অথবা মোসাদ্দেকের মাহমুদুলাহ অথবা মুশফিককে ফিনিংশিংয়ে কার্যকরী সহায়তা দেয়া।
  • সাইফউদ্দিনকে ২০ ওভারের পরে বোলিংয়ে আনা।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিটি ম্যাচের আগেই প্রেডিকশন গেম এর আয়োজন করার প্রত্যাশা রইলো। প্রেডিকশন দিয়ে মানুষের থট প্রসেস আর দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাটা সহজ হয়।

হঠাৎই ওয়েস্টার্ন মিলনের গানের কয়েকটা লাইন মনে পড়লো, সেগুলো লিখে বিশ্রামে চলে যাচ্ছি –

ভুল বুঝে না যেও না প্রিয় সাথী

তুমি যেন আমার এ দুটি আঁখি।

আকাশের গৌরব লক্ষ তারা, বাতাসের গৌরব গতিরও ধারা

আমারই গৌরব তোমাকে দেখি

তুমি যেন আমার এ দুটি আঁখি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।