‘আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি’

খুবই দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ঋত্বিক ঘটককে চিনতে একালের অনেক চলচ্চিত্র দর্শকেরই গুগল করতে হবে। অথচ তিনি একেবারেই ঢাকার ছেলে। ১৯২৫ সালের চার নভেম্বর তাঁর জন্ম হয় এই শহরের ঋষিকেশ দাস লেনে।

মায়ের নাম ইন্দুবালা দেবী এবং বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার চলে যায় কলকাতায়। শরণার্থীদের অস্তিত্বের সংকট আর দারিদ্র-দুর্দশার চিত্র দেখা যায় হৃত্বিকের ছবিতে। বোঝাই যায়, দেশ বিভাগ তাঁর মনে কতটা গভীর ছাপ ফেলেছিল।

ঋত্বিক ছিলেন বাবা-মার জমজ সন্তান। তাঁর ১২ মিনিট ছোট এক জমজ বোন আছে। ঋত্বিক ১৯৭৬ সালের ছয় ফেব্রুয়ারি জীবন নদীর ওপারে চলে গেলেও তাঁর বোন প্রতিতী দেবী আজো বেঁচে আছেন। থাকেন এই ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতেই।

নি:সন্দেহে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক তিনি। বাঙালি ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত বিখ্যাত উপন্যাস থেকে নির্মিত ঋত্বিকের কালজয়ী সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। ১৯৭৩ সালের এই সিনেমাটি ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটে দর্শক, চলচ্চিত্র সমালোচকদের ভোটে সেরা ১০টি বাংলাদেশির চলচ্চিত্রের একটি বলে নির্বাচিত হয়েছে।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার একটি দৃশ্য

লোকে সিনেমা কেন বানায়? সহজ উত্তর, ব্যবসা করতে। কিংবা যদি বলি, দর্শক সিনেমা কেন দেখেন? বিনোদন পেতে। কিন্তু, ঋত্বিকের জন্য সিনেমা স্রেফ ব্যবসা বা বিনোদনের মাধ্যম ছিল না।

সিনেমাকে তিনি দেখতেন শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে। সিনেমা দিয়ে তিনি মানুষের মনের গোপন কুঠুরীতে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। তিনি সাফ বলে দিয়েছিলেন, ‘আমি প্রতি মুহুর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো যে, এটা কোনো ভেবে বের করা গল্প নয়। বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। সিনেমার কাজ মনযোগানো না, মন জাগানো। ফিল্ম মানে ফুল নয়, অস্ত্র।’

বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবন, সমাজ ও বাস্তবতাকে তাঁর চেয়ে ভাল ভাবে আর কেউ পর্দায় উপস্থাপন করতে পারেননি। এটা করতে গিয়ে কখনো তিনি হয়েছেন নন্দিত, কখনো হয়েছেন বিতর্কিত। যদিও, কখনোই নিজেকে ঘিরে চলমান নেতিবাচক আলোচনায় কান দিতেন না ঋত্বিক। কারণ, সিনেমাই  যে ছিল তাঁর জীবন, তাঁর অস্ত্র!

ঋত্বিক বাবুর ব্যক্তিগত জীবনটাও যথেষ্ট সিনেম্যাটিক।  ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ মানে একালের এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা দেননি, এমনই খামখেয়ালি ছিলেন তিনি।

স্ত্রী সুরমা ঘটকের সাথে

বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তিনি কবিতা ও নাটক লিখতেন। ঋত্বিকের বড় ভাই ঐ সময়ের খ্যাতিমান এবং ব্যতিক্রমী লেখক মনীশ ঘটক। তিনি একই সাথে ইংরেজির অধ্যাপক এবং সমাজকর্মীও ছিলেন। আইপিটিএ থিয়েটার মুভমেন্ট এবং তেভাগা আন্দোলনে মনীশ ঘটক জড়িত ছিলেন। মনীশ ঘটকের মেয়ে বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী। ঋত্বিক ঘটকের স্ত্রী সুরমা ঘটক ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা।

ঋত্বিক ঘটক তাঁর প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’ লেখেন ১৯৪৮ সালে। তিনি চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫১) সিনেমার মধ্য দিয়ে। সেখানে তিনি একাধারে অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। দু’বছর পর মুক্তি পায় তাঁর একক পরিচালনায় নির্মিত প্রধম সিনেমা ‘নাগরিক’। সিনেমাটি ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন এক নজীর স্থাপন করে।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২) অন্যতম। এই ট্রিলজিতে কলকাতার তৎকালীন অবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। তবে, সিনেমাগুলোর সমালোচনা এবং ‘কোমল গান্ধা’র এবং ‘সুবর্ণরেখা’র ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে এই দশকে তিনি আর নতুন কোনো সিনেমায় হাত দিতে পারেননি।

ঋত্বিক ঘটক ১৯৬৫ পুনেতে বসবাস শুরু করেন। যদিও সেখানে ছিলেন অল্প কিছুদিন। এসময় তিনি খ্যাতনামা ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার (এফটিআইআই) অতিথি শিক্ষক ছিলেন। পরে কিছুদিন ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস ও প্রিন্সিপাল।

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের জগতে প্রত্যাবর্তন হয় ৭০’র দশকে। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। অসুস্থতা এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। ভিন্ন ধাঁচের এই সিনেমাটি অনেকটা এই পরিচালকের আত্মজীবনীমূলক।

কে জানে, হয়তো ওপারের ডাকটা ততদিনে শুনতে পেয়েছিলেন। এর বছর দুয়েক বাদেই তিনি মারা যান। বাংলা সিনেমার জগৎ থেকে হারিয়ে যায় আরেকটি নক্ষত্র!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।