বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেও যে কারণে রেস্টুরেন্টে কাজ করতে চাই

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি রেস্টুরেন্টে কাজ করবো। বেশ কিছু দিন ধরে’ই মনে হচ্ছিলো হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করলে মন্দ হয় না।

এর প্রধান একটা কারণ হচ্ছে বিদেশের এই ছোট্ট শহরে যেই দুই একজন মানুষ’কে খুব করে ভালোবাসি কিংবা আমার এখানকার বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রী যারা আছে, তাদের প্রায় সবাই হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করে।

যে কোন আড্ডায় ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে এই সব হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ এবং কাজের জায়গার সহকর্মীদের আচার আচরণ ইত্যাদি নিয়ে।

এদের কথা শুনতে শুনতে আমারও মনে হয়েছে – একবার গিয়ে কাজ করে দেখলে মন্দ হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমার বোন!

ও এই শহরে এসছে বছর দেড়েক হয়। মাস দুয়েক আগে আমার এই বোনও শখের বসে এখানকার একটা রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেছে!

এরপর থেকে আবিষ্কার করলাম- ওর সঙ্গে যখনই আমার কথা হয়, এর ৯০ ভাগ আলোচনা হচ্ছে ওর রেস্টুরেন্টে কে কিভাবে কাজ করছে ইত্যাদি!

চারদিকে এতো সব মানুষকে হোটেল রেস্টুরেন্টে কাজ করতে দেখে আমার মাঝে সত্যি সত্যিই আগ্রহটা প্রবল হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পড়াতে আমার খানিকটা বিরক্ত বোধও চলে এসছে। তাই ভাবছিলাম- একটা রেস্টুরেন্টে কাজ নিলে মন্দ হয় না। কিছুটা রিফ্রেশমেন্টও হবে।

এছাড়া ভাবলাম, আশপাশের যেই মানুষ বা মানুষ গুলোকে খুব করে ভালোবাসি, তাদের কারো কাজের জায়গায় একটা কাজ নিয়ে নিলে সময় গুলো ভালো’ই কাটবে!

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না হয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকলাম, সন্ধ্যে থেকে রেস্টুরেন্টে কাজ করে বেড়ালাম মনের আনন্দে! ক্ষতি কি তাতে! কিংবা শিক্ষকতা না হয় আপাতত বন্ধ’ই থাকুক!

এরপর মনে হলো – আমি যদি এখন রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করি, তাহলে এই শহরে থাকা বাংলাদেশিরা আমাকে নিয়ে কে কি ভাববে!

এদের কেউ ভাববে মানুষ’টা টাকা ছাড়া মনে হয় আর কিছু’ই বুঝে না। অল্প কিছু টাকার জন্য শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে রেস্টুরেন্টেও কাজ শুরু করে দিয়েছে!

অন্য আরেক দল হয়ত ভাববে, এর মনে হয় আগে থেকেই মস্তিষ্কে বিকৃতি ছিল! নইলে এমন কাজ কেউ করে! আরেক দল হয়ত আরেক ধাপ এগিয়ে বলবে, পুরো বাংলাদেশের মান ইজ্জত’টাই ডুবিয়ে দিয়েছে! শিক্ষক হয়ে এই কাজ! ছি! ছি!

আমি মোটামুটি নিশ্চিত এই সব কথাবার্তা এরা বলে বেড়বে। কে জানে, হয়ত এর চাইতেও জঘন্য কিছু বলে বেড়াতে পারে। অন্তত আমার অভিজ্ঞতা আমাকে এমনটাই জানান দিচ্ছে।

অথচ গত সপ্তাহেই আমি এই নিয়ে আমার এখানকার বিদেশী সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করছিলাম। ওদের বলছিলাম, ইদানীং পড়াতে ভালো লাগছে না। খানিক বিরতি’র দরকার মনে হচ্ছে। ভাবছি রেস্টুরেন্টে কাজ করলে কেমন হয়। তাছাড়া আমার অনেক দিনের ইচ্ছে এই শহরের কোন রেস্টুরেন্টে কাজ করার।

আমার সহকর্মীরা তো রীতিমত উৎসাহ দিয়ে বলেছে, তোমার অবশ্য’ই উচিত হবে এই ইচ্ছেটা পূরণ করে ফেলা। তাছাড়া এতে তোমার কিছুটা রিফ্রেশমেন্টও হবে।

এই হচ্ছে ইউরোপিয়ান সহকর্মী। যারা নিজেরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু এই নিয়ে এর চাইতে বেশি কিছু এরা বলেনি কিংবা মাথাও ঘামায়নি। তাদের কাছে ব্যাপারটা স্বাভাবিক’ই মনে হয়েছে!

আর আমরা বাংলাদেশিরা, যে যেভাবে পারি অন্যকে ছোট করার চেষ্টা করি কিংবা তার মনোবল যে করে’ই হোক ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র আত্মহত্যা করেছে শুনতে পেলাম। এরা নাকি এদের ভবিষ্যৎ, পড়াশুনা এবং চাকরী নিয়ে হতাশার মাঝ দিয়ে যাচ্ছিলো। চাকরী না পাওয়ার জন্য’ই নাকি আত্মহত্যা করেছে।

তো চাকরী না পেয়ে আত্মহত্যা করতে হলো কেন এই ছেলেপেলে গুলোকে? কিংবা হতাশার মাঝে দিয়ে’ই বা যেতে হলো কেন? তারা কি সত্যি সত্যি’ই চাকরী পাচ্ছিল না?

হোটেল-রেস্টুরেন্টে’র কাজও কি তাদের কপালে জুটছিল না? কিংবা কোথাও সেলসম্যান বা মার্কেটিং টাইপ কোন কাজ? এই সব কাজও কি তাদের কপালে জুটছিল না?

আমি নিশ্চিত এই সব কাজ এদের পক্ষে পাওয়া কোন কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু এই সব কাজ করলে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কি বলবে!

মানুষজন বলবে- ঢাকা ইউনিভার্সিটি’তে পড়ে ছেলেটা এই কাজ করছে! ছিঃ ছিঃ… একে দিয়ে কিছু’ই হবে না! মানুষজনকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই!

এই ছেলেটাই হয়ত যে দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে ভর্তি হয়েছিল, সেদিন থেকে তারও হয়ত মাটি’তে আর পা পড়ত না!

বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি বা চান্স পায়নি তাদের হয়ত সে নিজেই পাত্তা দিতে চাইত না তখন! আর এই সব’ই হয়ত সে শিখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বড় ভাইদের কাছ থেকে।

তারা হয়ত শিখিয়েছে – আমরা’ই সেরা। অন্যরা আবার কিছু জানে নাকি!

কিন্তু বাস্তব তো ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যখন চাকরী পাওয়া যাবে না, তখন তো সেই অহংকার সব ধুলোয় কেবল মিশে যাবে না; ঝড় হয়ে ফিরে আসবে অন্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে। তখন তারা বলবে- ছিঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কেন চাকরী পাচ্ছে না?

অথচ বেঁচে থাকার জন্য, জীবনে কঠিন সময় গুলো পার করার জন্য ছোট একটা অবলম্বন হলেই তো হয়। যেই সময় টুকু’তে ভালো চাকরী খুঁজছে, সেই সময় টুকুতে না হয় কোথাও সেলস ম্যান কিংবা টিউশনি অথবা হোটেল- রেস্টুরেন্টেও কাজ করা যেতে পারে।

কিন্তু ওই যে বললাম- আমাদের কাজ’ই হচ্ছে অন্যকে কেবল’ই ছোট করা। এটা’ই আমাদের সংস্কৃতি। অথচ এই ছেলেপেলে গুলো’ই যখন বিদেশে আসছে- তখন কিন্তু তারা ঠিক’ই হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করছে। কারন এই সমাজে কোন কাজ’কেই ছোট করে দেখা হয় না।

অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েটরাও যেমন হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করে, ঠিক তেমনি যেই ছেলে কিংবা মেয়েটা কখনো ইউনিভার্সিটিতে যায়নি তারাও করে। এই নিয়ে কেউ ‘হায় হায়’ রব তুলে না!

আপনি যদি বাংলাদেশি হয়ে থাকেন, তবে বিষয় ভিন্ন। তখন আপনার কাজ হবে মনের মাধুরী মিশিয়ে অন্যের নামে গল্প বানানো এবং যে করেই হোক সেই গল্প’কে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে ছোট করা।

এই আমাকে’ই ছোট্ট এই শহরে এই সব কিছুর মাঝ দিয়ে যেতে হয়েছে। এই শহরে’ই এক ভদ্রলোক তো একবার আমার সম্পর্কে ফেইসবুকে একদম খোলা ময়দানে যা ইচ্ছে তাই লিখে ফেলেছিলেন!

অথচ আমি ওই ভদ্রলোকের নামও এর আগে কখনো শুননি, তাকে চিনি না, জানি না, কিছু’ই না! আমি আমার মতো করে নিজের জীবন যাপন করছিলাম।

তো একই শহরে থাকা অন্য বাংলাদেশিদের সেটা সহ্য হবে কেন! তাই তারা তাদের মতো করে আমার সম্পর্কে নানান গল্প বানানো শুরু করে দিল!

এই ভদ্রলোকের লেখা পড়ে আমার মনে প্রথম প্রশ্ন যেটা এসছে- একটা মানুষ আমাকে চেনে না, জানে না; কোন দিন দেখেও নি; সে কেন আমার সম্পর্কে এইসব লিখে বেড়াচ্ছে!

পরের দিন অবশ্য এই ভদ্রলোক নিজে’ই আমাকে ফোন করে তার বাসায় যেতে বললেন। অন্য যে কেউ হলে তার এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন না। কিন্তু আমার মনে হলো- ব্যাপারটা বুঝা উচিত।

গেলাম তার বাসায়। ভদ্রলোককে দেখে আমার বেশ চমৎকার মানুষ মনে হয়েছে। কথা বলার পর ভদ্রলোক নিজে’ই তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং তিনি নিজেই বললেন- ব্যাপারটা ভুল হয়েছে।

এরপর থেকে আমরা মোটামুটি বেশ ভালো বন্ধু বলা যেতে পারে। কারণ মানুষ হিসেবে আমার তাকে পছন্দ হয়েছে। তাছাড়া যে কেউ ভুল করতেই পারে। কেউ একজন না জেনে আমার সম্পর্কে কিছু একটা লিখে ফেলেছে বলে আমার তাকে আজীবন ঘৃণা করতে হবে এমনও তো না।

একবার আমি এমনকি অনেকের সামনে বলেও দিয়েছি- এই ভদ্রলোক’কে আমার বেশ ভালো’ই লাগে।

তো, আমরা বাংলাদেশি বলে কথা! সেটা আবার অন্য বাংলাদেশিদের ভালো লাগবে কেন!

একদিন এই শহরেই থাকা আরেক বাঙালি আমাকে প্রশ্ন করে বসেছেন, শুনেছি আপনি নাকি উনার বাসায় গিয়েছিলেন ক্ষমা চাইতে?

শুনে তো আমার চোখ কপালে উঠার জোগাড়! যেখানে আমি কোন অন্যায়’ই করিনি, ক্ষমা চাইবার প্রশ্ন আসছে কেন!

আমি অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো বলেছি, হ্যাঁ শুধু ক্ষমা না সঙ্গে উনাকে হুমকিও দিতে গিয়েছিলাম, আপনার কি এতে কোন সমস্যা আছে? এই লোক আর কিছু বলেনি। এই হচ্ছে আমাদের চারিত্র।

আমরা কারো ভালো দেখতে পারি না। এক জনের সঙ্গে আরেক জনের ভালো সম্পর্কও আমাদের ভালো লাগে না এবং ক্রমাগত আমরা চেষ্টা করে বেড়াই অন্যকে ছোট করার এবং সম্পর্ক গুলো কিভাবে ভাঙা যায়!

এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েরর ছাত্র-ছাত্রীরা দেশে ক্রমাগত হতাশ হয়ে যাচ্ছে কিংবা আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে যাচ্ছে, এর কারণ কিন্তু আমরা এরা নিজেরা’ই।

সমাজ বিজ্ঞানের একজন ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে বলতে’ই হচ্ছে- অন্যকে ছোট করার যেই সংস্কৃতি আমরা আমাদের সমাজে চালু রেখেছি, সেটা এখন এতো’টা বিস্তার লাভ করেছে, এখন আমরা আর নিজেদের কথা না ভেবে অন্যরা কে কি করছে বা ভাবছে সেটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।

এতে করে আস্তে আস্তে আমাদের মাঝে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বিশ্বাস একদম কমে যাচ্ছে। যার কারনে সমাজে মানসিক ভাবে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে হতাশা গ্রস্ত মানুষ এবং আত্মহত্যার সংখ্যা।

‘আমি’ই সেরা, অন্যরা আবার কিছু জানে নাকি!’ কিংবা ‘আরে ওর কোন বেইল আছে নাকি’ – এইসব ভাবনা চিন্তা বাদ না দিলে, একদিন সেটা দ্বিগুণ হয়ে ফেরত আসবে আমার-আপনার কাছে এটাই স্বাভাবিক।

প্রত্যেক মানুষেরই একটা গল্প থাকে; সেই গল্প’টা না শুনেই তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়ার যে সংস্কৃতি আমরা তৈরি করেছি, সেই সংস্কৃতি’ই তরুণ সমাজকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে।

যে ছেলেটা ঠিক মতো শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারছে না বলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, সেই ছেলেটা’ই হয়ত একদিন জটিল রোবট বানিয়ে ফেলতে পারবে।

যেই ছেলেটা ভালো ইংরেজি জানে না বলে হাসাহাসি করছেন, সেই ছেলেটা’ই হয়ত একদিন আমেরিকার নাসায় বসে চন্দ্র-সূর্য কিংবা মঙ্গল গ্রহের হিসেব কষবে!

গ্রাম থেকে আসা যেই ছেলেটাকে দেখে আপনি আন-স্মার্ট ভাবছেন, সেই ছেলেটা’ই হয়ত একদিন টেলিভিশনের পর্দায় টকশোতে ঝড় তুলবে।

প্রতিটা মানুষকে প্রতিভা দিয়ে পাঠানো হয়েছে। বিকশিত হতে কারো হয়ত একটু বেশি সময় লাগে, কারো হয়ত কম!

জগতের উন্নত সমাজ গুলোর মানুষরা তাই যে যার মতো করে যে যার কাজ করে বেড়ায়। কেউ কাউকে ছোট করে কথা বলে না। অনুৎসাহিত করে না।

যার কারনে আমি রেস্টুরেন্টে কাজ করতে চাইছি দেখেও আমার সহকর্মীরা আমাকে উৎসাহ’ই দিয়েছে। কারন তারা জানে, এতে করে হয়ত আমার মানসিক এবং শারীরিক বিকাশ হবে।

আর আমরা? এই নিয়ে হাজারটা গল্প বানিয়ে ইচ্ছে মতো রটিয়ে এক’ই মানুষ’টাকে পরক্ষ ভাবে হত্যা করার চেষ্টা করি।

কারণ আমরা কাউকে উৎসাহ দিতে জানি না। ছোট বেলা থেকেই অন্যকে ছোট করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে আমরা বড় হতে থাকি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।