নারীর কোনো বন্ধু আদৌ আছে কি!

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর মেয়েকে বলেছিলেন, ‘মা, এই পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজন খারাপ বাবাও নেই।’

আসলেই কি তাই? কথাটা আমার কাছে নির্জলা মিথ্যা অথবা কন্যার প্রতি বাবা হুমায়ুনের নিষ্ঠুর ঠাট্টা মনে হয়। পৃথিবীতে অসংখ্য বাবা ছিলো, এখনও আছে, যারা নিজেরই কন্যার সবচেয়ে বড় শত্রু। অন্ধকার যুগে কন্যাকে জীবন্ত দাফনকারী বাবা যেমন ছিলো, তেমনি এই যুগে কন্যানিগ্রহকারী বাবার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। আর এই মহান ভারতে নিজ হাতে কন্যাকে দাহ করার ইতিহাস তো এই সেদিনের!

একজন নারীকে যত প্রতিবন্ধকতা ঠেলে সামনে এগোতে হয়, অনেক সময় তা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নারী নিগৃহীত হয় ঘরে, নিগৃহীত হয় বাইরে। নারী নির্যাতিত হয় নারীবিরোধী কর্তৃক, নির্যাতিত হয় নারীবাদী কর্তৃক।

নারী গাড়িতে ওঠে, পুরুষ হাত মারে নারীকে। বাসে চলে, দশপুরুষ ডলা দেয় নারীকে। ভীড়ের মধ্যে চলাফেরারত নারীর দেহে স্পর্শ করে, কামনার দৃষ্টি হেনে বিকৃত স্বাদ নেয় পুরুষ। একাকী পথচলা নারীকে শিস মারে কামুক পুরুষ। সুযোগমত পেলে ধর্ষণের মওকাও হাতছাড়া করে না। কিছু বিকৃতমস্তিষ্ক আবার পোষাকের অজুহাত দেখিয়ে এসবের বৈধতা দেয়। কেউ আবার নারীকে কেবল ঘরে আবদ্ধ রেখে সমাধান খোঁজেন।

কিন্তু ঘরেও কি নারী নিরাপদ? সহজ কথায়, না। আমাদের পরিবারগুলোও এখন আর নারীর জন্য নিরাপদ কোন জায়গা নয়। বাপ-চাচা, ভাইদের হাতেও নারী এখন অহরহ ভিক্টিম হচ্ছে। ভাইয়ের হাতে বোন, বাবার হাতে মেয়ে নিগৃহীত হওয়ার বহু ঘটনা জানি। এসব পত্রপত্রিকা থেকে নেয়া কোন খবর না; আমার চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা!

আমার দূরসম্পর্কের এক ভাইয়ের কলেজেপড়া ছেলে তার ৬ বছর বয়সী বোনকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে, চিৎকার শুনে বাবা-মা ও আশেপাশের মানুষ এসে মেয়েটিকে উদ্ধার করেছে। ভয়ানক বিষয় হলো সেই ভাই-ভাবি এখন ভিক্টিম মেয়েটিকে ধর্ষনের চেষ্টাকারী সেই ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় একই বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে দিয়েছে! আমার পরিচিত এক পরিবারে ২৫ বছর বয়সী ভাইয়ের হাতে ৯ বছরের বোন বহুবার যৌন হেনস্তার শিকার হয়েও মুখ খুলে নি লজ্জায় ও ভয়ে!

ভাবা যায় সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র নারীর জন্য কতটা প্রতিকূল হয়ে ওঠেছে? প্রতিনিয়ত নারীরা হিংস্র পশুদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে। আর এসব দুপাঅলা পশুরা আমাদের আশেপাশেই বিচরণ করে। এরা ভালো মানুষের মুখোশ পরে হরহামেশা এসব কুকীর্তি করে যায়, অথচ আমরা এদের চিনতে পারি না।

এই সমাজে নারীর আসলে কোন বন্ধু নেই। এই যে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীবাদের আস্ফালন- এসব দিয়েও নারীর উন্নয়ন হবে না। নারীর ক্ষমতায়নের পথটাও অনেক ক্ষেত্রেই আজ নোংরা।

আজকের জান্নাতুন নাঈম প্রীতি, নেত্রী মিলি, অদিতি বৈরাগীদের প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরেই আসছে। বার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে বার বার। এমন নজীর আর কত দেখা যাবে? কোথায় হবে এর শেষ?  তবু কামনা করি, আশ্রয়হীন নারী তার ন্যায্য নিরাপত্তা পাক। বন্ধুহীন নারী ভালো থাকুক; ঘরে ও বাইরে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।