অবিশ্বাস্য সাফল্য, অনন্য মাইলফলক

মেয়েদের এশিয়া কাপ আগে ৬ বার হয়েছে। ৬ বারই চ্যাম্পিয়ন ভারত। কোনোবারই একটি ম্যাচও হারেনি।

গত বছর ইংল্যান্ডে ওয়ানডে বিশ্বকাপে রানার্স আপ ভারত। চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি অল্পের জন্য। বিশ্ব ক্রিকেটে ভারত বড় দল। আর এশিয়ার ক্রিকেটে প্রবল পরাক্রমশালী। অপ্রতিরোধ্য। একরকম অপরাজেয়।

সেই দলকে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদশের মেয়েরা। বেশ দাপটে হারিয়েছে। অভাবনীয় ঘটনার স্বাক্ষী ক্রিকেট তো কতবারই হয়েছে। এটিকে রাখতে হবে একদম প্রথম দিকে।

নিজের কথা বললে, আমি ভাবতে পারিনি। সুদূরতম কল্পনাতেও না। আগের ম্যাচে পাকিস্তানকে হারানোর পরও না। আজকে দল যখন জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও বিশ্বাস হচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিল, শেষে গিয়ে ঠিক কোনো ভজকট পাকাবে। হয়নি। এভাবে ভুল প্রমাণিত হওয়া দারুণ আনন্দের!

ভারত ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই শুধু নয়, জয়টি অভাবনীয় জয়ের ধরণের কারণেও। লক্ষ্য ছিল ১৪২। এত রান তাড়া করা তো দূরের পথ, টি-টোয়েন্টিতে সব মিলিয়েই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর ছিল কেবল ১৩৭। মেয়েরা আজ নিজেদের ছাড়িয়ে গড়েছে নতুন ইতিহাস।

রেকর্ড গড়া জয় ধরা দিয়েছে রেকর্ড গড়া ইনিংস আর জুটিতে। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল শামিমা সুলতানার ৫০। ফিফটিও ছিল একটিই। ফারজানা হক আজ সেটি ছাড়িয়ে অপরাজিত ছিলেন ৫২ রানে।

রুমানা আহমেদের সঙ্গে ফারজানার অপরাজেয় জুটি ৯৩ রানের। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জুটি।

এমনিতেই সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের মেয়েদের ক্রিকেটের মুখ বলা যায় রুমানা আহমেদকে। এই যে বাংলাদেশের মেয়েদের অনেকেই এত দিন ধরে খেলছে, সবচেয়ে বেশি উন্নতি চোখে পড়ে রুমানার খেলাতে, তার অ্যাপ্রোচ-ভাবনাতে। এই জয়টিও তার অসাধারণ পারফরম্যান্সেই। ভারত যখন বড় স্কোরের পথে ছিল, তার ২১ রানে ৩ উইকেট ও একটি রান আউট শেষ দিকে থমকে দিয়েছে ভারতকে। এরপর ব্যাট হাতে দুর্দান্ত জুটির অংশীদার, নিজে ৩৪ বলে অপরাজিত ৪২। প্রতিপক্ষ-পরিস্থিতি-বাস্তবতা বিবেচনায় সামগ্রিক ভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্মরণীয় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সগুলো একটি।

শামিমা সুলতানার কথাও আলাদা করে বলতে হবে ছোট্ট করে। পাকিদের হারানো ম্যাচেও রান তাড়ায় জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন এই ওপেনার। এদিন বড় রান তাড়ায় ইনিংসটা গতি পেয়েছে তার ২৩ বলে ৭ চারে ৩৩ রানের ইনিংসে।

পর পর দুই ম্যাচে বাংলাদেশ হারাল বর্তমান রানার্স আপ ও চ্যাম্পিয়ন দলকে। তবে শুধু ভারত-পাকিস্তানই নয়, বাংলাদেশের মেয়েদের অদৃশ্য প্রতিপক্ষ ছিল আরও। সরাসরি বললে, নিজেদের বোর্ড। বোর্ডের দৃষ্টিভঙ্গি।

জাতীয় লিগের ম্যাচ ফি ৬০০ টাকা নিয়ে কিছুদিন আগে তোলপাড় কম হয়নি। সেটা ছিল দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রমাণ। ঘরোয়া ক্রিকেট হয় না নিয়মিত। এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ হয়নি, হবেও না নিশ্চিত। নিয়মিত নেই ক্যাম্প, ট্রেনিং। মাসের পর মাস বসে থাকতে হয় বেকার, খেলা আর ট্রেনিং শুরুর অপেক্ষায়। নাই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। নাই ভাবনা। স্রেফ খেলাতে হয় বলে খেলানো হয়।

এই যে কদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গেল মেয়েরা, ১৪ মাস পর সেটি ছিল মেয়েদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ। টানা ১৪ মাস, ভাবা যায়…! ওই সফরে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছিল ১৭ মাস পর! ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক, কোনো খেলা নেই। দলটা উন্নতি করবে কিভাবে!

বোর্ড শুধু বলে টাকা নেই। মেয়েদের ক্রিকেটে তো শুরুতে টাকা আসবেই না। অন্যান্য খাত থেকে এত এত টাকা বোর্ডের, সেখান থেকেই তো বিনিয়োগ করতে হবে মেয়েদের ক্রিকেটে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-ভারত এভাবেই উন্নতি করেছে। আমাদের বোর্ডের টাকার অভাব নেই, কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটের বেলায় টাকা নেই।

দল খুব বেশি এগোতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে ক্রিকেটারদেরও দায় আছে। তবে বোর্ড আর সিস্টেমের দায় এত বেশি যে ক্রিকেটারদের দায়টুকু বলাই দায়! মিডিয়ার একজন হিসেবে, আমাদের দায়টুকুও মেনে নিচ্ছি। আরেকটু বেশি গুরুত্ব ওদের প্রাপ্য ছিল।

তো সেই সিস্টেম, সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে আশা করি বড় একটা নাড়া এবার দিতে পেরেছে মেয়েরা। পরপর দুই ম্যাচে ভারত-পাকিস্তানকে হারানো যে কোনো মানদণ্ডেই অবিস্মরণীয় সাফল্য।

আর ভারতের বিপক্ষে জয়টি, আবারও বলছি, ছেলে-মেয়ে মিলিয়েই আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে স্পেশাল জয়গুলির একটি। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর মতো এই জয়টিও আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি মাইলফলক জয় হয়ে থাকবে।

শুধু অভিনন্দনই যথেষ্ট নয় ওদের জন্য।

– ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।