জায়রা ওয়াসিম প্রসঙ্গ ও শিল্পের হাঙ্গর ভরা নদী

অভিনেত্রী জায়রা ওয়াসিমকে নিয়ে যে বিতর্কটা হচ্ছে তা কিছুটা একপেশে। মূলত বিগত পাঁচ বছরে জায়রার ব্যক্তিগত জীবনে যা ঘটে গেছে তার সম্পর্কে কিছু না জেনে মন্তব্য করার কারণেই এমনটা হচ্ছে।

কট্টরপন্থী মুসলিমরা জায়রার সিনেমা ছাড়ার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে। অনেকে তাকে বোন সমবোধন করে এমন সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা নিজেরা যে হিন্দি মুভি দেখা ছেড়ে দিয়েছেন তাও নয়৷ তারা প্রায় সবাই হিন্দি মুভি দেখেন। জায়রা অভিনয় না করলেও তারা কারিনা,ক্যাটরিনা, দীপিকা, আনুশকা এমন কি সানি লিওনের মুভি দেখবেন এটা নিশ্চিত বলা যায়। উপমহাদেশের লাখো কোটি মুসলমান কেয়ামত পর্যন্ত হিন্দি ছবি দেখবেন বলেই অনুমান করি। তবু জায়রাকে ‘স্যালুট বোন’ বলে তারা একধরণের তাৎক্ষণিক ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের আত্মতৃপ্তি অনুভব করে।

প্রগতিশীল, সেকুলার ও নিধার্মিক ওপিনিওন লিডাররা জায়রার এই সিদ্ধান্তে বিরক্ত হয়েছেন। সমালোচনার ক্ষেত্রে কিঞ্চিত অসহিষ্ণুও হয়েছেন কেউ কেউ। জায়রার মত আর কেউ সিনেমা ছেড়ে ধর্মে মতি হননাই এমনটা বলা যাবেনা। এটা নতুন কিছুনা।

আশির দশকের সেক্স সিম্বল নায়িকা মন্দাকিনী এখন বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারক ও ধ্যানগুরু। নব্বইয়ের হট নায়িকা মমতা কুলকার্নিও একই পথে হেঁটেছেন। সিনেমা ছেড়ে পুরোদস্তুর ধর্মকর্ম করছেন। আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথেও ঘনিষ্ঠতা রেখেছেন। ওদিকে সম্প্রতি পশ্চিম বঙ্গের নায়িকা নুসরাত হিন্দুপাত্র বিয়ে করে সিঁথিতে সিঁদুর পরেছেন। এটা আবার মানতে পারছেন না অনেকেই।

বাংলাদেশের বিউটি কুইন শাবানা বা ববিতাও হিজাবি হয়েছেন। শাবানা তো রীতিমত তাঁর অভিনীত সিনেমা নিয়ে এখন শরমিন্দা। অঞ্জুঘোষ এফ কবীর চৌধুরিকে বিয়ে করে মুসলিমান হয়েছিলেন। পরে আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে যান৷ ইসলামের ছায়া তাঁকে খুব একটা প্রভাবিত করেনি। সে যাই হোক, মানুষ তার জীবনকে তার মত করেই উপলব্ধি করবে ও উপভোগ করবে এটাই সত্য৷ এটাই হওয়া উচিত৷

কিন্তু জায়রার এই সিদ্ধান্ত সবাইকে এতটা বিচলিত বা আনন্দিত করেছে কেন? কারণ এখানে অসংখ্য টুইস্ট আছে৷

আমি বছর খানেক ধরে জায়রার ফেসবুক ও টুইটার ফলো করছি। আমি হিন্দি ছবি দেখি কালে ভদ্রে। ভাল রিভিউ পেলে ও প্লট পছন্দ হলে তবেই আগ্রহ নিয়ে মুভি দেখি। এভাবেই আমীর খানের ইদানিং কালের প্রায় সবগুলি মুভিই দেখে ফেলেছি। ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ দেখার পর আমি মূগ্ধ, আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েছি। এরপরই জায়রাকে নিয়ে আগ্রহী হই৷ তার সম্পরকিত বিভিন্ন ফিচার ও কন্টেন্ট পড়ি। ফেসবুক টুইটারে তো আছিই।

আসলে বিগত পাঁচ বছর যাবত জায়রা ওয়াসিম নামের এই মধ্যবিত্ত পরিবারের কাশ্মীরি মুসলিম বালিকাটির জীবন প্রায় দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। এতটাই দুর্বিসহ যে সেটা একটা টিনএজ মেয়ের পক্ষে বহন করা কঠিন। ‘দাঙ্গাল’-এর পোস্টার থেকে শুরু হয় এই হয়রানি। চুল কাটা জায়রা ওয়াসিমকে নিয়ে শুরু হয় সাইবার বুলিং। দাঙ্গালের কাহিনীতো আপনারা জানেনই।

ইসলামী মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে সিনেমায় অভিনয় করছে বলে জায়রাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি ভারতের অসংখ্য গোড়া মুসলিম। এরপর কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রী তাঁর সাথে মিটিং করে এবং তাঁকে কাশ্মীরী মেয়েদের আইকন বলে অভিহিত করে৷ এটা আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে জায়রার জন্য। ক্রমশ পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। জায়রাকে নিয়ে কাশ্মিরে মিছিল হয়, পোস্টারিং হয়। সাইবার বুলিং, হত্যার হুমকি তো আছেই। তার বাবা একজন বেসরকারি কোম্পানির চাকুরে, মা শিক্ষিকা। নির্বিরোধী মধ্যবিত্ত।

জায়রা ওয়াসিমের দ্বিতীয় ছবি ‘সিক্রেট সুপারস্টার’। এখানেও সে এক অচলায়তন ভাঙা কিশোরী। অত্যাচারী মুসলিম পিতার কন্যা যে সহজাত সঙ্গীত প্রতিভা দিয়ে দেশজোড়া সুনাম কুড়ায়। রক্ষণশীল, অসভ্য পিতার অত্যাচার থেকে সে মাকে উদ্ধার করে। বোরকা ছুড়ে দিয়ে সে সুপারস্টারের বেশে এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। এই ছিল শেষ দৃশ্য।

এই ছবির পর একজন হিন্দুবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা জায়রাকে প্রথাভাঙা এক আইকন গার্লের মর্যাদা দেয় এবং বলে এভাবেই বোরখা ছুড়ে ফেলতে হবে। যা খোদ জায়রাকেই বিব্রত ও ভীত করে। জায়রা তার প্রতিবাদও করে। কিন্তু তাতে লাভ হয়না। আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে। এরপর জায়রার জীবনে নেমে আসে আরো সমালোচনা ও হয়রানির বোঝা।

বাড়ির বাইরে বের হতে পারেনা৷ স্বাধীনমত শপিংমলে যেতে পারেনা। ক্লাস শেষে স্কুলের সামনে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারেনা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেতে পারেনা। সবে বয়ঃসন্ধি পার করা একটি মেয়ের জীবন তলিয়ে যায় একদিকে স্টারসুলভ খ্যাতি, অন্যদিকে সমালোচনা ও মৃত্যু ভয়ের কাছে।

জায়রার টুইটে ছিল তীব্র হতাশার ছাপ। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন সে বিমানে তার উপর হওয়া এক্টি যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করে। অনলাইনবাসী পুরুষতান্ত্রিক আমজনতা চিরাচরিত কায়দায় জায়রাকে নিয়ে আরো হয়রানি মূলক মন্তব্য লিখতে থাকে।

জায়রা এক পর্যায়ে গভীর হতাশায় ডুবে যায়। টানা দুই বছর সে সাইকিয়াট্রিস্ট এর তত্ত্বাবধায়নে থেকে ওশুধ খায়। জায়রা তার ফেসবুকে ও টুইটে লিখেছিল যে সে প্যানিক ডিজঅর্ডার ও ডিপ্রেশনে এতটাই বিপর্যস্ত যে একাধিকবার আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিল। ওষুধগুলির ভয়ংকর সাইড ইফেকটের কথাও সে লিখেছিল। বোঝা যায় বাচ্চা মেয়েটি একটা ভয়াবহ মেন্টাল ট্রমার ভেতর দিয়ে গেছে।

নিরপত্তাহীন, উগ্র মুসলিম জাতীয়তাবাদী সমাযে অভিনয় শিল্পী হয়ে বেঁচে থাকার জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা ও রেবেল স্পিরিটের দরকার তা জায়রার ছিলনা। এই না থাকাটা তার দোষ না। এত বৈরিতা আমিও সইতে পারতাম না।

ভারতবর্ষে মুসলিম অভিনেত্রী ছিল না, বা নেই এমন না। জায়রার মূল অপরাধ তাঁর সিনেমার কন্টেন্ট। তাঁর অভিনীত দুটি সিনেমাই একই সাথে ধর্মীয় ও সামাজিক গোড়ামির বিরুদ্ধে। সেই সাথে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক শিল্পিত চপেটাঘাত। দুইটিতেই সে অচলায়তন ভাঙা কিশোরি। বরং গতানুগতিক নাচ গান আর গ্ল্যামার নির্ভর সিনেমা করলে আমার ধারণা জায়রাকে ইমান ধ্বংস নিয়ে এতটা ভাবতে হত না। তাঁর এত শত্রু পয়দাই হত না!

ইসলামী শরীয়ত মতে সিনেমা হারাম। জায়রা বা তার পরিবার এটা জানতোনা তা নয়। সিনেমায় গিয়ে ইমনাদার মুসলিম হতে না পেরে সিনেমা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই কিছুটা স্ববিরোধী ও হাস্যরসাত্মক।

তবে আমাদের জায়রার বাস্তবতা বুঝতে হবে৷ মেয়েটি সত্যিকার অর্থেই অসহায়৷ কোনদিকেই মুক্তি পাচ্ছেনা সে। দুদিক থেকেই দড়ি টানাটানি চলছে। বলিউডের আর সবার মত স্টারকিড না সে। একটি রক্ষণশীল সমাজে বেড়ে ওঠা মেয়ে। যার পরিবার এরকম চাপ নিতে প্রস্তুত নয়। নিজেও এই বিড়ম্বনা হজম করতে পারছেনা।

শিল্পের পথ চিরকালই হাঙ্গর ভরা নদী৷ উপমহাদেশের একটি মুসলিম কিশোরীর জন্য এই পথ অনেকবেশি বিপদসংকুল।

তবু জায়রা ভাল থাকুক এটাই কামনা করি। মানসিক ভাবে সুস্থ ও নিরাপদ থাকুক। যেভাবেই থাকুক, নির্বিঘ্ন শান্তিতে থাকুক। আপাতত এটা চাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু বলার নেই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।