কেন মানুষ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন করে!

ঢাকার আরামবাগ ফুটবল ক্লাবটার বয়স কিন্তু নেহায়েৎ কম না। কাগজে কলমে হিসাব করলে পাক্কা ৬০ বছর। তারপরও এই ক্লাবের সমর্থক গোষ্ঠী আবাহনী কিংবা মোহামেডানের চেয়ে কম কেন? উত্তরটা খুবই সহজ – সাফল্য!

যতই বলা হোক না কেন ‘জয়-পরাজয় নয়, অংশগ্রহণই মূল’, তারপরও এটাই সত্যি যে, খেলোয়াড়রা ছোটেন সাফল্যের পেছনেই। সাফল্য না থাকলে না চলবে তাঁদের সংসার, না হবে ফ্যানবেজ।

চলুন বাংলাদেশের ফুটবল আর ক্রিকেটের পুরনো একটা তুলনা করি। আশি কিংবা নব্বই-এর দশকের তুমুল আলোচিত ফুটবল তাঁর জনপ্রিয়তা কেন ক্রিকেটের কাছে হারালো? স্রেফ সাফল্য। অনেকে স্পন্সরশিপ কিংবা আর্থিক দিক আনবেন, কিন্তু সেসব ধোপে টিকবে না কারণ, এর সবই সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল।

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে যাওয়ার জন্য আকরাম-বুলবুলদের সামান্য জার্সি-বিমানের টিকেটের জন্য কতজনের কাছে ধরণা দিতে হয়েছিল সেসব নিশ্চয়ই কারো অজানা নয়। আজ সেসব জটিলতা নেই কারণ, সাফল্য আছে। এখন স্পন্সররা যেচে পড়ে আগ্রহ দেখায়।

এই পথটা সুগম করেছে আন্তর্জাতিক সাফল্য। এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সাফল্য। যেখানে স্পন্সররা নিশ্চিত নয় যে বাংলাদেশ ফুটবল দল বিশ্বকাপ তো দূরের কথা এশিয়া কাপ ফুটবলের মূল পর্বে আদৌ কখনো খেলতে পারবে কি না, সেখানে তাঁরা অর্থ ব্যয় করবেই বা কেন! অন্যদিকে ক্রিকেটে সব ফরম্যাটে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ একরকম নিশ্চিত, সাফল্যও এখন আসছে অনায়াসে। আসছে জনপ্রিয়তা, সেই হাত ধরেই আসছে অর্থ।

এবার না হয়, ইউরোপিয়ান ফুটবলের দিকে তাকাই। সমর্থক গোষ্ঠী বিবেচনা করলে এগিয়ে থাকবে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবা লিভারপুল। এখানেও ঐতিহ্যও যেমন ফ্যাক্টর, এর সাথে সাফল্যও ফ্যাক্টর। আর তাই তো চেলসি কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির মত নব্য শক্তিগুলোরও সমর্থক গোষ্ঠী নেহায়েৎ সামান্য নয়।

এই কথাগুলো বিশ্ব ফুটবলেও খাটে। ‘হুজুগে সমর্থকদের’ কথা বাদ রেখে বলি, লোকে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা কেন সমর্থন করে? সাফল্য দেখে করে। ব্রাজিলের সাফল্যের কথা তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই। আমাদের পূর্বপুরুষরা ৭০-এর ব্রাজিল দেখেছে, ৮২’র সুন্দর ফুটবলের ধারকদের দেখেছে। ফ্যান বেজ গড়ে ‍উঠেছে। তাঁদের উত্তরসুরী হয়ে আমরা ১৯৯৪ কিংবা ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জয় দেখেছে। ক্লাব ফুটবলে রোনালদো, রিভালদো কিংবা রোনালদিনহো-কাকাদের সাফল্য দেখেছি, আমাদের সমর্থন আরো প্রবল হয়েছে।

উপমহাদেশে আর্জেন্টিনার ফ্যানবেজ তৈরি করে দিয়ে গেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। এই ভদ্রলোক এখন যতই উল্টাপাল্টা বকুক না কেন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্সে গোটা বিশ্ব তো বটেই আমাদের বাবা-চাচারাও বুঁদ হয়ে থাকতেন রঙিন টেলিভিশনের সামনে। সেই মোহ তাঁদের এখনো কাটেনি। সেই সাফল্য তাঁরা পরের কয়েকটা বিশ্বকাপে খুঁজে ফিরেছেন।

এখন যারা আর্জেন্টাইন সমর্থকরা, তাদের একটা অংশ আগের প্রজন্মের ধারক। বাকিরা লিওনেল মেসিকে দেখে আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়েছেন। তারা চান ক্লাব ফুটবলে মেসির সাফল্য আসুক জাতীয় দলেও। ফলে, যেভাবেই দেখেন না কেন এখানে ফ্যাক্টর কিন্তু ওই সাফল্যই।

এখন কেউ কেউ পর্তুগাল সমর্থন করেন। এই গোষ্ঠীটা রোনালদো কিংবা ফিগোদের যুগের আগে ছিল না। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখে কেউ কেউ ইংল্যান্ড সমর্থন করেন। ১৯৯৮ সালে জিদানের ফ্রান্সকে দেখে অনেকে ফ্রান্সের সমর্থন করেন। জার্মান মেশিনারি ফুটবল কিংবা ইতালির কাতানাচ্চিও প্রেমিকও আছেন, ঐতিহ্যের চেয়ে বেশি সেখানেও মূল ফ্যাক্টর হল সাফল্য।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।