শাহরুখ খানের শ্রেষ্ঠত্ব যেখানে

চলচ্চিত্র ব্যাপারটাই এমন যে এখানে একক ভাবে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া যায় না। কলকাতার কথাই যদি ধরি, উত্তম কুমারকে তো মহানায়ক বলা হয়। অথচ অনেকেই তার পাশাপাশি সৌমিত্রকেও রাখেন।

প্রসেনজিতের একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তাঁর কাছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সেরা। প্রসেনজিৎ একা কোনো প্রমাণ না তবুও তর্কের খাতিরে বললাম। তো হিন্দি সিনেমার ইতিহাসেও একক ভাবে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া যাবে না হয়তো।

তবে অনেকেই বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে তিন ভাগে ভাগ করে থাকেন। দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন এবং শাহরুখ খান। এখানে একটা কথা বলে রাখি, সেরার মানদণ্ড একেকজনের কাছে একেক রকম।

তো যারা এই ভাবে তিন ভাগে ভাগ করেছেন, তাদের সাথে আমি যেহেতু একমত। তাই আমার লেখা সেদিকেই যাবে। বাকি আমি দিলীপ কুমার আর ‘বিগ বি’-কে নিয়ে বলব না শুধু শাহরুখ ও তার সময় নিয়ে, বিশেষ করে তার বর্তমান নিয়ে বলব।

ইদানিং একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছি শাহরুখের যে ছবিই আসুক একটা শ্রেণি বলে দিচ্ছে এটাও ফ্লপ, অখাদ্য, ফালতু ইত্যাদি। বেশি অবাক হয়েছি ২০১৭ সালের শাহরুখ-ইমতিয়াজ আলীর ‘জাব হ্যারি মেট স্যাজাল’-এর ব্যাপারেও দেখেছিলাম কয়েকজন ভবিষৎবাণী করেছিলেন যে তামাশার মত ইমতিয়াজের আরেকটা ফ্লপ আসছে। সেই ধারাবাহিকতা সর্বশেষ ‘জিরো’র আগেও ছিল।

কারণ? কারণ অবশ্যই শাহরুখ। ব্যাপারটা বিচ্ছিরি। রকস্টার, হাইওয়ে উপহার দেয়া পরিচালক। অথচ শাহরুখকে নিয়ে একটা মুভি বানাচ্ছে তাই ফ্লপ যাবে। কি লেইম লজিক!

‘রাঈস’ আর ‘ফ্যান’ ছবিকে আপনি ভাল বলবেন না হয়তো কিন্তু এর সাথে ‘বাজে’ বিশেষণও লাগাতে পারবেন না। অন্তত শাহরুখের অভিনয়ের ব্যাপারে তো নয়ই। বাকি থাকলো ‘দিলওয়ালে’। এটাকে যে যা খুশি বলতে পারেন। পরিচালক মূলত এ ছবিটাতে শাহরুখ-কাজল জুটিকে ফেরাতে পেরেই ধরে নিয়েছিল আর কিছুর প্রয়োজন নেই।

তাই অন্যসব ব্যাপারে হয়তো মনোযোগ কম ছিল। এই সবটুকু যদি যোগ করি তাহলে আমার যা বুঝে আসে তা হলো সব নায়কের বয়সের সাথে সাথে তার ক্যারিয়ারেরও একটা উঠানামা আছে।

শাহরুখ রোমান্টিক হিরো হিসেবে নিজেকে একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছে (যদিও স্বদেশ, মাই নেম ইজ খান, ডন, চাক দে ইন্ডিয়ার মত মুভি সে উপহার দিয়েছে)। তো এখন যখন সে পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে, তখন তো আর রোমান্টিক হিরো হিসেবে সে যাচ্ছে না।

তাই তাকে এখন তার মূল জায়গা থেকে সরে আসতে হচ্ছে। এইখানেই হয়েছে সমস্যা। বিকল্প কিছুটা যে কেমন হবে এটা হয়তো শাহরুখ স্ক্রিপ্ট পড়ে বুঝে উঠতে পারছেন না। তাই এই ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’ বা ‘জাব হ্যারি মেট স্যাজাল’-এর মত নিচু মানের মুভি তাকে করতে হচ্ছে। এইখানে আরেকটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে।

শাহরুখ একজন বানিজ্যিক ছবির অভিনেতা। তাকে আপনি ইরফান খানের সাথে মিলিয়ে ফেললে ভুল করবেন। ভারতীয় ফিল্মের সেই শুরু থেকে যে একটা ভাগ ছিল। অনুপম খের, নানা পাটেকার এদের পথ দিয়ে এসেছেন ইরফান খান, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী, মনোজ বাজপেয়ি বা রণদ্বীপ হুডারা। শাহরুখ তো এই ধারার না। তার উপরে কারা আগেই বলেছি, দিলীপ কুমার-অমিতাভ বচ্চনরা। তাই রাঈসের কারণে তাকে তালিকা থেকে একদম ফেলে দিতে পারেন না।

শাহরুখের শ্রেষ্ঠত্বের সাথে যাদের নাম কাছাকাছি উচ্চারিত হয় তারা হলেন আমির খান এবং সালমান খান। অক্ষয় আর অজয়কে আমি এ তালিকায় রাখতেই চাই না। আমির খান শুরুতে প্রচলিত হিন্দি ছবির ধারাতেই ছিল। কিন্তু, তারে জামিন পার, থ্রি ইডিয়টস, পিকে বা দাঙ্গাল এসবের কারণে তাঁকে ঠিক আগের ধারায় ফেলা যাচ্ছে না।

আমিরের জায়গায় আমিরের শ্রেষ্ঠত্ব আছে কিন্তু আমার মনে হয় আমির খানের নাম আমির ‘খান’ না হয়ে অন্য কিছু হলে শাহরুখের সাথে তাকে মেলানো হত না। সালমানের ক্ষেত্রেও একই কথা। সালমান অনেকটা ভাগ্যের উপরে বলিউডে টিকে আছে বলে আমার মনে হয়।

শাহরুখ একটা শো তে সালমানের ব্যাপারে বলেছিল যে একটা ছবিতে আপনি যদি অন্য কোন কিছুই না রাখেন তবুও সেটা হিট হবে যদি ছবিটাতে সালমান খান থাকেন। ওই প্রথম দিকের কিছু ছবি বাদে সালমান খানের কোন অবস্থান খুঁজে পাই না আমি।

সালমান খানের ড্যান্স দেখে মনে হয় কার্টুন। আর আপনি ‘কফি উইদ করণ’ দেখতে পারেন। আমি একাধিক অভিনেতাকে র‍্যাপিড ফায়ারে দেখেছি সালমানকে অভিনয়ে একদম নিচে রাখতে। যাই হোক আমি বলতে চাচ্ছি না যে শাহরুখ বাদে বাকি সব পায়ে দলা ঘাস। সবাই সবার জায়গা থেকে সেরা কিন্তু শাহরুখকে আপনার আলাদা করে ভাবতেই হবে। এটাই শাহরুখের শ্রেষ্ঠত্ব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।