কেন সুপারম্যান, এখনই কেন!

এবি ডি ভিলিয়ার্স অবসর নিয়েছেন। প্রথম শ্রবণে তো অবিশ্বাস্যই ঠেকে। খানিকটা সামলে নিয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করলে মনে প্রশ্ন জাগে, ‘কেন?’ এর সাথেসাথেই মনে ভিড় করে নানা টুকরোটুকরো স্মৃতি। ক্রিকেট দেখিয়ে দর্শকদের তো আর মনে রাখবার মুহূর্ত তিনি কম দেননি।

মনে পড়ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার ওই ৪১৪ রান পেরোনোর মহাকাব্যের কথা। এখানে ওখানে জেপি ডুমিনি, আমলারা নানা পঙক্তি যোজনা করলেও, মহাকাব্যের রচয়িতা তো ডি ভিলিয়ার্স আর গ্রায়েম স্মিথ-ই। সে ম্যাচে এবিডি করেছিলেন ১০৬ রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের ভিত বোধহয় ওই ইনিংস-ই।

লিখতে লিখতেই মাথায় এলো, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পরের সিরিজের পার্থ টেস্টের কথা। ২২০ বলে ৩৩ রানের (ঠিক-ই পড়ছেন!) মাটি কামড়ানো ইনিংস খেলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাঁচিয়েছিলেন পরাজয় হতে। ওহ, এই ‘আল্ট্রা ডিফেন্সিভ মুড’ থেকে স্বভাবজাত স্ট্রোকপ্লেয়িং মুডে বদলে যেতে সময় নিয়েছিলেন এক টেস্ট। এর পরের টেস্টেই যে ১৮৪ বলে ১৬৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। দলের প্রয়োজনে যেমন দরকার, তেমনটায় নিজেকে গড়ে নিতে কখনোই কার্পণ্য করেননি।

 এই দেখুন, দলের প্রয়োজনের কথা বলতেই মাথায় এলো ভারতের সাথে দিল্লি টেস্টের ইনিংসের কথা! সেবারে রান করেছিলেন ৪৩, বল খেলেছিলেন ২৯৭। স্ট্রাইক রেট: ১৪.৪৭। দুরন্ত ঘূর্ণির ওই পিচে স্বভাবসুলভ হাই ব্যাকলিফট ছেড়ে মনোযোগ দিয়েছিলেন লো ব্যাকলিফটে। উপমহাদেশের বাইরের ব্যাটসম্যানরা স্পিন পড়তে পারেন না, এবি ডি ভিলিয়ার্সের বেলায় এই তত্ত্ব যে মাথা ঠুকে মরে।

যে ইনিংসগুলোর কথা বলা হলো, চাইলে এর যেকোনো একটি ইনিংসের বর্ণনাতেই কয়েক দিস্তা কাগজ ব্যয় করা যায়, চাইল এসব ইনিংসের ভিডিও দেখেই অনায়াসে কয়েকরাত্রি পার করে দেয়া যায়। সাথে যোগ করুন, ক্যারিয়ারের পঞ্চম টেস্টেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ৯২ আর ১০৯ রানের ইনিংসকে  কিংবা ভারতের আহমেদাবাদে খেলা ২১৭ রানের ইনিংসকে।

হেডিংলির সেই ১৭৪ আর ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ২৭৮ রানের ইনিংসকেই বা বাদ দেন কি করে! ওহ, অবসরের আগে যে দুটি সিরিজ খেলেছিলেন, সেখানেও সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক-ই ছিলেন। নাহ, ‘এবির কোন কোন ইনিংস হতে পারে অবসরের সঞ্চয়’, এ তালিকা কেবল লম্বাই হচ্ছে।

১১৪ টেস্টে পঞ্চাশোর্ধ্ব গড়ে ৮৭৬৫ রান করা ব্যাটসম্যানকে পরিসংখ্যানে আগ্রহীরা হয়তোবা ভুলে গেলেও যেতে পারেন, তবে ওয়ানডেতে তাঁকে ভুলবার সু্যোগ যে বিন্দুবিসর্গও রাখেননি তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে ২য় সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী কিংবা সাড়ে নয় হাজার রানের মালিক পরিচয় ছাপিয়ে যেখানে ‘ওডিয়াই ক্রিকেট বদলের কারিগর’ পরিচয়টিই মুখ্য।

অবশ্য পরিসংখ্যানবিদরাও চাইলে ওয়ানডে ক্রিকেটের ডি ভিলিয়ার্সকে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। একেকটি ১৮ জানুয়ারি, ২৭ ফেব্রুয়ারি কিংবা ২৫ অক্টোবর, চাইলেই কি সেসব তারিখ ভোলা সম্ভব নাকি!

১৮ জানুয়ারি, ২০১৫ তারিখে আন্দ্রে রাসেল, জেসন হোল্ডারদের চোখের জল, নাকের জল এক করে সেদিন জোহানসবার্গে যে তুলকালাম বইয়ে দিয়েছিলেন তাতে তো লণ্ডভণ্ড হয়েছিলো গোটা ক্রিকেট পরিসংখ্যান-ই। দ্রুততম ফিফটি (১৬ বলে) আর দ্রুততম শতকের (৩০ বলে) রেকর্ড লিখতে হয়েছিলো নতুন করে। হয়তোবা ৪৪ বলে ১৪৯ রানে (!) আউট না হয়ে গেলে দ্রুততম দেড়শত রানের ইনিংসটিও সেদিন-ই লেখা হতো।

সে রেকর্ড নিজের করে নিতে অবশ্য মাস দেড়েকের বেশি অপেক্ষা করেননি। মঞ্চ ছিলো আরও বড়, বিশ্বকাপ ক্রিকেট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রেকর্ড গড়তেই বোধকরি ভালোবাসতেন। দ্রুততম দেড়শ রানের ইনিংসটিও যে তাদেরই বিপক্ষে।

অবশ্য ভালোবাসার কথা যদি বলা হয়, তা তিনি সব প্রতিপক্ষকেই বাসতেন। ৫৩.৫ গড় তো মোটামুটিভাবে সমস্ত প্রতিপক্ষের সাথেই বজায় রেখেছেন। ভারতের সাথে এক সিরিজে তিন সেঞ্চুরি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা ১১৬ কিংবা ১৩৬, সবই তো ওয়ানডে ক্রিকেট মাস্টারক্লাসের এক অনন্য সংযোজন। পাকিস্তান আর দুই তাসমানীয় প্রতিবেশী-ই নিজেদের একটু ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। ১৪ বছরের ক্যারিয়ার শেষে কেবল এ তিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই যে এবি ডি’র স্ট্রাইক রেট নব্বইয়ের ঘরে, বাকিদের বিরুদ্ধে যে সংখ্যা ১০০-য়ের নিচে নামেনি।

তবে এসব বোবা অঙ্ক তো আর আমজনতাকে ব্যাটিং-য়ে নামবার পরে যে নিখাদ বিনোদন জুগিয়েছেন, সেসব তথ্যের খোঁজ রাখেনি। রাখলে জানা যেত, ‘কি করে শুয়ে শুয়েও বলকে শত মিটার দূরে পাঠানো যায়’ , ‘কি করে ওরকমভাবে উইকেটের চতুর্দিকে শট খেলা যায়’। উদ্ভাবনী শটে প্রতিনিয়ত চমকে দিয়েছেন বোলারদের, তার চেয়েও বেশি চমকে দিয়েছেন দর্শকদের। ‘৩৬০ ডিগ্রী ক্রিকেটার’ নাম তো আর এমনি এমনি পাননি। চোখে মায়াঞ্জন বুলিয়ে দেয়া সেই স্কুপ কিংবা কাভার ড্রাইভ কি করে ভুলি।

কিছু কিছু খেলোয়াড় আসেন, যারা কেবল নিজ দেশকেই নন, বরং খেলাটাকেই ঋণী করে যান। আর এবিডি ভিলিয়ার্সের কাছে ওয়ানডে ক্রিকেট তো আমৃত্যু-ই ঋণী থেকে যাবে বলে মনে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন? উত্তর দেবার জন্য খানিকটা পরিসংখ্যান আর খানিকটা বিশেষজ্ঞের মতামত উপস্থাপন করেই এ লেখার ইতি টানছি।

ক্রিকেট লেখক টম ইটনের মতে, ওয়ানডে ক্রিকেটের বদলের শুরুটা শ্রীলঙ্কার হাত ধরে, ১৯৯৬ সালে তাদের বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে। ওয়ানডে ক্রিকেটের পরের পরিবর্তন এসেছে ল্যান্স ক্লুজনার কিংবা যুবরাজ সিং-য়ের মতো স্ট্রোক প্লেয়ারদের হাতে। আর আধুনিক ক্রিকেটের ধারণা-ই পাল্টে দেবার কাজটি করেছেন যিনি, তিনি এবিডি ভিলিয়ার্স।

‘বোলার ব্যাটসম্যানকে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন প্রশ্নের সম্মুখীন করবেন, ব্যাটসম্যান ব্যাট হাতে কেবল তার উত্তর করে যাবেন’, চিরায়ত এই প্রথা ভেঙে দেবার কাজটি তো ডি ভিলিয়ার্স-ই করেছেন। উইকেটের সামনে ওমনি করে চরকির মতো ঘুরলে কোন বোলারের মাথা ঠিক থাকে!

চতুর্থ কিংবা পঞ্চম স্ট্যাম্প লাইনের ইয়র্কার বলে যেখানে এক রান কিংবা ব্যাটের কানায় লেগে চার হওয়াই ছিলো সর্বোচ্চ নিয়তি, সে বলে আজকাল ছয় হচ্ছে অহরহ। ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ দিয়ে যে এসব ‘আনপ্লেয়েবল’ বলকেও সীমানাছাড়া করা যায়, সে বিদ্যা তো ওই ডি ভিলিয়ার্স-ই শিখিয়েছেন।

এবং আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান বলছে, আজকাল ব্যাটসম্যানরা আর কোচদের ‘শেষতক বল দেখো’ এই আপ্তবচন ধারণ করছেন না। বরং বলা চলে, বোলারের হাত থেকেই ব্যাটসম্যান বুঝে নিচ্ছেন, এই বলে আমি এই করবো। ‘ওয়াচ দ্য বল’ থিওরি ভেঙে দেবার ক্ষেত্রেও যে ডি ভিলিয়ার্স-ই অগ্রনায়ক, সে বোধহয় না বললেও চলছে।

কিছুদিন পূর্বে, শচীন টেন্ডুলকারের গ্রেটনেস ব্যাখ্যা করবার জন্য, জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো আশ্রয় নিয়েছিলো এক পরিসংখ্যানের, যেখানে সমসাময়িকদের তুলনায় স্ট্রাইক রেট আর গড়ে শচীন টেন্ডুলকার কতটা এগিয়ে ছিলেন, তা-ই বোঝানো হয়েছিলো নানান কায়দায়।

ওয়ানডে ক্রিকেটের ৪৮ বছরের ইতিহাসে আজ অব্দি ১৩০ জন ব্যাটসম্যান বছরে হাজার রান করবার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। ১৯৯৮ সনে (যে সন শচীন টেন্ডুলকারের) তিনি ৬৫.৩ গড়ে ১০২ স্ট্রাইক রেটে ১৮৯৪ রান করেছিলেন। বাকি ব্যাটসম্যানদের সে বছরে প্রতি ম্যাচে ব্যাটে ছিলো ৩২.৬ রান, এবং প্রতি ১০০ বলে ব্যাটসম্যানরা নিতে পেরেছিলেন ৮০ রান। অর্থাৎ, যদি বাকি ব্যাটসম্যানদের পরিপ্রেক্ষিতে হিসাব করা হয়, তবে সে বছর তিনি অন্যদের চেয়ে ২২ স্ট্রাইক রেটে এবং গড়ে ৩২.৭ রান এগিয়ে ছিলেন। এমন বছরে হাজার রান করা আরও ১২৯ জনের নেট এভারেজ বনাম নেট স্ট্রাইক রেট বিবেচনায় নিয়ে, নিচে এক গ্রাফ দেয়া হলো:

*তালিকায় লাল ডটে শচীন টেন্ডুলকারের ১৯৯৮ সালকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গ্রাফ হতে আরও দেখা যায়, সমসাময়িক বাকিদের চেয়ে তো বটেই, রান করবার ধারাবাহিকতায় আর রান করবার দ্রুততায় শচীন টেন্ডুলকারকে টেক্কা দিতে পেরেছিলেন কেবল একজনই, ২০১৫ সালের ডি ভিলিয়ার্স। আশি ছুঁইছুঁই গড়কে যদি স্বাভাবিক বলে মনেও হয়, এর সঙ্গে ১৩৮ স্ট্রাইক রেটে বছরে ১১৯৩ রানকে কোনোমতেই মানবীয় বলে মনে হয় না।

অবশ্য সময়সীমাকে কেবল এক বছরের গণ্ডিতে আবদ্ধ না করে যদি ডি ভিলিয়ার্সের পুরো ওয়ানডে ক্যারিয়ারেই বিস্তার করা হয়, তবে পাওয়া যায়, সেখানে সাড়ে তিপ্পান্ন গড়ের ১০১.০৯ স্ট্রাইক রেটের এক ব্যাটসম্যানকেই পাওয়া যায়। সাড়ে তিপ্পান্ন গড়কে অতিমানবীয় বলে চালানো গেলেও, পুরো ক্যারিয়ারে ১০১.০৯ স্ট্রাইক রেট বজায় রাখা, এককথায় ‘অসম্ভব!’

যেদিনে তিনি অবসরের ঘোষণা দিলেন, তাঁর দিনছয়েক আগেই দুর্দান্ত এক ফ্লাইং ক্যাচে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। ‘ফ্লাইং ক্যাচ’ বলে ঠিক সেই ক্যাচের মাহাত্ম্য বোঝানো যায় না, যা বোঝানো যায় ভিরাট কোহলির টুইটে, ‘স স্পাইডারম্যান লাইভ টুডে!’ অবশ্য যে দর্শকেরা বেড়ে ওঠার সময়ে সাইমন ক্যাটিচের রান আউট কিংবা ইয়ান বেলের ক্যাচ দেখে বড় হয়েছেন, তাদের জন্য এ তো অভ্যাসগত কর্মই। উইকেটের পেছনে ২৩১ ক্যাচ আর স্ট্যাম্পিং, ফিল্ডার হিসেবে ২৩৮ ক্যাচ তো রয়েছে-ই, অবসরের সময়ে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন এক টেস্টে ১১ ডিসমিসালের রেকর্ড-ও।

এরকম অসম্ভব আর অতিমানবীয় কীর্তিগুলো মানবীয় রূপে, বড্ড স্বাভাবিকভাবে করতেন বলেই তো আক্ষেপের মাত্রা আরও বাড়ছে। সবুজ -সোনালি জার্সিতে এ দৃশ্যগুলো যে আর দেখা যাবে না!

কেন ডি ভিলিয়ার্স, কেন!

কেন সুপারম্যান, এখনই কেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।