সরকারি চাকরির সন্ধান বনাম স্পেসে যাওয়ার সহজ উপায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। ছেলেটি অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের সান্ধ্যাকালীন মাস্টার্স করছিল।

পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম, তার পরিবারের সদস্যরা বলেছে- সরকারি চাকরি না পাওয়াতে তার মাঝে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল। এই ছেলের বয়স ৩০ হচ্ছিলো এই বছরেই। তার ফ্যামিলির সদস্যদের সে নাকি বলেছে।

– এতো ভালো পরীক্ষা দেই, এরপরও কোথাও চাকরি হচ্ছে না। এদিকে সরকারি চাকরীর বয়েস’টাও শেষ হয়ে যাচ্ছে!

তবে এই ছেলে কিন্তু একটা বেসরকারি চাকরি করছিল! এই নিয়েও নাকি তার মাঝে হতাশা কাজ করত। সে নাকি তার পরিবারের সদস্যদের বলেছিল।

-আমি বেসরকারি চাকরী চাইনি, চেয়েছি সরকারি চাকরি।

আপনাদের জানিয়ে রাখি, এই ছেলে কিন্তু কোন দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসেনি – অর্থাৎ ব্যাপারটা এমন না, চাকরি না পাওয়া কিংবা সরকারি চাকরি না পাওয়ার জন্য পেট চলছে না কিংবা জীবন আঁটকে আছে।

ছেলেটার বাবার ঢাকা শহরে বাড়ি আছে। ঢাকা শহরে বাড়ি থাকা মানে আর যাই হোক, ছেলেটা অন্তত দরিদ্র কোন পরিবারের সদস্য ছিল না। তাহলে সরকারি চাকরি না পেয়ে তার মাঝে হতাশা চলে আসল কেন? সেই হতাশা থেকে সে আত্মহত্যা করল কেন?

এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই কিছুদিন আগে আরেকটা ছেলে আত্মহত্যা করেছিল। ওই ছেলেটিও বিজনেস ফ্যাকাল্টির ছাত্র ছিল। গ্রাম থেকে উঠে আসা হ্যাংলা-পাতলা ছেলেটার গায়ের রঙ খুব কালো ছিল। তার হলের সহপাঠীরা নাকি নিয়মিত তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত, কারণ তার গায়ের রঙ কালো আর দেখতে শুনতে ভালো না!

এমনকি তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরাও নাকি এই শারীরিক অবয়বের জন্য তাকে কথা শুনিয়েছে। সেই সঙ্গে ডিপার্টমেন্টের পড়াশুনার চাপও যুক্ত হয়েছিল। ছেলেটা এমনকি ডিপার্টমেন্ট পরিবর্তনও করতে চেয়েছিল। সেই কথা শিক্ষকদের বলাতে, শিক্ষকরা নাকি তাকে উল্টো কথা শুনেছিয়ে!

এত সব চাপ সহ্য না করতে পেরে ছেলেটা শেষমেশ আত্মহত্যাই করে ফেলে!

যেই ছেলেটা সরকারি চাকরী না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে; গিয়ে দেখবেন – সে যখন তার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে যেত; শিক্ষকরা হয়ত তাকে বলে বসেছে – সরকারি চাকরি পাচ্ছ না?

আমর নিজের বেলাতেই এমন হয়েছে। আমি যখন ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি; তখন আমি যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, অর্থাৎ সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক আমাকে বলে বসলেন

-সরকারি চাকরি পাচ্ছ না? দেখো চেষ্টা করে পাও কিনা!

অথচ আমি জীবনেও সেই অর্থে চিন্তা করেনি, আমাকে সরকারি চাকরি পেতেই হবে!

শুধু শিক্ষকরা না, আশপাশের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরাও দেখবেন এই নিয়ে নিয়মিত কথা বলছে। আমি তো শুনেছি বিয়ের বাজারে নাকি সরকারি চাকরির আলাদা মূল্য আছে!

তো সমাজের মানুষজন সরকারি চাকরিকে এতো মূল্যায়ন করছে কেন?

কারন সরকারি চাকরী মানে আজীবনের নিশ্চয়তা, হাজারো অন্যায় করেও বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাওয়া, কারো কারো জন্য ঘুষের নিশ্চয়তা, ক্ষমতার ইচ্ছে মতো প্রয়োগ ইত্যাদি!

এই হচ্ছে আমদের সমাজ এবং সমাজের মানুষজন! এরা এক দিকে বলবে সরকারি চাকরির মানুষজন ঘুষ খায়, এরা কোন কাজ করে না, মানুষ’কে সম্মান দিতে জানে না ইত্যাদি! আবার এরাই আরেক দিকে গিয়ে নিজের সন্তান, বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজনকে বলবে- তুমি সরকারি চাকরি পেলে না?

মাঝখান থেকে হাজারো তরুণ ছেলেপেলে সমাজের এইসব চাপ সহ্য করতে না পেরে হয় মানসিক সমস্যায় জর্জরিত কিংবা শেষমেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই ছাত্রের মতো আত্মহত্যাই করে বসছে!

এতোসব চাকরী, গাড়ি, বাড়ি, সামাজিক অবস্থান কিসের জন্য? জীবনের জন্যই তো? এইসবের পেছনে ছুটতে থেকে যদি মাঝখান থেকে জীবনটাই আর না থাকে, তাহলে তো কোন কিছুই অর্জন করা হলো না। আমাদের সমাজ সরকারি চাকরী, গাড়ি, বাড়ি ইত্যাদি অর্জন করার কথা বলে। অথচ এইসব ছাড়াও যে জীবনকে উপভোগ করা যায়, সেটা আমাদের সমাজ আমাদের শেখায় না!

৩০ বছর বয়সের এই ছেলেটা হয়ত তার পুরো জীবনে একটা সরকারি চাকরির পেছনে ছুটেছে; অথচ পৃথিবীর অপর প্রান্তে ১৮ বছরের বালক আবিষ্কার করছে কিভাবে রকেটে চড়ে স্পেসে যাওয়া যায় সহজ উপায়ে! কারন তার সমাজ তাকে তার মতোই থাকতে দিয়েছে। তাই সে তার কাজ করেছে আনন্দ সহকারে, জীবনকে উপভোগ করতে করতে!

আর আমরা?

আমরা আমাদের কাজ করি, সমাজ আমাদের যেভাবে করতে বলে! মেধা গুলো তাই আর বিকশিত হচ্ছে না। হারিয়ে যাচ্ছে অকালেই! এভাবেই আমরা মেধাহীন একটা সমাজে পরিণত হচ্ছি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।