রিয়াদকে আমরাই পাদপ্রদীপের আড়ালে ঠেলে দেই

গেল তিন বছর ধরে ওয়ানডেতে ৫০ গড়ে রান করছেন, এই বছরই সম্ভবত জিতিয়েছেন বা হারা ম্যাচে শেষ লড়াই করেছেন বিভিন্ন ফরম্যাটে – এমন নজীর প্রায় হাফ ডজন আছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এরকম ব্যাটসম্যানের কখনোই ‘পাদপ্রদীপের বাইরে’ থাকার কথাই না! কিন্তু এরপরও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ কেন থেকে যান আপনাদের তথাকথিত ‘পাদপ্রদীপের বাইরে?’

বোধহয় আমরা ফ্যানরাই চেতনে বা অবচেতনেই চাই না যে রিয়াদ ‘পাদপ্রদীপে’ আসুক।

খেলা চলাকালীন ও খেলার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা এখন হয় অনলাইনে। ফেসবুকে নরমাল ইউজাররা ছাড়াও অসংখ্য সেলিব্রেটি, খেলা বিশেষজ্ঞ এবং ইনফ্লুয়েন্সার আছেন যাদের পোস্ট গুলো আসলে খেলার দিনগুলো অনলাইন জগতটা মাতিয়ে রাখেন!

সেদিনের খেলা নিয়ে ওই পোস্ট গুলাই ‘মার্কেটিং এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করে। ওই পোস্টগুলো বা অনলাইন পোর্টালের নিউজগুলো খেলা নিয়ে বা বিভিন্ন খেলোয়াড় নিয়ে আমাদের মন্তব্য নির্ধারণ করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

কিন্তু খুবই বিচিত্রভাবে ফেসবুকের নরমাল ইউজার, বিশেষজ্ঞ সেলিব্রেটি বা অনলাইন পোর্টাল- কোনপক্ষই কেন যেন মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে খুব প্রয়োজন না পড়লে কিছু লিখতে চান না।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটাই ধরি। আমরা মুস্তাফিজকে নিয়ে বন্দনা করছি, সদ্য আসা ইমরুলকে নিয়ে স্তুতি গাইছি, লিটন-শান্তকে ধুচ্ছি মুশি-সাকিবের রান আউট নিয়ে আফসোস করছি। কিন্তু মাহমুদুল্লাহ কে নিয়ে আপনার নিউজফীডে কয়টা পোস্ট পাবেন বলেন তো? একবার নিউজফীড ঘুরে এসে বলেন মাহমুদউল্লাহর ৭৪ নিয়ে কয়জন স্ট্যাটাস দিছে?

নিজের টাইম লাইনে যান, নিজে কয়টা স্ট্যাটাস দিছেন মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে? সেলিব্রেটিরা কয়টা দিছে? অনলাইন পোর্টালে কয়টা রং চড়ানো আর্টিকেল লিখসে রিয়াদকে নিয়ে?

গ্যারান্টি দিচ্ছি খুবই কম পাবেন। এমনকি ৭৪ রানের ইনিংস খেলে আমাদের উদ্ধারকার্য পরিচালনা করছিলেন তখনও মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে পোস্ট হয়েছে খুবই কম।

আবার মজার জিনিস দেখবেন, যে কয়টা পাবেন তার ভিতরেও ৯০% পোস্টের শেষে ‘কিন্তু আফসোস, এতোকিছুর পরেও তিনি থেকে যাবেন পাদপ্রদীপের বাইরে!’ জাতীয় একটা হাস্যকর লাইন দিয়ে মাহমুদুল্লাহকে জোর করে ‘সাইড নায়ক’ বানানোর উদ্ভট অপচেষ্টা করা হবে!

এটাইই হয়। সবসময়। কেন জানি না একটা ভুতুড়ে কারণে তামিম সাকিব মুশফিক মাশরাফি মুস্তাফিজদের অবদানসমূহ নিয়ে উচ্ছাসিত হয়ে তাঁদের আকাশে ওঠাতে। বা লিটন সৌম্য সাব্বিরদের নিন্দা করে পাতালে পুঁততে আমাদের যত উৎসাহ মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে আমাদের উচ্ছাস প্রকাশের প্রবণতা ততটাই কম!

মাহমুদউল্লাহর জন্য আমাদের উচ্ছাসটা আসে না। তাঁকে নিয়ে স্তুতি বন্দনা করতে আমাদের নিজেদেরই অনীহা! বাকি সবাইকে নিয়ে হৈ চৈ করতে পারবো, প্রতি ম্যাচে ১০০টা আলাদা আলাদা পোস্ট করতে পারবো, রংচং মিথ চড়ায়ে আর্টিকেল লিখতে পারবো, কিন্তু মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে লিখতে আমাদেরই মনে থাকবেনা।

আসলে তিনি পাদপ্রদীপের বাইরে থাকেন না। আমরাই তাকে জোর করে পাদপ্রদীপের বাইরে ঠেলে দেই! সে যতই ভালো করুক তাকে নিজের মনের মধ্যেই ‘সাইড নায়ক’ হিসেবে ফ্যান্টাসাইজ করি। এটা মাহমুদউল্লাহর না, আমাদের দর্শকদেরই সমস্যা।

এই জোর করে অবচেতন মনে তাকে  পার্শ্বনায়ক হিসেবে কল্পনা করার এই প্রবণতাটা কোথা থেকে এসেছে এটা সম্পর্কে আমার একটা ধারণা আছে। ক্রিকেটটাকে আমরা খেলা কম একটা ‘মিথ কালচার’ হিসেবে দেখতে পছন্দ করি। ক্রিকেট নিয়ে আমাদের এই মিথে একটা হিরো থাকতে হবে, একটা ভিলেন থাকতে হবে, একটা ‘যাত্রাদলের বিবেক’ থাকতে হবে। এবং অতি অবশ্যই থাকতে হবে একজন ‘পার্শ্বনায়ক’।

সেই হিসেবে সাকিব তামিম মুশফিকরা আমাদের হিরো। লিটন শান্তরা আমাদের আপাতত ভিলেন, মাশরাফি আমাদের স্যাক্রিফাইসিং যাত্রার বিবেক। আর মাহমুদউল্লাহ আমাদের পার্শ্বনায়ক তাকে আমরা সেভাবেই আমাদের মনের ফ্যান্টাসির মধ্যে স্টাবলিশ করে ফেলেছি। এখন সে হিরো হবার মতো কাজ করলেও তাই আমাদের মন তাঁকে ‘হিরো’ ভাবতে বাঁধা দেয়। তাঁকে নিয়ে তাই আমরা উচ্ছাসও কম দেখাই।

এই দোষটা আমাদের, আমাদের সমর্থকদের যে আমরাই রিয়াদকে জোর করে পাদপ্রদীপের বাইরে ঠেলে দিই। পঞ্চপাণ্ডবের বাকি চারজনের মত তাঁকেও হিরো ভাবতে শুরু করলে তিনি আর ‘পাদপ্রদীপের আড়ালেও’ আর থাকবেন না, আপনাদের ‘আফসোস’ও আর হবে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।