যে কারণে আমি আর সিনেমা হলে যাই না

১৯৮৬ সালের মার্চ মাস। প্রথম আমি লুকিয়ে সিনেমা দেখি। ছবির নাম অশান্তি। চট্টগ্রাম স্টেশন রোডস্থ নূপুর সিনেমায় দেখি। ফ্রন্ট ক্লাস এর টিকেট মূল্য ছিলো পাঁচ টাকা। তখন পাঁচ টাকায় এক সের চাল পাওয়া যেত। অবশ্যই সেই চাল আমাদের মতো গরীবরা খেতো।

মোটামুটি ভালো চালের দাম ছয় থেকে আট টাকা।

অশান্তি ছবি দেখার পর সিনেমা দেখা আমার কাছে নেশা’য় পরিনিত হয়। অশান্তি দেখার পরের সাপ্তাহে নূপুর সিনেমায় সুদ আসল দেখি। ফারুক-দিতি অভিনীত সুদ আসলে আমি আমার পরিবারের কাহিনীর ছায়া দেখতে পাই। তারপরের সাপ্তাহে নূপুর সিনেমায় বাহাদুর মেয়ে দেখি। এরপর প্রতি সাপ্তাহে সিনেমা দেখতাম।

নূপুর, উজালা, লায়ন,রঙ্গম, সিনেমা প্যালেস, জলসা, ঝুমুর, সানাই, সাগরিকা, নেভাল অটোডিরিয়াম (টাইগারপাস), বিডিআর অটোডিরিয়াম (হালিশহর), নেভাল অটোডিরিয়াম (নিউ মুড়িং), উপহার, রিদম, মেলোডি, আলমাস, দিনার, অলংকার, খুরশীদ মহল, নিউ গুলশান, বনানী কমপ্লেক্স-এ আমি সিনেমা দেখতাম।

শিশু শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষায় আমি মেধা তালিকায় প্রথম হতাম। ষষ্ঠ শ্রেণীর পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় হই। সপ্তম শ্রেণীর পরীক্ষায় দ্বিতীয় হই। অষ্টম শ্রেণীতে তৃতীয় হই। আমার এই মেধা ধসের কারণ সিনেমা দেখা। তারপরও আমার সিনেমা দেখা বন্ধ হয় নি।

বসন্ত মালতী দেখতে গিয়ে ভাইয়ের কাছে ধরা পড়ি। ভরসা দেখতে গিয়ে ভাইয়ের বন্ধুর হাতে ধরা পড়ি। অবদান দেখতে গিয়ে কিভাবে যেন মা খবর পায়। সাময়িকভাবে কয়েক সাপ্তাহ সিনেমা দেখা বন্ধ রাখলেও পরে নানা কৌশলে আবার সিনেমা দেখায় সক্রিয় হয়ে যেতাম।

প্রহরী দেখতে গিয়ে টেম্পু  অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে আহত হই। মনের আগুন দেখতে গিয়ে হলের ভিতর বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় নূপুর সিনেমায় ক’য়েকজন দর্শক মারা যায়। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচি। তবুও আমার সিনেমা দেখা বন্ধ হয় নি।

১৯৯৬ এর পর থেকে আমি সিনেমা দেখা কমিয়ে দিলাম। কারণ আমি মুনমুন,ময়ূরী,পলি, মেহেদী, ঝুমকা, ডিপজল, শাহীন আলম-সহ বেশ কয়েকজন অশ্লীল নায়ক-নায়িকাদের পছন্দ করতাম না।

নায়িক-নায়িকা এবং পরিচালক দেখে তখন ছবি দেখতাম।  ২০০৪ সালের এক এপ্রিল আমি কুয়েত চলে যাই।

২০০৭ সালের ২০ মে বাংলাদেশে ছুটিতে আসি। প্রায় চারমাস ছিলাম বাংলাদেশে। তখন আমি চট্টগ্রাম আশ্রাফ আলী রোডে অবস্থিত পূরবী সিনেমায় তিনটি ছবি দেখি। আর কাজী দেউড়িতে অবস্থিত ঝুমুর সিনেমায় একটি ছবি দেখি।

আমার কাছে মনে হলো আমি সিনেমা দেখতে হলে আসিনি, এসেছি মিমি পতিতালয়ে।

অন্ধকারে পর্দায় আলোয় দেখলাম কিছু দর্শকদের বিকৃত যৌনাচার। হলের ভিতরে এবং বাহিরে পতিতাদের আনাগোনা।

২০১১ সালের এক এপ্রিল আমি আবার ছুটিতে বাংলাদেশে আসি। প্রায় সাড়ে চারমাস ছিলাম তখন আমি নেভাল অটোডিরিয়াম (টাইগার পাস) এ একটি ছবি দেখি। বিলাস সিনেমায় (একাডেমি রোড) চারটি ছবি দেখি। দুলাল সিনেমায় (স্টেশন রোড) একটি এবং কানন সিনেমায় (মাস্টার পাড়া রোড) তিনটি ছবি দেখি।

যে চারটি সিনেমায় ছবি দেখলাম, চারটি সিনেমা হলই যেন মিনি পতিতালয় ছিলো। টিকেট কাউন্টারে টিকেট করার সময় পতিতারা বলতো – লাগবে নি? আর ভিতরে সিটের সামনে এসে বলতো – লাগবে নি? এভাবে করলে ৫০ টাকা, ওভবে করলে ১০০ টাকা।

২০১৬ সালের এক মে আমি আনার আসি ছুটি কাটাতে বাংলাদেশে। আড়াই মাস বাংলাদেশে ছিলাম। তখন দুলাল সিনেমায় চারটি এবং কানন সিনেমায় দু’টি সিনেমা দেখি। অবস্থা পরিবর্তন হয় নি। আগের অভিজ্ঞতাই অর্জন বরং আরো ভয়াবহভাবে।

দুলাল সিনেমায় ১০০ টাকা দিয়ে কেবিনের টিকেট নিলাম। ড্রেস সার্কেলের ভিতর ছোট একটি ঘর। কয়েক সিট নিয়ে কেবিন। সেদিন আমিই ছিলাম কেবিন এর একমাত্র দর্শক। একটুপর একজন পতিতাসহ ঢুকলো। আমার উপস্থিতেই কাজ সম্পূর্ণ করে চলে গেলো।

বিরতির সময় আমি যখন শৌচাগারে যাওয়ার জন্য বের হলাম। তখন ড্রেস সার্কেলের দর্শকরা আমার দিকে চেয়ে থাকলো। আমি লজ্জায় আর আসি নি। অর্ধেক ছবি দেখেই চলে যাই।

রোজার এক সাপ্তাহ আগে আমি দুলাল সিনেমা থেকে বিকালের শো দেখে বের হলাম। হলের সামনেই এমন একজন ব্যক্তির সাথে দেখা যিনি আমাকে পারিবারিকভাবে চিনে। তিনি আমাকে দেখে বললেন – ঘরে বউ রেখে এইসব!

– মানে?

– এখানে কেন?

– ছবি দেখতে।

– আজকাল কেউ হলে ছবি দেখতে আসে! আপনি কেন আসছেন জানি!

– মানে?

– আমি কাউকে বলবো না। এক তরকারি দিয়ে কি সবসময় ভাত খাওয়া যায়!

আমি লজ্জায়, অপমানে পাথর হয়ে যাই। তারপর থেকে আমি আর কোন সিনেমা হলে যাই না।

২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসি। সিনেমা হলে যাইনি। আজ আট মাস বাংলাদেশে। কোন সিনেমা হলে যাই নি। ভাবতে অবাক লাগে যে সেই আমি সিনেমা হলে না যেয়ে থাকতে পারছি এখন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।