আমি কেন সিকিম যাইনি!

ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, অন আর অফ লাইনে প্রতিদিনই অন্তত তিন চারজনকে ভারতের নানা যায়গায় ভ্রমণের নানা রকম পরামর্শ দিয়ে থাকি। নাহ, অহংকার করছিনা, যেহেতু একটু ঘুরে বেড়াই, তাই যারা যেতে চায় কিন্তু অপ্রতুল বাস্তব অভিজ্ঞতা আর তথ্যর কারনে পিছিয়ে যায়, তাদের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থেকেই পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করে থাকি।

তো বেশ কিছুদিন হল কেউ কেউ সিকিমের নানা রকম পরামর্শ চাইছে। আমি সেখানে নিরুত্তর ছিলাম বা বলে দিয়েছি যে আমি সিকিম যাইনি। তাই অভিজ্ঞতা নেই বলে তেমন কোন পরামর্শ দিতে পারছিনা। এতে করে অনেকেই আমাকে কিছুটা ভুল বুঝেছেন। তারা মনে করেছেন যে আমি সিকিমের ব্যাপারে তাদেরকে তথ্য দিতে চাইছি না বুঝি!

নারে ভাই, আসলেই আমি সিকিম যাইনি। অথচ সিকিম নিয়ে আমার তুমুল আগ্রহ ছিল একটা সময়। হয় তো শুধুমাত্র নিষিদ্ধ যে কোন কিছুর প্রতি মানুষের অসীম আগ্রহ থেকেই আমার অমন আগ্রহ হয়েছিল। যেটা আবার হুট করেই হারিয়ে গেল, সিকিম খুলে দেবার সাথে সাথেই। নাহ আগ্রহ হারিয়ে যাবার কারন আসলে একদমই ভিন্ন কিছু। আর সেইসব কারনেই সিকিমের প্রতি কোন আগ্রহই আমি অনুভব করছিনা এখন পর্যন্ত।

হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত যাবো হয়তো, আমার ড্রিম প্রজেক্ট শেষ করার জন্য হলেও। ভারতের সকল প্রদেশে একদিনের জন্য হলেও যাওয়া, থাকা, কিছু না কিছু দেখা। হ্যাঁ এটাই আমার ড্রিম প্রজেক্ট। যা আগামী জুন ২০২০ এর মধ্যেই শেষ করে ফেলতে পারবো বলে স্থির করেছি।

তো যেসব কারনে আমি এখন পর্যন্ত সিকিম যাইনি, বা যাওয়ার আগ্রহ একেবারেই হারিয়ে ফেলেছি সেগুলো শুনলে অনেকেই নানা রকম বিতর্ক তুলতে চাইবেন, কোন কিছু চিন্তা না করে বা বাস্তবতা বিবেচনা না করেই। তবুও বলছি কেন সিকিমের প্রতি আমার এতো এতো অনীহা?

এর জন্য আমাদের হুজুগে পর্যটন মানসিকতা দায়ী। আমরা অধিকাংশই এখনো এটাই জানিনা যে পর্যটন আসলে কি? আমি নিজেও পর্যটন কাকে বলে সেটা সঠিকভাবে জানি কিনা আমার সন্দেহ আছে। তবে আমি আমার নিজের মত করে পর্যটনের একটা ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দাড় করিয়েছি। সেটা পরে বলছি।

তবে আমাদের সাধারণ মানুষের এখনো ধারনা হল পর্যটন মানে নতুন কোন একটা যায়গায় যাওয়া, সাধ্য অনুযায়ী ভালো হোটেলে থাকা, পাহাড়ে, অরণ্যে বা সমুদ্রে গিয়ে ব্যাক গ্রাউনড ঝাপসা করে নিজেকে হাইলাইট করে চকচকে আর ঝকঝকে ছবি তুলে বন্ধুদেরকে দেখানোই পর্যটন!

আরে নারে ভাই, পর্যটন মানে আসলে যদিও আমি নিজেও নিশ্চিত নই পর্যটন কাকে বলে, তবে আমার নিজের কাছে নিজের পর্যটনের ব্যাখ্যা অনেকটা এই রকম –

হোক সেটা নতুন বা পুরাতন, যে কোন যায়গায় গিয়ে সেই জায়গার প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ, তাদের সমাজ, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, নিয়মনীতি, ও নানা রকম অভ্যেসসহ দৈনন্দিন জীবন যাপনকে দেখা, বোঝা, উপভোগ করা, সেই সমাজ আর পরিবেশ ব্যবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়াকেই আমার ব্যাক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যটন বলে। যেটা শুধু নিজের একটা দেখার আর উপভোগের বিষয় না, যেটার সাথে একটা বৃহৎ গোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত।

আর এই জিনিষ গুলোর সাথে অন্যন্য অনেক জায়গার সাথে আমাদের অনেকে মানিয়ে নিতে পারলেও, সিকিমের সাথে সেই ঘটনা কতটুকু ঘটেছে আমার সন্দেহ আছে। কারন সিকিমটা হুট করেই ওপেন হয়ে যাওয়ায় আমাদের হুজুকে পর্যটকরা ওটা নিয়ে এতো এতো বেশী লেবু কচলেছে যে আমার কাছে সিকিম তিতা হয়ে গেছে! গত ডিসেম্বরে খুলে দেয়ার পরে পাগলের মত মানুষ সিকিম গেছে পর্যালোচনা করে দেখেছি।

আর শুধু যে গিয়েছে তাই-ই নয়, সেখানে গিয়ে ওদের যে স্বাভাবিক পর্যটন মানসিকতা সেটার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে, আমাদের মতই ‘পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই’ অভ্যাসে পরিণত করে ফেলছে যেটা আজকাল শুনতে আর জানতে পারছি। আগের ২০০০ টাকার বাজেট আজকাল নাকি ৫০০০ এ গিয়ে ঠেকেছে! আগের ১০০০ টাকার হোটেল নাকি আজকাল ৪০০০ ভাড়া দিচ্ছে, আগের ৩০০০ গাড়ি ভাড়া নাকি আজকাল ৭০০০-৮০০০ গিয়ে ঠেকেছে!

সিকিম আর বরফ নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার কারনে আরও নানা রকম নিষেধাজ্ঞা কানে এসেছে মাঝে মাঝেই। মানুষের ধাক্কাধাক্কি, ভিড় আর কোলাহল নাকি গুলিস্থান, গাউছিয়ার মত হয়ে গেছে শুনলাম! এমনকি গত ঈদে নাকি শুধু সিকিমের বর্ডার পার হতেই ৬-৮ ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হয়েছে জেনেছি! মাই গড, মাই গড!

এমন মানুষে গিজগিজ করা, সবকিছুর আকাশ ছোঁয়া দাম উঠে যাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকে, সিকিম আমি যেতে চাইনা ভাই। দরকার নাই আমার সিকিম যাওয়া। আমি সেই ফাঁকে অদেখা আরও অনেক কিছুই আছে সেগুলো দেখে নেই এই ফাঁকে। সবাই গিয়ে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচুক।

আমি না হয় কোন এক অবসরে, একান্তে, নীরবে, অল্প খরচে নিজের মত করে সিকিম যাবো! দরকার নেই আমার এমন সিকিম যাওয়ার যেখানে গিয়ে আমি তৃপ্ত হতে পারবোনা, মন ভরবেনা, প্রান শান্ত হবেনা, ভালোলাগার পরিবর্তে একরাশ মন্দ লাগা আর মন খারাপ সঙ্গী হয়ে ফিরে আসবে। এমন সিকিম আমি যাবোনা। যেতে চাইনা।

জীবনে কোন কিছু নিয়েই আমার কোন তাড়া নেই। পেতেই হবে এমন কিছু নেই জীবনে। যা আছে, যা পাবো, যতটুকু আমার সাধ্য তাই নিয়েই ভালো আছি, সুখে আছি। জোর করে, তাড়াহুড়ো করে কিছু পেতে গিয়ে সুখী আর সুখের সময়টাকে অসুখী আর ব্যাথাতুর করতে চাইনা আমি। তাই আমি আজও সিকিম যাইনি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।