লাতিন ফুটবল কি আদৌ এগিয়ে ছিল?

১.

জন্ম হবার পর থেকেই দেখে আসছি যে বাংলাদেশে লাতিন দলগুলোর প্রতি সমর্থন বেশি। আরো স্পেসিফিক করে বলতে গেলে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। বিপরীতে ইউরোপিয়ান দলগুলোর প্রতি সমর্থন খুবই কম। ১৯৯৪ সালের দিকে দেখতাম কিছু ইতালির সমর্থক রয়েছে।

৯৮ বিশ্বকাপের পর কিছু ফ্রান্সের সমর্থক পাওয়া গিয়েছে, ২০১০ বিশ্বকাপের পর স্পেনের কিংবা ২০১৪ বিশ্বকাপের পর জার্মানির। বলছিনা যে এদের বাইরে অনেক আগ থেকেই কেউ স্পেন বা জার্মানির সমর্থক নন, আমার নিজের এক মামা ১৯৮৬ সাল থেকে জার্মানির সমর্থক। আমার বক্তব্য হচ্ছে থাকলেও সেটার সংখ্যা খুবই কম।

এবারের দ্বিতীয় পর্ব থেকে আর্জেন্টিনা এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল বাদ পড়ার পর থেকেই টাইম লাইনে খেয়াল করে দেখলাম রব উঠে গিয়েছে যে ইউরোপের কাছে ল্যাটিন আর পাত্তা পাবে না। ২০০২ বিশ্বকাপের পর থেকে টানা চারটি চ্যাম্পিয়ন কিংবা এবারের সেমিফাইনালের চারটি দলই ইউরোপের – এই তথ্যগুলো লাতিনের দৈন্যতা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।

এর মাঝে ২০১৪ বিশ্বকাপেই কেবল মাত্র কোন লাতিন দল ফাইনালে যেতে পেরেছে। এই কারণে দিন দিন লাতিনদের দৌরাত্ম কমে গিয়েছে কথাটা হয়তো তেমন অবিশ্বাস্য শোনায় না। কিন্তু সত্যিটা কি আসলেই তেমন? আমার মন এটা মানতে সায় দিচ্ছে না। তাই একটু ঘাটাঘাটি করলাম। সেটাই সবার সাথে একটু শেয়ার করা যাক।

২.

১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত বিশ্বকাপের আসর বসেছে মোট ২১ টি, এবারের আগ পর্যন্ত আসর ছিল ২০ টি। এই ২০ টি আসরের মাঝে অল লাতিন ফাইনাল হয়েছে মাত্র একবার, বিপরীতে অল ইউরোপ ফাইনাল হয়েছে ৮ বার। ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বনাম উরুগুয়ের ম্যাচটা অবশ্য অলিখিত ফাইনাল ধরা যায়। সেটা ধরলেও অল লাতিন ফাইনাল মাত্র দু’বার। কমপক্ষে একটা লাতিন দল ফাইনাল খেলেছে এমনটা হয়েছে ১২ বার। অন্যদিকে কমপক্ষে একটা ইউরোপের দল ফাইনাল খেলেছে এমনটা হয়েছে ১৮ বার। তাহলে বলে ফেলাই যায় যে ইউরোপের শক্তি লাতিনের চেয়ে বেশি।

প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলগুলোর দিকে তাকালেও একটা বিষয় দেখা যায় –

১৯৩০ – লাতিন

১৯৩৪ – ইউরোপ

১৯৩৮ – ইউরোপ

১৯৫০ – লাতিন

১৯৫৪ – ইউরোপ

১৯৫৮ – লাতিন

১৯৬২ – লাতিন

১৯৬৬ – ইউরোপ

১৯৭০ – লাতিন

১৯৭৪ – ইউরোপ

১৯৭৮ – লাতিন

১৯৮২ – ইউরোপ

১৯৮৬ – লাতিন

১৯৯০ – ইউরোপ

১৯৯৪ – লাতিন

১৯৯৮ – ইউরোপ

২০০২ – লাতিন

২০০৬ – ইউরোপ

২০১০ – ইউরোপ

২০১৪ – ইউরোপ

এবারের আগের আসর পর্যন্ত লাতিন চ্যাম্পিয়ন নয়বার, ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ১১ বার। এবারের কাপটাও ইউরোপের ঘরে যাওয়ায় ব্যবধানটা দুই থেকে বেড়ে গিয়ে তিন-এ চলে আসলো।

তাহলে তো স্বীকার করেই নেওয়া উচিত যে লাতিনের সাথে ইউরোপের ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলছে।

৩.

স্বাভাবিক ভাবে দেখলে আপনার কাছে এটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে ইদানিং কালে লাতিনের চেয়ে ইউরোপ এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আপনি যখন একটু গভীরভাবে পুরো বিষয়টা দেখবেন তখন বিষয়টা এতটা সরল মনে নাও হতে পারে। লাতিন থেকে থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মাত্র তিনটি দল, তার মাঝে উরুগুয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছে ১৯৫০ সালে। লাতিনের মূল শক্তির জায়াগাটা তাই ওই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাই। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা – এই দুই দল মিলে জিতেছে সাতবার। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ে বাদে শেষ চারে লাতিন অঞ্চলের আর মাত্র একটি দলই সুযোগ পেয়েছে, সেটা ১৯৬২ সালের চিলি।

বিপরীতে ইউরোপের শক্তিশালী দল অনেকগুলো। জার্মানি, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড – এসব বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল বাদেও নেদারল্যান্ডের মতো দল তিনবার ফাইনাল খেলেছে। সেমিফাইনাল খেলেছে আরো ১০ টি দল।

এই সংখ্যাগত জায়াগাটতেই ল্যাটিন মার খেয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৭/১০ টি শক্তিশালী ইউরোপীয়ান দলের সাথে ল্যাটিনের পক্ষ হয়ে লড়ে যাচ্ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা ৩২ বছর ধরে শিরোপা পাচ্ছে না, ব্রাজিলও ১৬ বছরের খরা।

সময়টা একেবারে কম নয়।

৪.

সময়ের দিক থেকে ইউরোপিয়ানরাও কি খুব বেশি এগিয়ে? জার্মানি গত বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ২৪ বছর পর। ইতালি ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ২৪ বছর পর। ফ্রান্সেরও বিশ্বকাপ জয়ের ২০ বছর হয়ে গিয়েছে। স্পেন তো ২০১০ সালে তাদের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো।

ইউরোপ মূলত এগিয়ে যাচ্ছে সংখ্যায় বেশি থাকার জন্য। ইতালির মতো দল প্রথম পর্বে বাদ পড়লেও জার্মানি কাপ জিতে নেয়। লাতিনদের তুলনায় ইউরোপ আগেও যেমনটা এগিয়ে ছিল, এখনও তার কাছাকাছিই আছে। হ্যা, এই ট্যাক্টিকাল যুগে ব্যক্তিগত পারফর্মেন্স দিয়ে কিছু করার চাইতে বেশির ভাগ কোচ দলগত ভাবে করার দিকেই নজর বেশি দিচ্ছে। কিন্তু ফুটবলে বাজারে এই মূহুর্তেও লাতিন খেলোয়াড়দের চাহিদা অনেক।

বাকি থাকে দলগত ভাবে জয়। সেটাও অচিরেই এসে পড়বে আশা করি। ট্যাকটিক্সের চাহিদা যতই থাকুক, স্কিলের চাহিদা পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত থাকবে সেটা বলা যায়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।