এই ক্রিকেটের স্পিরিট ভদ্রলোকটা কে!

এই ভদ্রলোককে আমি কখনো দেখি নি। আমি বিশ্বাস করি, কেউই কোনোদিনও দেখেননি। তারপরও ক্রিকেট ম্যাচ হলে উঠতে বসতে তাঁর প্রসঙ্গ আসে। অনেক তর্ক বিতর্ক হয়। অন্যরকম কিছু ঘটলেই সব নষ্ট হয়ে গেল বলে রব ওঠে।

আমি ভাবি এই ‘ক্রিকেট স্পিরিট’ ভদ্রলোকটা সম্ভবত খুব প্রতাপশালী একজন। সব জায়গায়ই তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। আবার ভাবি তিনি সম্ভবত খুবই ঠুনকো কেউ। না হয়, একটু এদিক সেদিক হলেই কেন ক্রিকেটের স্পিরিট নষ্ট হয়ে যাবে।

কথা গুলো বলছি চট্টগ্রাম টেস্টের প্রসঙ্গে। টেস্টে স্পিনে ত্রাস ছড়িয়ে বাংলাদেশ আড়াই দিনের মধ্যেই জিতে গেছে। জয়টা এসেছে ৬৪ রানের ব্যবধানে। উইন্ডিজের যে ২০ টা উইকেট গেছে তাঁর সবগুলোই নিয়েছেন স্পিনাররা।

এখানেই যত সমস্যা। কেউ কেউ ভয় পেলেন, এমন স্পিন নির্ভর উইকেটের কারণে না আবার আইসিসি ডিমেরিট পয়েন্ট দিয়ে বসে! কেউ কেউ নিজেদের টিম ম্যানেজমেন্টেরই ঘোর সমালোচনা করলেন। তবে, সবচেয়ে বেশি আলোচনা হল ক্রিকেটের স্পিরিট নিয়ে। পান থেকে চুন খসলেই তো নাকি তাঁর সম্ভ্রমহানি ঘটে।

আচ্ছা এই ক্রিকেটের স্পিরিট ভদ্রলোকটা কে!

ক্রিকেটের স্পিরিট কথাটা এসেছে পাশ্চাত্যের ক্রিকেট লিখিয়েদের হাত ধরে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে ইংরেজদের হাত ধরে কথাটির উৎপত্তি। যেহেতু সেখানেই খেলাটির জন্ম, তাই তাঁরা সব কিছু নিজেদের মত করে, মানে ইংলিশ কন্ডিশনের মত দেখতে অভ্যস্ত।

তাই, টেস্টের আর্লি পেস মুভমেন্ট সেখানে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য, আর আর্লি টার্ন ক্রিকেট স্পিরিটের স্খলন। অ-উপমহাদেশীয় দেশগুলো যেহেতু এমন উইকেটের সাথে পরিচিত হয়, তাই তাঁদের মতে এটাই ক্রিকেট স্পিরিটের বিরোধী। মানে, নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা আর কি! যেহেতু আমরা সবাই এমন ক্রিকেট সাহিত্য ও লেখালেখি পড়েই বড় হয়েছি, কিংবা আমরা যারা লেখালিখি করি, তারাও এসব লেখাই অনুসরণ করি, তাই ইংরেজদের এই ফর্মুলাকে আমরা আপ্তবাক্য বলে মেনে নেই।

এবার আসি চট্টগ্রাম টেস্টের উইকেটের প্রসঙ্গে।

একদম প্রথম দিনের প্রথম সেশন থেকে স্পিন ধরা উইকেটগুলোকে ক্রিকেটের পরিভাষায় বলে ‘র‌্যাংক টার্নার’। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের এবারের উইকেট কিন্তু সেই অর্থে র‌্যাংক টার্নার না। এই উইকেটে সন্দেহজনক মাত্রার আন-ইভেন বাউন্সই ছিল না। স্পিন খেলতে জানা, নিদেন পক্ষে ভাল ফুটওয়ার্ক ওয়ালা ব্যাটসম্যান এই উইকেটে টিকে থেকে রান করতে পারবেন। ব্যাটসম্যানদের দায় তাই, খামোখা পিচ কিউরেটর বা টিম ম্যানেজমেন্টের ওপর না চাপানোই উত্তম।

ব্যাখ্যাটা সহজ, বাউন্সি ও সুইং ধরে এমন ট্র্যাকে যেমন ব্যাটসম্যানের টেকনিক ভাল থাকলে তিনি রান পাবেন, তেমনি স্পিনিং উইকেটেও টেকনিক ভাল থাকলে রান পাবেন। হয় কি, উপমহাদেশের বাইরের ক্রিকেটারদের এই স্পিনিং উইকেটে খেলার টেকনিকটা প্রাকৃতিক কারণেই খুব একটা ভাল জানা নেই। তাই উইকেটের ওপর দোষ চাপিয়ে, কখনো ক্রিকেটের স্পিরিট নামক ভদ্রলোকটিকে টেনে এনে বেঁচে যেতে চান তাঁরা।

ক্রিকইনফোতে একজনের মন্তব্য খুব মনে ধরলো। তিনি লিখেছেন, ‘এমনটি টেনিসও ভিন্ন ভিন্ন তিন ধরণের কোর্টে খেলা হয়। পিচে বৈচিত্র, কন্ডিশন এই ব্যাপারগুলো না থাকলে খেলাটাই তো একঘেঁয়ে মনে হবে। কেউ ঘাসের কোর্টে চ্যাম্পিয়ন, কেউ মাটির কোর্টে। তারপরও তারা গ্রেট খেলোয়াড়।’

চট্টগ্রাম টেস্টের ক্ষেত্রেও এই কথাটাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাঁদের স্পিন দুর্বলতার কাছেই মার খেয়েছে। যেমনটা আগে অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ড হয়েছে। এখানে ক্রিকেটের স্পিরিটকে টেনে এনে ব্যাটসম্যানদের দায় এড়ানোটাকে চাইলে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র সাথে তুলনা করা যায়!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।