সেই মেয়েটি এখন কোথায়!

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক কিশোরীর মিনিট তিনেকের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। ১৯৯৩/১৯৯৪ সালে বিটিভিতে অনুষ্ঠিত এক প্রীতি বিতর্কে অংশ নিয়ে কিশোরী বলছিল তাঁর মনের নানা এলোমেলো ইচ্ছের গল্প। বাঁধা পেরিয়ে তার জয় করবার স্বপ্নের গল্প।

সেদিনের সেই কিশোরীর বাচনভঙ্গি, দৃঢ়তা, উচ্চারন সব মিলিয়ে তার কথায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। ভিডিওটি দেখার পরে অনেকেই জানতে চেয়েছেন এত মিষ্টি মেয়েটা এখন এই ২০১৯ সালে কোথায় আছেন বা কি করছেন। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউবের কল্যানে সেই ভিডিওর রেশ ধরে সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁকে নিয়ে একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

যদিও আমাদের কারো কারো কখনও মনে হয়েছে মেয়েটি নিশ্চয়ই ভাল আবৃত্তি করে। কারণ, তাঁর বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, কথা বলার ভঙ্গী আর গল্প বলার স্ট্যাইলে আমাদের চোখ কান আর মন সবই মন্ত্রমুগ্ধ হতে বাধ্য। ১৯৯৩/১৯৯৪ সালে বিটিভির সেই বির্তক আসরে তার অসাধারন বাংলা ভাষায় কথা বলার জোরে শ্রেষ্ঠ বিতার্কিকের উপাধি জিতে নিয়েছিলেন তিনি।

আফসোস! এই তথাকথিত আধুনিক সমাজে এত সুন্দর করে বাংলায় কথা বলতে এখন আর কিশোর কিশোরীদের দেখা যায় না। নিজেদের ভাষা ভুলে আমরা এখন দুই-চার লাইন কথায় অর্ধেক বাংলা বাকি অর্ধেক ইংলিশ মাঝে দুটো হিন্দি শব্দ জুড়ে দেই।

সেই সময়ের সেই স্কুল পড়ুয়া ছিলেন রেবেকা শফি। বাস্তব জীবনেও আজ তিনি বেশ সফল। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে তাঁর জন্ম, বড়ও হয়েছেন এখানেই। বাবা-মা দু’জনই শিক্ষক। তারা কর্মরত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে।

রেবেকার বড় বোন ফারিয়া শফিও পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন। রেবেকা ঢাকা হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পদার্থবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করতে যান। সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাস্ট্রো-ফিজিক্স এর উপর করেন পিএইচডি। কৃষ্ণ বিবরের ঘূর্ণন পরিমাপ বিষয়ে পিয়ার রিভিউড জার্নালে তাঁর প্রকাশনা আছে। এবং এর জন্য দু লক্ষ ডলারের পুরস্কার জিতেছেন তিনি।

তবে একটা সময়ে এসে পড়াশুনার ফিল্ড বদলে পদার্থবিজ্ঞানের পরিবর্তে নিলেন জেনেটিক্স ও নিউরো সাইন্স। এ বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন হার্ভার্ডের হাভার্ড মেডিকেল ইন্সটিটিউট এবং সেন্টার ফর ব্রেইন সাইন্সে। তিনি পোস্ট ডক্টরাল পর্যায়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবেও যোগ দেন সেখানেই।

২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল অ্যান্ড বোর্ড ইন্সটিটিউট অফ এম আইটি অ্যান্ড হার্ভার্ডে জেনেটিক্স এ পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে আছেন। এখানে তিনি বিখ্যাত ইউকে বায়োব্যাংকের ৫ লাখ ডাটা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল বিভিন্ন মানসিক রোগের সাথে সম্পর্কিত জিনগুলো মানব মস্তিষ্কে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে তার উপর।

নিজের লিংকড ইন প্রোফাইলে ক্যারিয়ার বিষয়ে রেবেকা জানিয়েছেন, ‘আমি ফিজিক্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি। কিন্তু সম্প্রতি নিজের আগ্রহ আবিষ্কার করেছি বায়োলজিতে। এখন জেনেটিক্স ও নিয়োরোসাইন্সের ইন্টারসেকশন নিয়ে কাজ করছি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে। পড়াশোনায় সাফল্য পাবার পর নিজের প্যাশন আবিষ্কার করে সে অনুযায়ী পড়াশুনা ও কাজ পরিবর্তন করা নিঃসন্দেহে সাহসী সিদ্ধান্ত। ১৯৯৩/১৯৯৪ সালের সেই বির্তক প্রতিযোগিতায় বক্তব্য রাখতে যেয়ে শেষের দুই লাইন ছিল- ‘একজন সৎ, বিবেকবান, পরিশ্রমী মানুষ হতে পারলেই আমি খুশি। ছেড়ে দিয়েই আমি জিতে যেতে চাই।’

সেদিনের সেই কিশোরী রেবেকা শফী জীবন সংগ্রামে হারেননি। জিতেছেন তিনি, তার পরিশ্রম, বিবেক এবং সততার মধ্য দিয়েই তার জয় হয়েছে। যে অতি আধুনিকতার গড্ডালিকা প্রবাহ বেড়ে চলেছে এই সময়ের দিকভ্রান্ত কিশোর-কিশোরী সেইসব ভুল আর ক্ষতিকর রাস্তায় চলার বিপরীতে শক্তভাবে দাড়াতে রেবেকা শফি একটি প্রেরণার নাম হতেই পারে আজ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।