মুম্বাইকে হাতের মুঠোয় আনা এক তামিল ডন

মুম্বাইয়ের ঢরভি – এটাই এশিয়ার সবচেয়ে বড় বস্তি। এটায় কোনো গর্ব নেই। এখানকার কেউ কেউ কারখানায় কাজ করে, কেউ দিনমজুর, কেউ আবার উচ্চাকাঙ্খায় পা বাড়ায় অপরাধ জগতের দিকে।

এখানে যারা থাকে তাঁদের বড় একটা অংশ তামিল ভাষাভাষি। মানি রত্নমের ছবি ‘নায়াকান’ (১৯৮৭) এই বস্তিবাসীর জীবনেরই গল্প। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা এক তামিল গডফাদারের গল্প বলা হয়েছিল কালজয়ী এই সিনেমায়। ফিরোজ খান ‘দয়াবান’ নামে ছবিটির রিমেক করেছিলেন বলিউডে। কমল হাসানের চরিত্রটি করেছিলেন বিনোদ খান্না।

কমল হাসান ‘নায়াকান’ সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিংবদন্তিতুল্য এই অভিনেতা ‘নায়াকান’-এ যা করেছেন ২০১৮ সালে ‘কালা’ ছবিতে ঠিক একই কাজটাই করেছেন দক্ষিণের আরেক সুপারস্টার রজনীকান্ত। দু’টো ছবিই নির্মিত হয়েছে ডরভি’র ডনকে নিয়ে। তিনি হলেন মাফিয়া ডন, কারো কারো চোখে গরিবের রবিনহুড ভারাদারাজন মুদালিয়ার, আশির দশকের মুম্বাইয়ে অল্প কিছুদিনের জন্য তিনি পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতা নিজের হাতের মুঠোয় নিতে পেরেছিলেন।

‘নায়াকান’ ছবির একটি দৃশ্য

পুরোনাম ভারাদারাজন মুনিস্বামী মুদালিয়ার। সবাই ডাকতো ভারা ভাই বা বড় ভাই নামে। জন্ম ও বেড়ে ওঠা তামিলনাড়ুর চেন্নাই, উপকূলীয় শহর তুতিকোরিনে। জীবন শুরু হয় কুলি হিসেবে, আর শেষ হয় একজন ডাকসাইটে মাফিয়া ডন হিসেবে – নি:সন্দেহে সিনেম্যাটিক এক চরিত্র।

মুম্বাইয়ে এসেছিলেন ভাগ্যের খোঁজে, সেটা ১৯৪৫ সালের কথা। কুলির কাজ করতেন ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস স্টেশনে। ডক ইয়ার্ডের মালামাল বহন করতেন। সেটা করতে গিয়েই টুকটাক চুরিতে হাত পাঁকিয়ে ফেলেছিলেন। সেটাই শুরু। এরপর আর অন্ধকার জগৎ থেকে নিজেকে ফেরাতে পারেননি ভারাদারাজন।

কালক্রমে হাজি মাস্তান মির্জার সাথে ওঠাবসা শুরু হয় ভারাদারাজনের। এটা অবশ্য কঠিন কোনো ব্যাপার ছিল না। কারণ, দু’জনই ছিলেন মুম্বাইয়ের বাইরের লোক। আর মজার ব্যাপার হল, কাকতালীয় ভাবে দু’জনেরই জন্ম হয় ১৯২৬ সালের এক মার্চ।

‘গডফাদার’ – ভারতীয় গণমাধ্যমের রায়

ভারাদারাজন মাস্তানদের খুব কাছের লোক ছিল। ষাটের দশকে তিনি দরগার বাইরে ঘুরতেন, স্থানীয় গরীবদের আর্থিক সাহায্য করতেন। সেই সুবাদে তিনি নজরে আসেন। মাস্তানদের সহায়তায় বেআইনী মদের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এমনিতেই ভারাদারাজনের বন্দরের সাথে যোগাযোগ ভাল ছিল। তিনি ছিলেন ইউনিয়ন নেতা।  এর ওপর মাস্তানদের সাথে মিলে তিনি চোরাকারবারিতে নিজেকে জড়ান।

এরপর খুন, মাদক পাচার, জমিদখল – এমন অনেক অপরাধের সাথেই নিজেকে জড়িয়েছেন এই তামিল ডন। তবে, মাতুঙ্গা, সিয়ন, ঢরভি ও কলিওয়াড়া এলাকার তামিল ভাষাভাষী মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ আসনে। যেকোনো সমস্যা, যেকোনো মিমাংসায় ভারাদারাজনেই আস্থা পেত সেখানকার মানুষগুলো।

৭০-এর দশকে মুম্বাইয়ে হাজি মাস্তান, করিম লালা ও ভারাদারাজন – এই ত্রয়ী বেশ ভয়ংকর গ্যাঙ চালাতেন। আদতে হাজি মাস্তানের হাতেই ছিল সর্বময় ক্ষমতা। তাঁর দুই হাত ছিলেন করিম লালা ও ভারাদারাজন। করিম লালা দক্ষিণ ও মধ্য মুম্বাইয়ের দেখভাল করতেন। আর ভারাদারাজনের নিয়ন্ত্রনে ছিল পূর্ব ও উত্তর মুম্বাই।

করিম লালা ও ভারাদারাজন মুদালিয়ার (মাঝে)

১৯৬০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত মুম্বাইতে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন ভারাদারাজন মুদালিয়ার। কিন্তু ৮০’র দশকে ইন্সপেক্টর ওয়াই সি পাওয়ারের টার্গেটে পরিণত হন ভারাদারাজন। এই পুলিশ ইন্সপেক্টরের নেওয়া বেশ কিছু জোড়ালো পদক্ষেপের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েন ভারাদারাজন।

৮০’র দশকের মাঝামাঝিতে গনেশ পুজার বিসর্জনে ভারাদাজন গনেশ মুর্তির প্যান্ডেলকে বেআইনী জারি করে সরকারী নোটিশও পাঠানো হয়েছিল। ওই সময়টায় গ্যাঙয়ের সদস্যরা প্রায় সবাই জেলে। ভারাদারাজন বুঝে ফেরেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে। বাধ্য হয়ে তিনি মুম্বাই ছেড়ে দেন।

জীবনের বাকিটা সময় তিনি চেন্নাই ছিলেন। গুটিয়ে নেন নিজের ত্রাসের রাজত্ব, এনকাউন্টারের ভয়ে তো ছিলই। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি চেন্নাইয়ে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়। এর ক’দিন পরই তিনি মারা যান।

মৃত দেহ মুম্বাই নিয়ে আসা হবে – এটাই ছিল ভারাদারাজনের শেষ ইচ্ছা। চার্টার্ড বিমান পাঠিয়ে ভারাদারাজনের সেই ইচ্ছা পূরণ করেন হাজি মাস্তান। লাশ আসে মুম্বাইয়ে। অনুসারীরা ভিড় করে। ১৯৯৪ সালে হাজি মাস্তানও মারা যান। আর এখন তো মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডই ঘুমিয়ে গেছে। কে জানে, হয়তো এটাই আগ্নেয়গিরির সুপ্তাবস্থা,  যে কোনো সময় আবারো আগুন বের হতে পারে!

মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সুপ্তাবস্থায় অবশ্য থেমে নেই বলিউড। ভারাদারাজন মুদালিয়ারের জীবন দক্ষিণের মত বলিউডেও বেশ হিট একটা প্লট। ‘অর্ধসত্য’ সিনেমায় সদাশিব অমরাপুরকার, ‘মশাল’ (১৯৮৪) সিনেমায় ওঁম পুড়ি, ‘সত্য’ (১৯৯৮) সিনেমায় মনোজ বাজেপেয়ীদের চরিত্রগুলো ভারাদারাজনের চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত।

ডিএনএটাইমস অব ইন্ডিয়া  অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।