কোথায় যাবো? কি খাবো?

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে মাংস, চিজ, বড় চিংড়ি কিনে হিমায়িত করা হয়। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে সেগুলা বিক্রি হচ্ছে। সব বড় সুপার শপ, নামি দামি রেস্তরা তে এগুলো যাচ্ছে নিয়মিত ভাবে। ফেব্রুয়ারীর ২৫ তারিখে শিকাজু কোল্ড স্টরেজ এ অভিযান চালানোর পর ধরা পরে এই কাহিনী। মাংস পচে গলে যাচ্ছে। সেগুলাই যাচ্ছে সুপার শপে এবং নামিদামি ব্র্যান্ডের রেস্টুরেন্টে।

সুপার শপের চটকদার বিজ্ঞাপন, ডিসকাউন্ট আর বিভিন্ন খাবার গ্রুপের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে আমরা যাই কিনতে, আর এগুলাই কিনে আনছি। ফুড গ্রুপ গুলোতে বিজ্ঞাপন দেখে অবাক হয়ে যাই। মাত্র ৯৯ টাকায় এতো খাবার। মাত্র ১২০ টাকায় এতো খাবার। কখনো ভাবি না, এসব কি পচা মাংস দিয়ে তৈরি নাকি ভালো। পেইড আর মালিকের রিভিউ দেখেই দৌড় মারি।

শুধু একটা গোডাউনের কাস্তমার লিস্ট দেখেই শকড। নাম গুলো নিচ্ছিনা, তবে যে কেউ গুগল করলেই পেয়ে যাবেন। একটা জিনিস ভাবেন তো। মদ্ধবিত্ত ফ্যামিলির লোক রা টাকা জমিয়ে মাসে এক বা দুইদিন খেতে যায়। ছাত্র বা বেকার রা অনেক কস্টে টাকা জমিয়ে খেতে যায়। তাদের টাকা তো পচা না বাসি না। তাহলে তারা কেন এসব পঁচা জিনিস খাবে?

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। এক নামকরা সুপার শপে কিছুদিন আগে এক লোক গরুর মাংস কিনতে যান। সন্দেহ হলে তিনি ভোক্তা অধিকার কে জানান। তারা এসে দেখে মাংস ইতিমধ্যে পচন ধরেছে। ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ওখান থেকে নিয়মিত মাংস নেয় এক জনপ্রিয় পিজা শপ। ওই পিজার পোস্ট বিভিন্ন ফুড গ্রুপে খুব সুন্দর ভাবে দেয়া হচ্ছে।

দেখলাম গরু বিক্রি হচ্ছে ৫২৫ টাকা করে। আপনি এক কেজি গরু কিনে এরপর শুধু মাংস নিয়ে মাপেন। ৭০০-৭১০ গ্রাম পাবেন। এবার একটা পিজা বা বার্গারে যে পরিমান দেয়া হয় সে পরিমানের দাম আন্দাজ করলেই বুঝবেন যে মুল দাম কত হতে পারে। একই কথা খাটে মুরগির ক্ষেত্রে। তাহলে এত সস্তায় কিভাবে দেয়?

আমি ঢালাও ভাবে সবাইকে দোষ দিচ্ছি না। বেশির ভাগ বেশি লাভের আশায় এই কাজ করছে। আর কম ভাগ লোক না জেনে কম দামে কিনবে এই আশায় এইগুলা কিনছে। এদের যুক্তি আছে। মার্চ এর ১৭ তারিখে খোলা বাজারে ৫২৫ টাকা গরু বিক্রি হলেও ইম্পোরটেড হালাল গরু ছিলো ৩৭৫ টাকা। সো এটা পচা হতে বাধ্য। কারন সেদিনের আমদানি মূল্য সকল ট্যাক্স দেয়ার পর এক কেজি গরুর দাম আসে ৭২৫ টাকা। খুব সামান্য পরিমান লোক হালাল বেবসা করছে, টাটকা এবং ভালো খাবার দিয়ে দোকান চালাচ্ছে।

চিনবেন কিভাবে? আগে তো দাম বেশি হলে ভালো জিনিস এটা বুঝা যেতো। এখন তো এই ট্রিক্স সবাই করছে। ব্র্যান্ড এ যাবেন? সেখানে হর হামেশা জরিমানা হচ্ছে। তাহলে কি করা যায়?

জাপানে একবার এই জাতীয় একটা সমস্যা হয়েছিলো ২০১৩ সালে জুলাইয়ে। তারা এলাকাভিত্তিক বয়কট করেছিলো। যেমন ধরুন, আমরা বলে দিলাম খিলগাঁও এলাকায় যদি কোন দোকান ভেজাল খাবার বিক্রি করে তাহলে সব দোকান বন্ধ করে দেয়া হবে। জাপানে কাজ হয়েছিলো। বাংলাদেশে কাজ হবে?

উত্তর হচ্ছে না। কারণ, বাঙালি টিকেটের জন্য এক লাইনে দাড়াতে পারে। কিন্তু নিতির প্রশ্ন গুলোতে এক হয় না। তাহলে কি করা যায়? আপাতত নিয়মিত অভিযান আর জন সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া কোন উপায় নাই।

আসুন কিছু অবাস্তব কাহিনী বলি।

১.

ফুটপাতে কিংবা বাসস্টান্ডে দেখবেন চিংড়ির মাথা বেসনে চুবিয়ে নিম্ন মানের তেলে ভাজছে। দেখলেই অনেকে নাক সিটকাবেন। মনে রাখবেন এটার মুল উপাদান টাটকা। তেলটা আগের দিনের হতে পারে। আর যদি দামি রেস্টুরেন্টে যান, আপনই নিশ্চিত থাকেন চিংড়িটা বহুত পুরানো। ৯৭% চাইনিজ রেস্টুরেন্টের চিংড়ি ফ্রোজেন এবং বহু আগের।

২.

কম দামি ফাস্ট ফুডের দোকানে দেখবেন ৬০/১০০ টাকায় পিজ্জা পাওয়া যায়। মাংশের বদলে পিয়াজ ভুনা, চিকেন এর বদলে ডিম ভাজা এসব দেয়। নিশ্চিন্তে খেয়ে ফেলেন। সব টাটকা, এখানে মুল উপাদানে ভেজাল কম। দামি রেস্টুরেন্ট গুলোর মধ্যে ৫১ টা রেস্টুরেন্ট নিয়মিত ভাবে উপরের পচা বিফ নিয়ে খাবার রান্না করে।

এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। শুধু খাবার না। সব কিছুতেই ভেজাল আছে, ঔষধে ভেজাল, পানিতে ভেজাল, ফলে ভেজাল, মাছে ভেজাল। এভাবে চললে আগামি ১০/১২ বছর পর নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি হবে।

ভোক্তা অধিকারকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। ভোক্তা অধিকার না থাকলে আমরা এসব পচা গোস্তের কথা জানতামই না। বোকার মতো আচরণ করতাম। সেই আচরণ দিয়ে লেখা শেষ করবো।

ফেসবুকে একটা ফুড গ্রুপে জনৈক মালিক কাস্টমার সেজে বিশাল বড় বারগার এর রিভিউ দিলেন। তিন পাটি বারগার মাত্র ১২০ টাকা। খুব ট্যাঁস। বাস লোকজন টাগানো শুরু করলো। চল যাই চল যাই করা শুরু করলো। মার্কেট পেয়ে গেলো। এক পিস সলিড বিফ পেটির কস্টিং প্রাইস ৪১ টাকা (তথ্য নামকরা কোম্পানির থেকে নেয়া। এটা উতপাদন খরচ)।

তাহলে তিন পিস প্যাটির উৎপাদন খরচ ১২৩ টাকা। সাথে মশলা পাউরুটি তো আছেই। দোকানের লাভ দোকানের খরচ ধরলামই না। এরমানে একটা তিন পেটি বারগার এর দাম আস্তেসে কমপক্ষে ১৭৫ টাকা (নামকরা কোম্পানি’র হিসাব অনুযায়ী)। সাধারণত ১৭৫ টাকা কষ্ট হলে দোকানী এই বারগার টা ৩৫০ এর নিচে কোন ভাবেই বিক্রি করবে না। কিন্তু ১২০ টাকাতে কিভাবে পাচ্ছেন?

আচ্ছা আমি কি উপরের কোথাও বলেছি, মোহাম্মদপুরের বেশ কয়েকটা বিরিয়ানির দোকানের গরুও সেই পচা মাংস থেকেই নিয়মিত গিয়েছে ২০১৭ থেকে ২০১৯ এর জানুয়ারি পর্যন্ত? বলি নাই মনে হয়। সুস্থ থাকার চেষ্টা করুন – শুধু এটুকুই বলতে পারি।

– মাখন মোহাম্মদের ফেসবুক ওয়াল থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।