অমানুষিক পরিশ্রমী এক ক্রিকেটারের খামখেয়ালী

আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগেই সাকিব আল হাসানকে জুয়াড়িরা ম্যাচ ফিক্সিং-এর প্রস্তাব দিয়েছিল। সাল ২০০৮, মার্চ। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের আগে জুয়াড়িরা সাকিবকে ফিক্সিংয়ে বিনিময়ে ‘স্পন্সরশিপ’ পাইয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়েছিল।

সাকিবের বয়স তখন খুবই কম, মাত্র বাইশ বছর। কেবলই নিজেকে মেলে ধরছেন, নিজের জাত চেনাতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনি জুয়াড়িদের ঝানু চোখে সাকিব ধরা পড়ে। ওরা বুঝতে পারছিল, এলোমেলো মিষ্টি দুষ্ট হাসির এই তরুণের ভিতর বারুদ আছে। জুয়াড়িরা সেই বারুদ নিয়েই খেলতে চেয়েছিল অত্যন্ত লোভনীয় প্রস্তাবের বিনিময়ে।

মনে রাখা উচিৎ সাকিব তখনও ‘দ্য মাইটি’ সাকিব আল হাসান হয়ে উঠেনি, মাত্রই খেলা শুরু করেছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটও তখন এখনকার মতো আহামরি কোন পজিশনে নেই। মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ পরিবারের সাকিবের পক্ষে কিন্তু খুব সহজ ছিল ক্যারিয়ারের শুরুতেই সেই লোভনীয় আকর্ষণীয় প্রস্তাবে রাজি হয়ে ব্যাক্তি ক্যারিয়ার সিকিউর করে গুছিয়ে নেয়া।

বাইশ বছরের তরুণ সাকিব সেদিন এক মুহুর্ত চিন্তা না করেই ফিরিয়ে দিয়েছিল জুয়াড়িদের। পা ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল লক্ষ কোটি টাকার অফার।

সাকিব দেশের জন্য খেলে গেল। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ সে বার সিরিজ জয় করল। সাকিব হয়ে উঠতে লাগল ‘দ্য সাকিব আল হাসান’।

২০১৫ সালে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসি সাকিবকে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে ‘নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করল।

২০১৯ এর জুনে, সাকিব আল হাসান অর্জন করল দ্রুততম খেলোয়াড়ের খেতাব যিনি মাত্র ১৯৯ ম্যাচ খেলে ছয় হাজার রান এবং আড়াইশ উইকেট পেয়েছে।

সাকিব আল হাসানই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ক্রিকেট বিশ্বকাপে একই সাথে ১০০০ রান এবং ৩০ উইকেট লাভ করবার গৌরব অর্জন করতে পেরেছে।

এতো এতো যার অর্জন, সেই সাকিব আল হাসান সর্বশেষ নিজের ব্যক্তি স্বার্থের কথা না ভেবে শুধুমাত্র দেশের ক্রিকেটের জন্য সর্বস্তরের ক্রিকেটারদের নিয়ে সামনে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মহাক্ষমতাশালী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) থেকে তেরো দফা দাবীর পক্ষে পজেটিভ রেজাল্ট নিয়ে এসেছে।

ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের যাত্রা রূপকথার মতো। সাকিব আল হাসান কেবল ছোট দলের বড় তারকাই নয়, সামগ্রিক বাংলাদেশের প্রাণভোমরা সাকিব আল হাসান।

২০১৭/১৮ সালে জুয়াড়িরা আবারও সাকিবকে প্রস্তাব পাঠায়। সাকিবের মতো বিশ্বসেরা খেলোয়াড়কে বশ করতে নিশ্চয়ই বিনিময়ের অংকটা ছিল বিশাল কিছু। আমাদের সাকিব এবারও সেই ম্যাচ ফিক্সিং- প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তবে একটা ছোট ভুল করে, গতবারের মতো সে আইসিসিকে জানায়নি। হয়তো প্রয়োজনই মনে করেনি। তুমুল প্রতিভাবান আর অমানুষিক পরিশ্রমী এক ক্রিকেটারের খামখেয়ালী ছাড়া এ আর কিছুই নয়।

গত এক বছর ধরেই সাকিব জানত তাঁর নামে অভিযোগ চলছে, মাথায় এতবড় দুশ্চিন্তা নিয়েও সাকিব আল হাসান কিন্তু বিশ্বকাপ বাংলাদেশের পক্ষে এমনকি সমস্ত ক্রিকেট দলগুলোর মাঝে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিল, মাত্র ছয় ম্যাচ খেলেই ৬০০’র ওপর রান এবং দশ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের যোগ্য দাবিদার।

কতোটা মানসিক শক্তি থাকলে একজন মানুষ এতো কঠিন সময়েও এতো সেরা পারফর্মেন্স করতে পারে!

পারে একজনই সাকিব আল হাসান।

বাংলাদেশের ছেলে বিশ্ব জয় করে চলছে, আমরা জানি না পিছনে কোন লোকাল, আন্তর্জাতিক কন্সপিরেসি চলছে কি না।

বাট রিমেম্বার, সাকিব ম্যাচ ফিক্স করেনি, সাকিব ফিক্সিং – যুক্ত না। সাকিব বরাবরের মতো এবারও সৎ থেকে জুয়াড়িদের অফার ফিরিয়ে দিয়েছিল।

কিছুটা খামখেয়ালী তাঁর ছিল, কিন্তু বিশ্ব জেনে রাখুক আমাদের সাকিব অন্যায় করেনি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।