সুখী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী?

অনেকদিন আগে একজন জিজ্ঞেস করেছিলো – সুখী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী?

আমি অনেকদিন ধরেই বড় আর্টিকেল লেখা বাদ দিয়ে দিছি। বাদ দিয়ে দেওয়া মানে, একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছি তা নয়। লিখিনা। সময় হয়না। আগ্রহ পাইনা। ইচ্ছা হয়না। কোন কিছুর প্রতি একবার আগ্রহ হারালে, জোর করে সেসব করা যায়না। সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, সংসার, লিখালিখি, এই সব জায়গাতে একবার আগ্রহ নষ্ট হলে, জোর করে কিছু হয়না।

সুখী হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কি, তা সম্পর্কে আমি শতভাগ সত্য বলতে পারবোনা। পৃথিবীতে একেকজন মানুষ একেক রকম ভাবে সুখি। আমার কাছে যে জিনিস হতাশার কারন, সেই একই জিনিস অন্য কেউ খুউব করে উপভোগ করতে পারে। আমার কাছে যা কিছু আগ্রহ শূন্য, সেই একই ব্যপারে অন্য কারো প্রবল কৌতুহল থাকতে পারে।

আমার কাছে যা দুঃখ, অন্য কারো কাছে সেটা সুখ। পৃথিবীতে সবকিছু এই একই নিয়মে ঘুরছে, একজনের কান্নার কারনই অন্য জনের হাসির কারন হয়। আমি যাকে না পেয়ে দুঃখী, তাকে পেয়ে কেউ না কেউ তো দিব্যি সুখী হয়ে জীবনযাপন করছে। যে চাকরিটা আমি ছেড়ে এসেছি আত্মসম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে, সেই চাকরিটা করেই কেউ না কেউ দুবেলা ভাতের যোগান দিচ্ছে। সবকিছুই বাই রোটেশন ঘুরছে।

কারো সাথে কারো সুখের ডেফিনেশন মিলবেনা। মানুষ মাত্রই আলাদা আলাদা চরিত্র। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ। ব্যতিক্রম জীবনচক্র।

সবার সুখের ডেফিনেশন এক রকম হয়ে গেলে, মানুষ একই দিকে ছুটতো। একই মানুষকে ভালোবাসতো। একই লক্ষ্যের দিকে দৌড়াতে থাকতো। ব্যপারটা নিশ্চয়ই সুন্দর হতো না। মানুষের সাথে মানুষের সুখানুভূতির পার্থক্যই পৃথিবীকে এত’টা প্রাঞ্জলতা দান করেছে।

আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে, মানুষের সাথে মানুষের পছন্দের পার্থক্য। এটা বেশ অন্যরকম। এই ব্যপারটা ভীষন সুন্দর। একটা মানুষকে আমার পছন্দ না, সেই একই মানুষকে কেউ কেউ কি অদ্ভুত ভাবে যত্ন করে ভালোবাসছে। আমাকে কারো অসহ্য লাগে, এই আমাকেও কেউ একজন কত’টা নৈশব্দে সহ্য করে যাচ্ছে।

কারো গায়ের রং, থেতলানো নাক, হাইট, ওয়েট দেখে গা গুলিয়ে আসে, কেউ কেউ তো সেই মানুষটাকেও রেখেছে তার ঈশ্বরের প্রার্থনায়। আমার অপছন্দের মানুষ, কারো জীবনের চেয়েও প্রিয়। আমি যাকে দেখলে পাশে বসতে চাইনা, তার জন্যও পৃথিবীর কোথাও একজন চোখে কাজল দিয়ে মাঝরাত অব্দি টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে থাকে।

এই ব্যপারটা আমাকে সত্যিই সুখী করে। পৃথিবী কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়না। এটাই মানুষের প্রতি পৃথিবীর জাদুর চমক। ব্যপারটা সত্যিই ম্যাজিকাল।

আমি অন্য মানুষের সুখি হওয়ার কারন খুঁজতে যাইনি কখনো। আমি নিজে নিজেই সুখী হওয়ার একটা উপায় বের করেছি।

পৃথিবীতে সবকিছুকে অবলীলায় গ্রহন করার চাইতে জরুরী হলো জীবন থেকে কিছু জিনিস বর্জন করা। বর্জন করা ব্যপারটা আমরা সহজভাবে নিতে পারিনা। একবার এক পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্নে একটা ম্যাথে পাঁচটা অপশন। শেষ অপশনটা হলো ক্যান নট বি ডিটারমাইন্ড। ১০ মিনিট ম্যাথ সমাধান করার চেষ্টার পর আমি প্রথম চারটি অপশনের কোনটাই মেলাতে পারছিলাম না। যদিও আমি শেষ অপশনটা দেখেছিলাম, তবুও ওটা গ্রহন করতে ইচ্ছে হয়নি। ক্যান নট বি ডিটারমাইন্ড অপশনটা সবগুলো প্রশ্নেই ছিল।

আমার বারবার মনে হচ্ছিলো, আমি বোধয় কোথাও ভুল করেছি। পরীক্ষার শেষ সময়ে একটা অপশনে গোল্লা ভরাট করে বাসায় আসার পর দেখলাম, এটার উত্তর মূলত ক্যান নট বি ডিটারমাইন্ডই হবে। এখান থেকে একটা জিনিস আমি খেয়াল করলাম, আমাদের মস্তিষ্ক সহজে কোন কিছুকে বর্জন করতে পারেনা। সব সময়ই গ্রহন করতে চায়। অথচ, কখনো কখনো জীবনের চরম সত্যটা বর্জনেই সুন্দর। কখনো কখনো অনেক প্রশ্নের কোন সঠিক উত্তর থাকেনা। এটা মেনে নিতে পারার ম্যাচিউরিটিই মূলত মানুষকে প্রকৃত সুখী করতে পারে।

আমার জীবনে সুখী হওয়ার ডেফিনেশনে আমি সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দিই অবহেলা করতে জানাকে। অবহেলা শব্দটা ইংরেজিতে একটু অন্যরকম, এটা মূলত ইগনোর বললে শুনতে ভাল লাগে। জীবনে সুখী হতে হলে গ্রহন করার চাইতে ইগনোর করতে শেখাটা বেশি জরুরী। মানুষ যখন অনেক কিছুকেই ইগনোর করতে শিখে যায়, তখন তার জীবনে দুঃখ কষ্টের তীব্রতা কমে আসে।

আমাদের অনেকেরই অভিযোগ থাকে, কেউ আমাদের ইগনোর করছে। এটা আমার জন্য কষ্টের, তার জন্য আনন্দের। মানুষ মূলত আনন্দকেই খুঁজে বেরায়। আমাকে কেউ ইগনোর করছে মানে, আই এম নট গুড এনাফ ফর দেম। আমাকে কেউ ইগনোর করছে মানে, দে আর নট কমফরটেবল উইদ মি। আমাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা মানে, তার জীবনে আমার মূল্য একেবারেই নগন্য। সে মূলত ভাল থাকতে চাইছে বলেই ইগনোর করছে।

মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় অবহেলায়, মানুষ সবচেয়ে বেশি সুখী হয় অবহেলাকে একবার অবহেলা করতে শিখে গ্যালে। কারো পাত্তাহীনতায় জীবনে কিচ্ছু আসে যায়না, এটা সাময়িক একটা বিরহের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়, সত্যি; তবে এই পাত্তাহীনতাকে পাত্তা দেওয়া বন্ধ করতে পারলেই মানুষ মূলত সুখী।

আমাকে অনেক মানুষ গ্রহন করতে পারেনা, এটা হতে পারে। আমিও তো সবাইকে একইভাবে একই প্রায়োরিটি দিয়ে জীবনে গ্রহন করিনা। মানুষের সাথে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ থাকবেই। এটাকে অস্বীকার করা যাবেনা। বরং এই যে অন্য কেউ আমাকে বর্জন করছে, এই চিন্তাটাকে বর্জন করতে শিখতে হয়। আমি তো তাদের সাথে জীবনের আরামকে ভাগ করে নিই, যারা আমাকে গ্রহন করতে পারে।

মানুষ আমাকে নানান সময় নানান রকমের কথা বলে ছোট করতেই পারে, হয়তো তার চোখে আমি তেমনই। যে মানুষের চোখের দৃষ্টিতে আমি অতি ক্ষুদ্র অ্যামিবার মতন জায়গা দখল করে আছি, সে মানুষকে আমি আমার দুঃখ কষ্টের কারন বানাই না। তাদেরকে ইগনোর করতে শেখাই আমার জীবনের বড় অর্জন।

পৃথিবীর সবকিছু আমার মনের মতন হয়না। হবেনা। কখনো হয়নি। আমিও সবার মনের মতন নই। হবোনা। কখনো ছিলামনা। এই সত্যটা মানতে জানতে হবে।

ফেসবুকে এমন অনেক মানুষের লেখা দেখি, যা আমি নিতে পারিনা। জবাব দিতে ইচ্ছে হলেও, চুপসে থাকি। আমাকেও তো সবাই নিতে পারেনা। কারো কারো কাছে আমিও অসহ্য ধরনের।

যেহেতু মতাদর্শের ভিন্নতা একটি চরম সত্য বৈশিষ্ট্য, সেহেতু ইগনোর করাই সবচেয়ে উত্তম। জবাব দিলে সম্পর্ক নষ্ট হয়। অযথা ঝামেলা এড়িয়ে চলাটা খুউব জরুরী। থাকুক না, যে যার মতন। সে হয়তো ওটাতেই সুখী।

ওসব ইগনোর করলেই বরং আমার জীবন সুখী হয়।

সম্পর্কের বেলায়ও ইগনোর করা জরুরী; মানুষটাকে নয়। মানুষটাকে ইগনোর করতে হয় তখন, যখন স্বাধীনতার প্রয়োজন হয়। দমবন্ধ লাগে। মুক্তির স্বাদ পেতে ইচ্ছে হয়।

মানুষটাকে ইগনোর করতে হয় তখন, যখন সম্পর্কের অলংকার গলায় শেকল হয়ে আটকে যায়।

সম্পর্কে ইগনোর করতে হয় তুচ্ছু ঝামেলার কারনকে। ছোট্ট ছোট্ট অপ্রত্যাশিত শব্দকে। বিচ্ছেদ টেনে নিয়ে আসা সম্ভানাময় যমদূতের প্ররোচনাকে। এসব ছোটখাটো ব্যপার যে যত দারুনভাবে ইগনোর করতে জানে, সম্পর্কে সে ততো বেশি সুখী।

বেশ কিছুদিন আগে যে আমাকে সুখী হওয়ার জন্য কি সবচেয়ে বেশি জরুরী, প্রশ্নটা করেছিলো, তার জন্য একটাই উত্তর আমার- পৃথিবীতে যে যত বেশি ইগনোর করতে শিখেছে, সে ততো বেশি সুখী।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।