বেন কিংসলে: রূপান্তরের অবিস্মরণীয় সম্রাট

একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা কোনটি? – এই প্রশ্নের জবাবে অবশ্যই সবার আগে বলতে হয় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের সাথে মানিয়ে নিতে পারার সামর্থ্যের কথা। একজন অভিনেতাকে যেমন ভাবে একজন আশাবাদী পারিবারিক চরিত্র করতে জানতে হয়, তেমনি একজন তুখোড় অপরাধী কিংবা একজন বিধ্বস্ত বিষন্ন আশাহীন মানুষের চিত্রায়নটাও করতে হয়।

একজন দক্ষ অভিনেতার খুব বেশি মেক-আপ ছাড়াই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যে কোনো জাতির মানুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষমতা থাকা জরুরী। যদিও, বিশ্বজুড়ে এত গাদা গাদা অভিনেতাদের মধ্যে খুব কমজনের মাঝেই এই ব্যাপারটা আছে। এমনই বিরল ক্ষমতার অধিকারী একজন হলেন ব্রিটিশ অভিনেতা বেন কিংসলে। তিনি কখনো মহাত্মা গান্ধী হয়েছেন, কখনো ভ্লাদিমির লেনিন বনেছেন, কখনোও বা মিশরের ফারাওয়ের চরিত্র করেছেন। তাই তো তিনি রূপান্তরের অবিস্মরণীয় এক সম্রাট।

১৯৮৩ সাল। অস্কার হাতে পরিচালক রিচার্ড অটেনবরো’র সাথে বেন কিংসলে (ডানে)।

বেন কিংসলে’র আসল নাম হল কৃষ্ণ পন্ডিত ভানজি। ১৯৪৩ সালে ভারতীয় বংশদ্ভুত এক ডাক্তার পরিবারে তার জন্ম জয়। বাবা হলেন রাহমিতুল্লা হারজি ভানজি। তিনি গুজরাটের মানুষ, জন্ম কেনিয়ায়। মা হলেন ব্রিটিশ মডেল অ্যানা লিনা ম্যারি গুডম্যান। এই নারী একাধারে একজন রাশিয়ান ও ইহুদি বংশদ্ভুত। ২০ ও ৩০-এর দশকে অ্যানা কিছু চলচ্চিত্রেও কাজ করেছিলেন।

বেন কিংসলে ছাড়াও পরিবারে আরো তিনজন সন্তান ছিল। পরিবারের চাওয়া ছিল কিংসলে বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। যদিও, কখনোই পরিবারের সেই চাওয়ায় মত ছিল না তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমি ম্যানচেস্টার গ্রামার স্কুলে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিদ্যা – সবই পড়েছি। ওসব নিয়ে কোনো আক্ষেপও নেই। এখন বিজ্ঞানবিষয়ক কোনো চরিত্র করতে গেলে ওই পড়াগুলো কাজে আসে।’

আফগানিস্তানের রাষ্টপতির চরিত্র। ছবির নাম ‘ওয়ার মেশিন’ (২০১৭)।

একবার স্ট্র্যাটফোর্ডে একটা পারিবারিক ট্যুরে গিয়ে আসে কিংসলের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়। সেবার রয়্যাল শেকসপিয়ার থিয়েটারে ইয়ান হোমকে তিনি রিচার্চ তৃতীয়’র চরিত্র করতে দেখেন। কিংসলে সেদিন এই অভিনেতার ডায়লোগ বলার ধরণ, হাঁটার ভঙ্গী অনুকরণ শুরু করেন। থিয়েটার থেকে বের হয়ে বাবা-মা’কে কিংসলে সাফ জানিয়ে দেন, ডাক্তার নয় তিনি অভিনেতাই হতে চান।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর নামটা নাকি মঞ্চের কর্মীরা ঠিক ভাবে উচ্চারণ করতে পারতো না। পাশ্চাত্যের লোকজনের আসলেই কৃষ্ণ ভানজির মত শক্ত নাম সঠিক ভাবে উচ্চারন করতে পারার কথাও নয়। তাই তরুণ বয়সে বেশ আক্ষেপ হত কিংসলের।

মহাত্মা গান্ধীর রূপে

যার নামই লোকে ঠিকমত বলতে পারে না, সে কি করে আর চরিত্র পায়। তাই কৃষ্ণ ঠিক করলেন, নিজের জন্য মানানসই একটা ইংরেজি নাম খুঁজতে হবে। সেদিন থেকে কৃষ্ণ ভানজি হয়ে গেলেন বেন কিংসলে।

১৯৬৭ সালে কিংসলে রয়্যাল শেকসপিয়ার কোম্পানিতে যোগ দেন। এরপরের ১৫ টা বছর তিনি মঞ্চ নাটকে ব্যয় করেন। ‘হ্যামলেট’, ‘আ মিডসামার নাইট’স ড্রিম’, ‘কিং লিয়ার’, ‘মাচ আডো অ্যাবাউট নাথিঙ’ ইত্যাদি খ্যাতনামা নাটকে তিনি ছিলেন অপরিহার্য মুখ।

১৯৯৫ সালের টেলিভিশন সিরিজ ‘মোজেস’।

টেলিভিশনেও কাজ পেতে শুরু করেন। চলচ্চিত্রেও কালেভদ্রে ছোটখাটো চরিত্র পেতেন। তবে, সব কিছু পাল্টে যায় ১৯৮২ সালে। তিনি ঐতিহাসিক ছবি ‘গান্ধী’-তে কেন্দ্রীয় চরিত্র করেন। চরিত্রটি ছিল ভারতের স্বাধীনা আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ মহাত্মা গান্ধীর।

কিংসলে বারবারই নানা সময়ে বলে এসেছেন, গান্ধী চরিত্রটি তাঁর জন্য বড় সুযোগের চেয়েও ছিল বড় একটা দায়িত্ব। কিংসলে হলেন ‘মেথড অ্যাক্টর’। তাই, গান্ধী চরিত্রটির ভেতরে ঢুকে পড়তে তিনি চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি। ইতিহাসের বই পড়েছেন, পুরনো ভিডিও দেখেছেন।

পাঞ্জাবী শিখ দারওয়ান সিং!

নিজেকে আমূল বদলে ফেলে নিরামিষভোজী জীবন শুরু করেন। শরীরের ওজন ১০ কেজি কমিয়ে ফেলেন। মাথা কামিয়ে ফেলা তো ছিল বাধ্যতামূলক ব্যাপার। শুধু তাই নয়, নিয়মিত যোগব্যায়াম ও ধ্যানচর্চাও শুরু করেন।

এই পরিশ্রমের ফলও তিনি পেয়েছেন। চরিত্রটি করে তিনি পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পুরস্কার পান। সেরা অভিনেতা হিসেবে তিনি অস্কার, বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার পান। সেরা নবাগত হিসেবে জিতেন বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব।

ভ্লাদিমির লেনিনের চরিত্র করেন ‘লেনিন… দ্য ট্রেন ছবিতে। মুক্তি পায় ১৯৮৮ সালে।

সেই শুরু। এরপরও আরো অসংখ্যবার অস্কার ও গোল্ডেন গ্লোবের মনোনয়ন পেয়েছেন বেন কিংসলে। ব্রিটিশ সিনেমায় অবদান রাখার জন্য ২০০২ সালে তিনি ‘নাইট’ উপাধি পান। নামের সাথে যোগ হয় ‘স্যার’।

ছেলেবেলায় বাবা-মা’র সঙ্গ বা আদর খুব একটা যে পাননি সেটা এরই পরে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারেই বোঝা গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন রানীর কাছ থেকে স্বীকৃতি পেলাম, তখন রাস্তার সবগুলো মানুষকে ডেকে ডেকে বলতে ইচ্ছা করছিল – জানে আমার মা আমাকে খুব ভালবাসে। আসলে ঠিক এমন অনুভূতিই হচ্ছিল আমার।’

মিশরের ফারাও। ছবির নাম ‘নাইট অ্যাট দ্য মিউজিয়াম: সিক্রেট অব দ্য টম্ব’ (২০১৪)।

লম্বা সময়ে ক্যারিয়ারে শতাধিক সিনেমা ও টেলিভিশন সিরিজে হাজির হয়েছেন কিংসলে। ‘হাউজ অব স্যান্ড অ্যান্ড ফগ’, ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’, ‘লাকি নাম্বার ‘স্লেভিন’, ‘শাটার আইল্যান্ড’, ‘প্রিন্স অব পার্সিয়া: দ্য স্যান্ডস টাইম’ – ইত্যাদি কাজগুলো এর মধ্যে ওপরের দিকেই থাকবে।

তবে, সব ছাপিয়ে বেন কিংসলের নিজেকে যে কোনো চরিত্রে পাল্টে ফেলার অনন্য ক্ষমতাটাই তাঁকে আলাদা করেছে। কখনো আমেরিকান গ্যাঙস্টার, কখনো বা আরব শেখ, কিংবা আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি, নাৎসি বাহিনীর কর্মকর্তা – সিনেমার প্রয়োজনে কি না বনেছেন তিনি এই জীবনে!

নাৎসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা!

ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।