সোনালী স্মৃতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুনরুত্থানের পালা

ক্যারিবিয়ানদের সোনালী অতিত নেই অনেকদিন হল। এবারের বিশ্বকাপেও তারা এসেছে বাছাই পর্বের বাঁধা টপকে। তবে, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বাঁধন ভেঙে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান তারকারা আবারো একই ছাতার নিচে এসেছেন। প্রত্যেকেই একেকজন বিশ্বমানের তারকা। এদের সবাই এক সাথে জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের আর রক্ষা নাই। তাই, বলা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের ডার্ক হর্স ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

ক্যারিবিয়ানদের পক্ষে আছে পুরনো ইতিহাসও। ক্রিকেটের প্রথম তিনটি বিশ্বকাপ হয়েছিল ইংল্যান্ডে। সেখানে দু’টোর শিরোপা জিতেছিল উইন্ডিজ। আরেকটায় না জিতলেও তারা খেলেছিল ফাইনাল। এবার কি সেই সোনালী স্মৃতির মঞ্চতেই হবে ক্যারিবিয়ান পুনরুত্থান? সেই সক্ষমতা তো এই দলটার আছেই!

  • দলের শক্তিমত্তা

পাওয়ার হিটিং ক্যারিবিয়ানদের মূল শক্তি। টেকনিক্যাল শর্টস খেলে বাউন্ডারি বের করার তুলনায় কবজি এবং পেশীর জোর ব্যবহার করে ছক্কা হাঁকাতে উইন্ডিজ ক্রিকেটাররা বিশেষ পারদর্শী। ওয়ানডে ক্রিকেটের শুরু থেকেই ক্যারিবিয়ানরা তাদের গায়ের জোরকেই ব্যাটিং কিংবা বোলিংয়ের ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

স্যার ভিভ রিচার্ডস তার সময়ে  পেসারদের গতিময় ডেলিভারিও হেলমেট ছাড়া খেলতেন, বিশাল সব ছক্কা হাকাতেন। ক্লাইভ লয়েড থেকে শুরু করে ব্রায়ান লারা, ক্রিস গেইল অবধি সবাই পাওয়ারফুল স্ট্রোক মেকিংকেই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। উইন্ডিজের এই দলেও রয়েছে একাধিক পাওয়ারফুল স্ট্রোকমেকিং খেলোয়াড়! ওপেনিং এ গেইল, লুইস হতে শুরু করে ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নামা অ্যাশলে নার্স – সবাই ব্যাট হাতে ছক্কা হাঁকাতে পারেন।

মেরুনদের আরেকটি শক্তির দিক হলো তাদের পেস জুটি। দলে অভিজ্ঞ কেমার রোচের সাথে বর্তমানে আছেন নতুন সেন্সেশন ওশানে থমাস, নতুন বলে তাঁরা গতির ঝড় তুলে একটানা বোলিং করে যেতে পারেন। উইকেটে যদি হালকা ঘাস থাকে তবে প্রতিপক্ষের টপ অর্ডার ধসানোর জন্য এই দুইজনই যথেষ্ট। এদের সাথে আছে শেলডন কটরেল, শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের মতো একাধিক গতিদানব। বোলিং পাওয়ারপ্লে কাজে লাগাতে পারলে এরা প্রতিপক্ষের জন্য যথেষ্ট হুমকিস্বরূপ।

  • অভিজ্ঞতা

দলের হয়ে, তথা এবারের বিশ্বকাপে সবথেকে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ক্রিস গেইল। এর আগে তিনি চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন এবং এবারই তার শেষ বিশ্বকাপ। ব্যাটসম্যান ড্যারেন ব্রাভো, অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল এবং ফার্স্ট বোলার কেমার রোচ খেলেছেন দুইটি করে বিশ্বকাপ। এছাড়া অধিনায়ক জেসন হোল্ডার এবং আরেক ফার্স্ট বোলার শেলডন কটরেল খেলেছেন একটি করে বিশ্বকাপ। বাকি ৯ জনের সবাই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে খেলতে নামছেন।

  • তুরুপের তাস

ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে ফেলতে পারেন এই দলে এমন একাধিক খেলোয়াড় আছেন। রয়েছেন ‘ইউনিভার্স বস’ খ্যাত ক্রিস গেইল, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যার রয়েছে দশ হাজারের বেশি রান। শেষ ক’বছরে তিনি উইন্ডিজ জার্সিতে নিয়মিত ছিলেন না, নাহলে তিনি হয়তো এতোদিনে তেরহাজারি ক্লাবে ঢুকে যেতেন। বিশ্বকাপে রয়েছে তার ক্যারিয়ারের একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরি, সবমিলিয়ে ওয়ানডেতে তার সেঞ্চুরি সংখ্যা ২৫ টি। ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা ব্যাটসম্যান সম্প্রতি দারুণ ফর্মে রয়েছেন, সবশেষ ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজে ৪ ম্যাচ খেলে দুইটি সেঞ্চুরি হাকিয়েছেন।

দলে রয়েছেন আন্দ্রে রাসেলের মতো আরেকজন চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ার। নতুন বলে যেমন বল করতে পারেন, তেমনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঝড়ো ব্যাট চালিয়ে রানের পাহাড় গড়ে দিতেও পারেন। ক্যারিবিয়ানদের হয়ে অবশ্য রাসেলের ওয়ানডে পরিসংখ্যান খুব একটা সুখকর না। তবে সম্প্রতি আইপিএল খেলে তিনি ফর্মের তুঙ্গে আছেন। আইপিএলের ১৪ ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে করেছেন ৫১০ রান, বল হাতে নিয়েছেন ১০ উইকেট!

শাই হোপ, এভিন লুইস, নিকোলাস পুরান, শিমরন হেটমায়ারের মতো একাধিক বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান রয়েছে দলে ব্যাটিং লাইনআপে। এরা জ্বলে উঠলে ৩০০-৩৫০ রান তাড়া করা এদের কাছে কোনো ব্যাপারই না, বরং এরা ৪০০ রান তাড়া করার সামর্থ্যও রাখে। এদের মধ্যে হেটমায়ার ও ফার্স্ট বোলার ওশানে থমাস ২০১৬ সালের অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন।

দলে অধিনায়ক জেসন হোল্ডার এবং কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের মতো কার্যকর অলরাউন্ডারও রয়েছে। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্র্যাথওয়েটের ৪ বলে ৪ ছক্কা হাঁকানো কাপজয়ী ইনিংসের কথা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যায়নি।

  • দুর্বলতা

উইন্ডিজ ক্রিকেট দল কোনো এক জাতির দল না। এটি একটি বহুজাতিক দল, যা ১৫ টি ছোট-বড় স্বাধীন দেশ ও দ্বৗপের সমন্বয়ে গঠিত। সাধারণত ক্রিকেট খেলায় ‘টিম গেম’ বলে একটা কথা আছে যেটার গুরুত্ব অনেক। মাঝেমধ্যে ম্যাচের কঠিন পরিস্থিতি একহাতে সামাল দেওয়া যায় না। তবে টিম গেম ঠিক থাকলে অসম্ভব কে-ও সম্ভব করা যায়। উইন্ডিজ টিমে বরাবরই এই টিম গেমের বড্ড অভাব।

দলের ১৫ জনই ম্যাচ জেতানো খেলোয়াড়, এরা যখন ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজ টুর্নামেন্ট খেলে তখন দলের মধ্যমণি হয়ে থাকেন। সমস্যাটা তখনই হয় যখন এরা একদলের হয়ে খেলে, নিজেদেরকে এরা একসুতোয় গাঁথতে পারে না।

বর্তমান উইন্ডিজ দলের স্পিন অ্যাটাক খুবই দূর্বল! অ্যাশলে নার্স কিংবা ফ্যাবিয়েন অ্যালেনদের ওয়ানডে পারফরমেন্স মোটেও ভালো না। এছাড়া উইন্ডিজ বোলাররা প্রচুর রান হজম করেন। দলে থাকা সব বোলারদের গড় ইকোনমি সাড়ে পাঁচের ওপরে, কারো কারো সাড়ে ছয় কিংবা সাত ও রয়েছে! মূল স্ট্রাইক বোলাররাও প্রায়ই খেই হারিয়ে পর পর নো-হোয়াইট দিয়ে বসেন।

ক্যারিবিয়ান খেলোয়াড়দের ফিটনেস লেভেল যথেষ্ট ভালো নয়, ফিল্ডিংয়েও তারা ততটা পরিপক্ক নয়। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ মিস করে কিংবা রান আউট মিস করে প্রতিপক্ষকে ম্যাচ উপহার দেওয়ার অতীত রেকর্ড তাদের আছে।

উইন্ডিজের বর্তমান টিমে ধরে খেলা ব্যাটসম্যানের যথেষ্ট অভাব আছে। একমাত্র ইনফর্ম শাই হোপের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল থাকা যায়। যদি আচমকা ব্যাটিং ধস নামে, তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন। ড্যারেন ব্রাভো বর্তমানে অফফর্মে থাকা বিশ্বকাপে তার ওপর চাপ কিছুটা বেশি থাকবে।

  • প্রেডিকশন

একসময় ক্যারিবিয়ানদের সোনালী প্রজন্ম তাবৎ ক্রিকেট দুনিয়া দাঁপিয়ে বেড়েছিল। ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডস, কোর্টনি ওয়ালশ, কার্টলি অ্যামব্রোস, ম্যালকম মাশালদের সামনে প্রতিপক্ষ সবসময় আতংকে থাকতো! দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তারা, একবার রানার আপও হয়েছেন।

সেই সোনালী প্রজন্ম অবসরে যাওয়ার পর ক্যারিবিয়ানরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নব্বই দশকের শেষ হতে গ্রেট ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারার সান্নিধ্য পেয়ে তখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অবশ্য করেছিল, হয়েছিল ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট। সাফল্যের শেষ অধ্যায় ওখানেই।

এবারের বিশ্বকাপে উইন্ডিজের প্রথম ম্যাচ পাকিস্তানের সাথে, ৩১ মে। বর্তমানে তাদের যা ফর্ম সে বিবেচনায় তারা ফেবারিটের তালিকায় পড়ে না। আইসিসির রেঙ্কিং এ তারা আছে অষ্টম স্থানে। তবে টুর্নামেন্টে বড় দলগুলোকে হারিয়ে রাউন্ড রবিন লিগের পয়েন্ট টেবিল জমিয়ে দিতে পারে।

বর্তমান উইন্ডিজ টিমে প্রতিভার ছড়াছড়ি। দু-একজন বাদে এরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বড় ট্রফি জয় করা দলের সদস্য ছিলেন। কেউ হয়তো যুব বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন, না হয় কেউ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন। আরেক ক্যারিবীয় গ্রেট ক্রিস্টোফার হেনরি গেইলের শেষ বিশ্বকাপ এটি। ক্যারিবিয়ানরা কি অনুপ্রাণিত হয়ে তাকে একটি বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারবে? উত্তরটি ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক।

  • ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

শাই হোপ (উইকেটরক্ষক), এভিন লুইস, ক্রিস গেইল, ড্যারেন ব্রাভো, শিমরন হেটমায়ার, নিকোলাস পুরান (উইকেটরক্ষক), আন্দ্রে রাসেল, জেসন হোল্ডার (অধিনায়ক), কার্লোস ব্র্যাথওয়েট, কেমার রোচ, শেলডন কটরেল, ওশানে থমাস, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল, অ্যাশলে নার্স, ফ্যাবিয়ান অ্যালেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।