রাজকীয় রাণী ও একটি হারানো সাম্রাজ্য

নব্বই দশকের বিয়ের ফুল সিনেমার ‘মন আমার এক নতুন মস্তানি শিখেছে’ গানের সেই সদ্য কিশোরী পেরিয়ে সাথিয়া বা ব্ল্যাকের পর সম্প্রতি ‘মারদানী’ সিনেমার শিবানীর মত সাহসী পুলিশ অফিসার। মাঝে পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়, এসেছে উত্থান-পতন। তবুও তিনি নিষ্প্রভ হননি, আপন আলোয় জ্বলে উঠেছেন।

সমসাময়িকদের মত ঝলসানো রুপ কিংবা উচ্চতা হয়তো তাঁর ছিল না, কিন্তু এই বাঙালি কন্যা মায়াবী চেহারা আর অভিনয় গুণে ঠিকই দর্শক জয় করেছিলেন। তিনি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা রাণী মুখার্জী।

বাবা প্রযোজক রাম মুখার্জী, নামকরা অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় হচ্ছেন মাসি। চলচ্চিত্র পরিবারের মানুষ, বাবার বাংলা ছবি ‘বিয়ের ফুল’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক। সেটা ১৯৯৬ সালের কথা। শুরুতেই বাজিমাৎ। ব্যবসাসফল ছবিতো বটেই, আজো নানা অনুষ্ঠানে এই ছবির গান বাজানো হয়।

বাংলার পর বলিউড জগতে পদচারণা, তবে শুরুটা ভালো হয়নি। প্রথম ছবি ১৯৯৬ সালের ‘রাজা কি আয়েগি বারাত’ চূড়ান্ত ফ্লপ। এরপর আমির খানের বিপরীতে ‘গুলাম’, দু’বছরের বিরতি দিয়ে। এই ছবি ব্যবসাসফল তবে অভিনয় করেছিলেন অন্যের কন্ঠে। তাঁর এই ভিন্ন কন্ঠকে নিয়ে বাজি ধরেছিলেন করণ জোহর।

বেশ কয়েকজন নায়িকার ফিরে দেয়া ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ এর টিনা চরিত্র করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। মূল চরিত্রগুলোর মাঝেও এতটুকুও ম্লান হয়নি। একই রকম বলা যায় ‘বীর জারা’, ‘যুবা’, ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’ ও ‘তালাশ; সিনেমার বেলায়ও, পার্শ্ব চরিত্র করেও নিজেকে সমুজ্জ্বল করেছিলেন। অনেক পুরস্কার ও অর্জন করেছেন।

সিনেমাপ্রেমীদের মাঝে তিনি অন্তত বিখ্যাত হয়ে থাকবেন তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সিনেমা ‘ব্ল্যাক’ সিনেমার জন্য। অন্ধ মেয়ের ভূমিকায় দূর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন। ‘হাম তুম’ ছবিটিও ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এছাড়া ক্যারিয়ারে রয়েছে হার দিল জো পেয়ার করেগা, চোরি চোরি চুপকে চুপকে, সাথিয়া, চলতে চলতে, প্যাহেলি, বান্টি অউর বাবলি, কাভি আলবিদা না ক্যাহনার মত সিনেমা।

একটা সময় পর প্রধান নায়িকা হিসেবে একের পর এক ছবি ফ্লপ দিতে লাগলেন। এমনকি মুক্তির আগে আলোচিত ‘দিল বোলে হাড়িপ্পা’ ও ‘আঁইয়া’র মত দূর্বল ছবিও করেছেন। এরপর কিছুদিনের জন্য বিরতি দিয়ে ‘মারদানি’ সিনেমার মাধ্যমে ফিরে আসলেন স্বমহিমায়।

ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগে হলিউডে কাজ করার সুযোগও ছিল। ইরফান খানের বিপরীতে ‘নেমসেক’-এর জন্য রাণীই ছিলেন প্রথম পছন্দ। তবে, একই সময় ‘কাভি আলভিদা না ক্যাহনা ছবি’র শ্যুটিং থাকায় ‘না’ বলে দেন রাণী। পরে চরিত্রটি করেন তাবু। হলিউডে কাজ না করলেও তাঁর দু’টি ছবি অস্কারে গিয়েছিল। সেগুলো হল ২০০০ সালের ‘হে রাম’ ও ২০০৫ সালের ‘প্যাহেলি’।

রাণী অবশ্য আরো কিছু সুযোগ হারিয়েছেন নিজের ক্যারিয়ারে। মনি রত্নমের ‘দিল সে’, আশুতোষ গোয়ারিকরের ‘লগন’ ও রাজকুমার হিরানীর ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’-এর জন্য রাণীই ছিলে প্রথম পছন্দ। তবে, নানা কারণে ছবিগুলোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন তিনি।

‘হিচকি’ ছবিটি দিয়ে স্মরণীয় করেছেন নিজের প্রত্যাবর্তন। একজন শিক্ষিকার ভূমিকায় এখানেও তিনি সফল। তবে যে বাংলা ছবি দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু, সেই বাংলা ছবিতে আর দেখা যায়নি তাকে। অফার ও পেয়েছিলেন, কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও, ছবির প্রস্তাব পাওয়া রাণীর জন্য একেবারেই ডাল-ভাত। কারণ, প্রথম যখন সিনেমা করার প্রস্তাব পেয়েছিলেন তখন তিনি দশম শ্রেণিতে পড়েন কেবল।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন বিখ্যাত প্রযোজক ও নির্মাতা আদিত্য চোপড়াকে। সংসারে রয়েছে একটি মেয়ে। অভিনেত্রী তনুজা ও কাজল নিজেদের পরিবারেরই মানুষ। তিনি সিনেমার দুনিয়ার বাইরে একজন পেশাদার ‍ওড়িষি নৃত্যশিল্পী।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে পেয়েছেন বিশেষ জাতীয় পুরস্কার ও সম্মানজনক ফিল্মফেয়ার। যার মধ্যে একই বছরেই পেয়েছেন প্রধান ও পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে। সেটা ২০০৫ সালের ঘটনা। সেরা অভিনেত্রী হিসেবে তিনি সেবার ‘হাম তুম’-এর জন্য পুুরস্কার পান। আর পার্শ্ব-অভিনেত্রী হিসেবে ‘যুবা’র জন্য। বলিউডের ইতিহাসে এমন নজীর আর দ্বিতীয়টি নেই।

অভিনেত্রী ও পার্শ্ব-অভিনেত্রী হিসেবে এক ফিল্মফেয়ার পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন সাতবার। রাণী একটা সময় বাকিদের ছাপিয়ে সর্বোচ্চ পরিমান পারিশ্রমিক নিতেন। মিডিয়ার ‘ফেয়ারনেস মিথ’ ভাঙতে পেরেছিলেন তিনি। ২০০৪ থেকে ২০০৬ – টানা তিন বছর তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত ভাবে ভারেতর সেরা অভিনেত্রী।

তবে, সেদিন হয়েছে বাসী। রাণী তাঁর সাম্রাজ্য হারিয়েছেন অনেকদিন। তবুও আজ এতগুলো বছর কেটে যাওয়ার পরও তিনি এক মুঠো শুদ্ধ বাতাস!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।