মুকেশ আম্বানির ওয়াশরুমে!

সকাল নয়টায় মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ রেলওয়ে স্টেশনে (সিএসটি) নেমেছি, মহালক্ষ্মী সুপার ফাস্ট ট্রেনের জেনারেল ক্লাসের কামরায় পুনে থেকে চার ঘণ্টা দাড়িয়ে থেকে।

তড়িঘড়ি একটু ফ্রেশ হয়েই, মুম্বাই দর্শনের নন এসি বাসের টিকেট করে নিলাম দু’জনের জন্য। বাস স্টেশনে আসাতে ১০ মিনিট বাকি থাকায়, গরম লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে সকালের নাস্তা করে নিলাম। নাস্তা শেষে পানি খেতে না খেতেই বাস এসে হাজির হয়ে গেল। এরপর সেই সকাল সাড়ে নয়টা থেকে রাত আটটা অবধি টানা ছুট আর ছুট।

মহাসাগরে ট্রলারে চড়া, ফালতু একটা থ্রিডি থিয়েটারে পয়সা নষ্ট করা, দৌড়ের উপরে নিজ নামে খ্যাত হোটেল তাজ আর গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া দেখা, ছবি তোলা, মাঝে একটু লাঞ্চের বিরতি নিয়ে আবারো ছুট আর ছুট শুরু করা।

মুম্বাইয়ের নানা রকমের গরিব, ফকির, মিছকিন, দুস্থ, এতিম আর অনাথ লোকজনের মহাসমুদ্র তীরের বাড়ি দেখে দেখে, দিনের মেরিন ড্রাইভ, বিকেলের লাভারস পয়েন্ট আর রাতের নেকলেস অব কুইন দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে ফেলার পরে অনুভব করতে শুরু করলাম যে, গরমে, ঘামে আর টানা দুই দিনের বিশ্রামহীন জার্নিতে আমরা মহাক্লান্ত।

বিকেলে নেহেরু সাইন্স সেন্টারের অন্যরকম আয়োজন দেখে, উত্তর আর দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মাঝের মহা সাগরের মাঝের দীর্ঘ আর রোমাঞ্চকর সেতু পেরিয়ে, যখন গরীবের বাড়ি (মান্নাত) এ শাহরুখ খানের বাড়িতে আমার মত হাতির ‘পা’ দিয়ে, আন্ধেরিতে ভারত মহাসাগরের তীরে প্রিয় সালমানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের দুয়ারে গিয়ে পৌঁছালাম তখন রাত নেমে গেছে।

কিছুটা সময় জুহু বিচে কাটিয়ে ফেরার পালা শুরু করলাম। ততক্ষণে শরীরের সবটুকু রস কখন শুকিয়ে গেছে সেটা বুঝতেই পারিনি। বাসের ফেরার পালা শুরু হতেই মনে পরলো আমাদের এয়ারপোর্ট এই দক্ষিণ মুম্বাইতেই অবস্থিত। তাই আমাদের আর অযথা উত্তর মুম্বাইতে যাওয়ার কোন দরকার নেই।

বাসে এই কথা জানাতেই, আমাদেরকে খ্যাতিমান লোকজনের হাসপাতাল লীলাবতীর সামনে নামিয়ে দিল। আর বলল, এখান থেকে বান্দ্রা রেলওয়ে স্টেশন খুব কাছে। ৩০-৫০ রুপি ভাড়া দিলেই অটোতে পৌছে যেতে পারবো। কিন্তু ওরা তো আর জানেনা, যে আমরা নন এসি বাসে করে মুম্বাইয়ের মত জীর্ণ (!) শহরে ঘুরে বেড়ালেও আমরা ট্রেনে চেপে নয়, বিলাশবহুল বিমানে চেপে কলকাতায় যাবো। যাক সে কথা, একটা অটো ডেকে উঠে পরলাম। প্রথম লক্ষ্য স্টেশনে গিয়ে, গোসল করা। গোসল না করে আর মুভ করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

তাই অটোওয়ালাকে বললাম, আমাদের স্টেশনের যেখানে পে করে ফ্রেশ হওয়া যাবে বা পাবলিক টয়লেট আছে যেখানে গোসল করা যাবে সেখানে নামিয়ে দিতে। অটোওয়ালা বেশ দ্রুত লালমাটি নামের একটা বনেদি যায়গায় নামিয়ে অটো থামালো, যেখানে একটা পাবলিক ওয়াশরুম আছে।

দ্রুত খোজ নিয়ে জানলাম এখানে গোসলের ব্যবস্থা আছে! জাস্ট ওয়াও, এই মুহূর্তে গোসলের চেয়ে কাঙ্খিত কিছু আর নেই। তাই ওয়াশরুম আছে যেনে আর কিছু না ভেবে বা না দেখেই সবকিছু নিয়ে নেমে পরলাম। অটোকে টাকা দিয়ে খুশি মনে বিদায় করে দিলাম। আর এর পরেই শুরু হল খেলা!

সহযাত্রী ফ্রেশনেসের জন্য, রেডি হতে এক রকম পাগলামি শুরু করে দিল বলা যায়। আমি নিজেকে আর সামলাতে না পেরে একটু বিরক্তি নিয়েই বললাম, এখনি শেভ করার কি আছে? কে দেখবে আপনাকে?

আমার কথা শুনে তিনি শেভে খান্ত দিলেও জামা কাপড়ে পুরো দস্তুর সাহেব হতে যা যা লাগে তার সকল আয়োজন করে ফেললেন! আমি শুধু হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না। আমি শুধু স্পঞ্জের স্যান্ডেল আর ট্রাউজার নিয়ে রেডি হলাম, গোসল করে এই পোষাকেই এয়ারপোর্ট যাবো, সাথে একটা টি-শার্ট ব্যাস।

কিন্তু কিন্তু কিন্তু!

আমি যদি আগে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারতাম বা আমার সহযাত্রী যিনি আগেই গোসল করে ফিরেছেন, তিনিও যদি আমাকে একটু বলতেন ওয়াশরুমের অবস্থার কথা তবে নিশ্চিত ভাবেই আমি শুধু লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরেই এয়ারপোর্টে যেতে প্রস্তুত হতাম! ভালো মন নিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে গেলাম।

দরজা খুললাম, কিন্তু দরজা খুলে রাখার পরে আমি আর কিছুতেই ভিতরে ঢুকতে পার ছিনা! ঘটনা বোঝার জন্য, দরজার ফাঁকা দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দিলাম, কোন যায়গায় দরজা আটকে আছে কিনা দেখার জন্য। কিন্তু না, যা দেখলাম তা দেখার পরে আমি স্তভিত, বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ হয়ে কোন রকমে নিজের চেতনা হারানো থেকে নিজেকে রক্ষা করলাম।

দরজা খোলার পরে আমার আর ঢোকার মত কোন যায়গা নেই! দরজা আর মিনি সাইজের একটা বালতি রাখার পরে কারো দাড়ানোর মত কোন স্পেস নেই! দরজা কিছুটা খুলে, একবার মাথা আর একবারে ঠেলেঠুলে কোন রকমে নিজেকে ঢোকানোর পরে, বালতিতে পানি ভরা হল। কিন্তু সেই পানি মাথায় বা গায়ে ঢালার তেমন কোন উপায় নেই বললেই চলে!

তারপর কিভাবে যে গায়ে পানি ঢেলেছি আর কিভাবে গা মুছেছি নিজেও জানিনা বা বুঝতে পারিনি! আর সেই ওয়াশরুম থেকে কিভাবে যে আমি বেরিয়েছি সে একমাত্র উপরওয়ালাই ভালো বলতে পারবে, আমি জানিনা, সত্যি জানিনা!

ওয়াশরুম থেকে বের হবার পরে আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়েছে, আহা কি একটা ওয়াশরুম ছিল এটা! জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা অরজন করলাম আজ, এই মুম্মাইয়ের মত জীর্ণ শহরের সবচেয়ে দুস্থ, দরিদ্র, অসহায় আর পথের ভিখিরিসম মুকেশ আম্বানির ওয়াশরুম থেকে গোসল করে বের হলাম যেন।

আর নিজেকে এই বলে একান্ত সান্ত্বনা দিলাম, আরে ও কিছু নয় রে পাগলা, এটা হল! মনে মনে ভেবে নিলাম।

আহা মুম্বাই, আহা ওয়াশরুম, আহা দুস্থ মুকেশ আম্বানি আর মুকেশ আম্বানির ওয়াশরুম।

বিস্তারিত গল্প পরে বলা যাবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।