ওয়ার স্টিল অন!

সিনেমায় টাইগার শ্রফের একটা সংলাপ দিয়ে শুরু করা যাক – ‘এই চেহারায় কিছু তো আছে, সকলেই বিশ্বাসের আশা রাখে!’

সংলাপের লেজ ধরে এবার হৃতিককে টেনে আনি। ভক্তরা তাঁর কাছে বেশি বেশি চায়। মাত্রই আগের অ্যাসাইনমেন্ট সুপার থার্টিতে যতখানি সাদাসিধে লুকে হাজির হয়েছিলেন, ভক্তদের আশার পালে জোর হাওয়া দিয়ে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন লুকে আগমন! সুপার থার্টির আনন্দ কুমার আর ওয়ারের মেজর কবির যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ! টাইগার থেকে আচানক হৃতিকে ট্রান্সফার হবার কাহিনী একটু পরেই আপনারা বুঝতে পারবেন। কেননা, যে ‘ওয়ার’ সিনেমা নিয়ে এই লেখা সেই সিনেমার লাইমলাইট পুরো  ছবি জুড়ে ‘সোয়াপ’ করেছেন দুজন। একবার হৃতিক, তো আরেকবার টাইগার।

‘দ্য স্টোরি অব দ্য কেলি গ্যাং’ – ১৯০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অস্ট্রেলিয়ান ছবি। নাম শুনেছেন? কিংবা ‘রাজা হরিশচন্দ্র’? প্রথমটি সিনেমার ইতিহাসে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি। পরেরটি উপমহাদেশের। এরপর গত হয়েছে শতাব্দী! সবরকম গল্পের সিনেমাই আমরা দেখেছি। অপ্রাসঙ্গিক ঠেকছে কথা? ভারতীয়দের কথা জানি না, ছাত্র-শিক্ষকের লড়াই দেখে আমাদের অনেকে কানাঘুষা করেছে এটি নাকি মিঠুন আর জিতের ‘যুদ্ধ’ ছবির মত! নামেও তো মিল! তাই উপরের দুটো ছবি টেনে আনা। সিনেমার প্লটে এরকম ছোটখাটো মিল খুঁজতে গেলে বহু সিনেমার সাথেই ঢের মিল পাবেন। সেসব কানে না নিয়ে একবার ওয়ার স্টার্ট করে দিন। ব্যস, তারপর আড়াইঘন্টা আপনাকে কেউ পাবে না।

‘যখন কোন প্রতিযোগিতা শেষ হবে, ফলাফলের চিন্তা না করে নিজেকে প্রশ্ন করবে – আমি আমার সেরাটা দিতে পেরেছি কি না! যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে তুমি জিতে গেছ…’

সিনেমার মাঝামাঝি চমৎকার সংলাপটির মতোন গোটা সিনেমায় মেজর কবির (হৃতিক) আর ক্যাপ্টেন খালিদ (টাইগার) উত্তর খুঁজেছেন। সেই খোঁজের রোমাঞ্চকর জগতে একের পর এক বাঁধা এসেছে। বাঁধা কাটিয়েছেন। ফের বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন। থ্রিলার সিনেমার এই এক গুণ। দোষও বলা যায়। দর্শক যখন ভাববে এমনকি সিনেমার অভ্যন্তরে চরিত্র নিজেও যখন ভাববে সব ঠিকঠাক, তখনি নতুন ধাঁধা এসে মাথা ঘুরিয়ে দেবে।

ওয়ার ঠিক এই জায়গায় জিতে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, ওয়ারের অনবদ্য অ্যাকশনে বলিউড প্রবেশ করে গেল হলিউডের মিশন ইম্পসিবল যুগে! একদম মিথ্যেও নয়। ধুম সিরিজের প্রতি মুভিতেই আমরা বাইকবাজি দেখেছি, রেস সিরিজে দেখেছি গাড়ির খেল। ওয়ারে দুটোই পাবেন! বিএমডব্লিউ বাইক নিয়ে টাইগার ধাওয়া করছে হৃতিককে, আবার বরফঘেরা রাস্তায় গাড়ির গতি ৩০০ উঠিয়ে হৃতিক পিছু নিল টাইগারের! জমে যেতে বাধ্য দর্শক।

গল্প নিয়ে কিছু বলা হয়নি। বলা হয়নি অভিনয়, বিজিএম, পরিচালনা, ব্লা ব্লা নিয়েও! এতটুক পড়ে থাকলে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কেমন হতে পারে এসব! পরিচালক সিদ্ধার্থ আনন্দ এর আগে হৃতিকের সাথে মিলে ‘ব্যাং ব্যাং’ উপহার দিয়েছেন। এই জুটির অ্যাকশন ধামাকার কম্বো প্যাকে এবার হাজির টাইগার শ্রফ। স্ক্রিপ্ট পড়ে হৃতিক সাজেস্ট করেন শ্রফের নাম!

প্রতিদান দিয়েছেন সিনেমার পরতে পরতে। টাইগারের নাচের আগে থেকেই ভক্ত আছে, বাঘী সিরিজে অ্যাকশনটাও দেখিয়েছেন। ওয়ারে এসবের সঙ্গে যুক্ত করেছেন অভিনয়! বাবা জ্যাকি শ্রফের সুপুত্র হয়ে উঠতে শুরু করেছেন এই সিনেমাতেই। কখনো কখনো এমনকি গুরু মেজর কবিরের চেয়েও শিষ্য খালিদকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে টাইগারের ম্যাচিউর অভিনয় অবাক করবে। একটা জায়গায় বিরক্তি ছড়িয়েছে সে। মারামারির দৃশ্যে সেই জামাকাপড় খুলে ফেলা। এক্সপ্রেশনে ঘাটতি থাকলেও চেষ্টা ছিল কাটিয়ে ওঠার। সবমিলিয়ে দশে সাত ইজিলি দেয়া যাবে টাইগারকে। আসি সিনেমার প্রাণ কবির সাহেবে। এককথায়- চমৎকার। তার কথা বলার ভঙ্গি, স্টাইলিশ লুক, অ্যাটিচিউড মুগ্ধ করবে বারংবার।

একটা সিনেমাকে গুজবাম্প দিতে প্রয়োজন লিড হিরোর এন্ট্রি। একশোতে একশো দশ পাবে হৃতিকের আগমন। স্রেফ চোখের এক্সপ্রেশন দিয়ে দর্শকের ঠোঁট থেকে শিষ বাজিয়ে ছেড়েছেন। পরিচালক সিদ্ধার্থও শুরুতেই দর্শককে জানিয়ে দিল, ওয়ার ইজ অন! দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিছুক্ষণ পরপরই শিহরণ জাগাবে। অ্যাকশন সিনগুলোতে মেকি কোনো ভাব নেই। থাকবে কী করে? চারজন অ্যাকশন ডিরেক্টরের একজন পল জেনিংস ছিলেন ডার্ক নাইটের অ্যাকশন ডিরেক্টর, আরেকজন সি ইয়ং, কাজ করেছেন অ্যাভেঞ্জার্সে।

মাল্টা, ইরাক, মরক্কো, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় সাতটি দেশে শ্যুটিং হয়েছে ওয়ারের। একটা দৃশ্যে ৩০০ ফুটের ব্রীজ থেকে লাফ দিবেন হৃত্তিক, কোন স্টান্ট নেননি। আর বরফের মধ্যে কার চেজিঙ তো সিনেমার সেরা দৃশ্য! গান মাত্র দুইটি। বিশাল-শেখর জুটি অল্পতেই দারুণ কিছু উপহার দেন। ‘জয় জয় শিব শংকর’ গানটি বহুদিন যেকোন উৎসবে বাজবে তা চেখ বুজে বলা যায়! সঞ্চিত আর অঙ্কিত বালহারার বিএজএম পরিপূর্ণতা পাইয়েছে মুভিকে।

হিরোইন খুঁজছেন? দুই হিরো অথচ হিরোইন নেই! নেই, আসলেই নেই। পরিচালক আরো একবার বাহবা পাবেন। এইধরণের গল্পে নায়িকা ঢোকানো মানে সময় নষ্ট এবং মূল ফ্লো থেকে সরে আসা। তারপরেও কিছুক্ষণের জন্য ছিল একজন। ন্যায়না চরিত্রে বানি কাপুর খুব অল্পসময় থাকলেও দর্শকের বিরক্তি হয়ে নন, বরঞ্চ গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে যান তিনি। গ্ল্যামারে যেমন উৎরেছেন, তেমনি টুইস্টমেকার হিসেবেও অবদান রেখেছেন।

লেখা প্রায় শেষ, অথচ গল্প নিয়ে নো হিন্টস! গল্পটা মূলত একটা জার্নির। সিক্রেট অ্যাজেন্সি ‘র’-র ক্যাম্পে ট্রেনিং করাতে আসা মেজর কবির নিতে চায় না ক্যাপ্টেন খালিদকে। কারণ, তার বাবা ছিল দেশদ্রোহী গাদ্দার, মারতে চেয়েছিল কবিরকে। কিন্তু খালিদ চায়, সে তার বাবার মতো নয় তা প্রমাণের সুযোগ। কর্নেল লুথরার (আশুতোষ রানা) অনুরোধে দলে নেয় খালিদকে।

কর্নেল লুথরাও অভিবাদন জানায় খালিদকে – ওয়েলকাম টু হেল! ছয়জন মিলিটারি জওয়ানকে নিয়ে কবির মিশনে নামে। রিজওয়ান ইলিয়াসি নামক টপ টেররকে ধরার মিশন। প্রায় ধরতে ধরতেও হাত ফসকে বেরোয় ইলিয়াসি। তারপর হঠাৎ করেই দল ছেড়ে নিজের মতো একা একা যুদ্ধে নামে কবির! হাতি, ঘোড়া, মন্ত্রী, সৈন্য; দাবার চার অমূল্য ঘুঁটির নিয়ে খেলতে থাকে ইলিয়াসি।

যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারে- ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান! একদিকে কবিরের ইলিয়াসিকে ধরার মিশন, অন্যদিকে দেশের সঙ্গে গাদ্দারি করা কবিরকে ধরতে খালিদের দৌঁড়ঝাপ! কেন হঠাৎ করে পথ বদলে ফেলল কবির? কারাই বা ইলিয়াসির এই চার ঘুঁটি? খালিদ কি পারে নিজেকে প্রমাণ করতে? যুদ্ধ শুরু, শুরু রোমাঞ্চ!

ব্যাং ব্যাং এর পর পাঁচবছর বিরতি দিয়ে পুরোদস্তুর অ্যাকশন সিনেমায় কাজ করলেন হৃতিক। সেটিই কিনা ভেঙে দিল রেকর্ড! প্রথম দিনে আয়ের দিক দিয়ে পেছনে ফেলেছেন থাগস অব হিন্দুস্তানকে। আমিরের ৫২ কোটি ছাপিয়ে আয় করে ৫৩ কোটি। এমনকি ভেঙেছে দ্বিতীয় দিনের অগ্রীম টিকিট বিক্রির রেকর্ডও।

 

তাই একই প্রোডাকশন হাউজ (যশ রাজ ফিল্মস) এর আগের ছবি থাগস ফ্লপ করলেও ২০০ কোটি রূপি বাজেটের ওয়ার লাভ তুলে নিয়েছে ইতোমধ্যেই। ওয়ারের চেয়েও দুর্বল স্ক্রিপ্টের ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ বাজার কাঁপিয়েছে সালমানের স্টারডমে। হৃতিক বা টাইগারের অতবড় ফ্যানবেজ না থাকলেও সিনেমার একদম শেষে মেজর কবির জানিয়ে গেছেন – ওয়ার স্টিল অন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।