আরো বিরাট হতে থাকুন কোহলি

স্পোর্টসে কোন কিছুই অবিনশ্বর নয়, এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। প্রায় অবিনশ্বর হতে পারে, অবিনশ্বর নয়। স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যানের রেকর্ডটা ভাঙা প্রায় অসম্ভব, ক্রিকেটের একমাত্র অতি অসম্ভব রেকর্ড হতে পারে এটাই।

কিন্তু, সব স্পোর্টসেই চিন্তা করে দেখুন, পেলে ম্যারাডোনাকে মেসি রোনালদো টপকে গেছেন (আমার মতে), কিলিয়ান এমবাপ্পে যে বছর দশেক পর তাদের রেখে যাওয়া রেকর্ডের পাহাড় জয় করে ফেলবেন না তার কী নিশ্চয়তা?

কিংবা উসাইন বোল্টের ৯.৫৮ সেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ে যে কেউ ১০০ মিটার দৌড়ে ফেলবে না, এই কথা জোর দিয়ে বলতে পারেন? কিংবা কেউ যে মাইকেল ফেলপস এর ২৩ স্বর্ণপদকের রেকর্ডটা টপকে যাবেন না, তা নিয়েই আপনি নিশ্চিত হন কীভাবে?

শচীন টেন্ডুলকারের ১০০টা সেঞ্চুরির রেকর্ডটাও এরকমই, অবিশ্বাস্য, কিন্তু অসম্ভব নয়। ভিরাট কোহলি যে ওয়ানডে রেকর্ডটাকে চোখ রাঙাচ্ছেন, তা নতুন খবর নয়। নতুন খবর – কত দ্রুত বিরাট প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে পঞ্চাশতম শতকটা হাকাবেন।

যাই হোক, উপরের কথাগুলো এজন্য বলা, কোন স্পোর্টসেই সর্বকালের সেরা নির্বাচনটা দুরূহ। ক্রিকেটে স্যার ব্র‍্যাডম্যান কাজটা সহজ করে গেছেন, বাকি সব জায়গায় ঘোট পেকেই আছে।

সমাধানটা অবশ্য হার্ডি সাহেব করে গেছেন, জ্বি গণিতবিদ জি এইচ হার্ডির কথাই বলছি। স্যার ডনের ওই অতিমানবীয় পারফরমেন্সের পর হার্ডি ‘ব্র‍্যাডম্যান ক্লাস’ নামে একটা টার্ম বানিয়ে ফেললেন, নিজের ক্ষেত্রে অতি অসাধারণ কিছু করা কাউকে রাখা হয় ওই ফিল্ডের ব্র‍্যাডম্যান ক্লাসে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নিউটন, আইনস্টাইন, পেলে, ম্যারাডোনা, শচীন, লারা – তাঁরা সবাই ব্র‍্যাডম্যান ক্লাসের অন্তর্ভূক্ত। সোজা কথায়, একজন সেরা নির্বাচন না করে একটা লেভেলে সবাইকে রাখুন, ব্যাস!

এত কথা কেন?

কথাগুলো ভারতীয় অধিনায়কের জন্য, যিনি ধারাবাহিকতাকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছেন। আপনি কোহলিকে বেয়াদব বলতেই পারেন, তার এগ্রেশন আপনার ভালো না লাগতেই পারে, কিন্তু স্রেফ ব্যাটসম্যান কোহলিও যদি আপনার মনে দাগ না কাটতে পারে, ব্যর্থতাটা খুব সম্ভবত আপনার।

টিভি শো তে তার আগ্রাসনের সমালোচনা করার পর তা কমিয়ে ফেলেন, নিজের পছন্দের সব খাবার ত্যাগ করেন, ম্যাচ থাকুক আর না থাকুক ঘুমিয়ে পড়েন রাত ১০টার আগেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকেনই না বলতে গেলে, ম্যাচের পর ম্যাচ রান করে গেলেও প্র‍্যাকটিসের অন্ত নেই, মাঠের বাইরে প্রতিপক্ষের প্রশংসায় পঞ্চমুখ – বিরাট কোহলি পারফেক্ট নন, কিন্তু তিনি অনন্য। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও ১৭ বছর বয়সে দুই শতাধিক বল খেলে দলকে ফলো অন থেকে বাচান, স্ত্রীকে সমালোচনা থেকে বাচিয়ে রাখেন সবসময়।

আপনাকে মেনে নিতে হবে, বিরাট কোহলি শচীন টেন্ডুলকার নন, তিনি বিরাট কোহলি। সব ক্রিকেটারকে যদি আপনি শচীনের স্ট্যান্ডার্ড মেনে মাপতে যান, আপনি শুরুতেই ইকুয়েশনে গড়বড় করে ফেলছেন, আপনার অংক কখনই মিলবে না।

যাই হোক, অধিকাংশ মানুষ ব্র‍্যাডম্যান ক্লাসে পৌছেছেন কি না, সেই হিসেবটা ক্যারিয়ারের শেষ দিন পর্যন্ত তুলে রাখা হয়। অবসর নিয়ে নেন, এরপর আমরা কুষ্ঠি খুলে বসি, হিসেব মিললে তাকে রাখি উপরের তাকে, নাহয় কোন এক কোণায় অযত্নে পড়ে থাকেন। মাঝে মাঝে ধূলো পরিষ্কার করা হয়, আবার নিভৃতে চলে যান।

কোহলি ক্যারিয়ারের মাঝপথেই উপরের কাতারে আসন পেতে নিয়েছেন, এখানেই বিরাট কোহলির গ্রেটনেস। ফ্ল্যাট ট্র্যাক, ছোট মাঠ বা কোয়ালিটি বোলারদের অভাব – এই অজুহাতগুলো স্রেফ অজুহাতই, কনসিসটেন্সির সামনে এগুলো কিছুই না!

আরও বিরাট হতে থাকুন কোহলি, এই কামনাই করছি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।