সাম্প্রতিক ‘বানান ভাইরাল’ ও ভুল/শুদ্ধ

কিছু কিছু বানান নিয়ে ‘বাংলা একাডেমি বনাম প্রথাগত’ দ্বান্দ্বিক আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ২০/২৫ আগের পরিবর্তিত এসব বানান হঠাৎ এখন প্রয়োগের ধুম লেগেছে। আমি বাংলা একাডেমির এমন দু’চারটা বানান নিয়ে খুব একটা ভাবি না। প্রচলিতটা ব্যবহার করি। তবে সমস্যা আমরা নই- বাংলা একাডেমি নিজেই তৈরি করছে।

বাংলা একডেমির দুইটা বাংলা অভিধান-

  • ব্যবহারিক বাংলা অভিধান
  • আধুনিক বাংলা অভিধান

কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই বানান এই দুই অভিধানে দুই রকম। যেমন – ‘ঈদ’

ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘ইদ’ ভুক্তিকে তীর চিহ্ন দিয়ে ‘ঈদ’ এর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। ‘ঈদ’ ভুক্তিতেই ‘ঈদ’ শব্দের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিয়েছে। এর মানেই হলো শুদ্ধ ও ব্যবহার্য শব্দ হলো ‘ঈদ’।

আবার ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ দেখি। সেখানে ‘ইদ’ প্রথম ভুক্তি, ‘ঈদ’ দ্বিতীয় ভুক্তি। আর শব্দের ব্যাখ্যায় ‘ইদ’কেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

আরো শুনবেন?

‘করি নি, পড়ি নি, যাই নি’- ইত্যাদি এসব ক্ষেত্রে ‘নি’ আলাদা হয়েছে ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’- এ বর্ণিত প্রমিত বানানরীতি অনুসারে। ‘নাই’ সাধুরূপ। এর চলিত রূপ ‘নি’। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে ‘নাই, নেই, না, নি এই নঞর্থক অব্যয় পদগুলি শব্দের শেষে যুক্ত না হয়ে পৃথক বসবে।’ তাই ‘নি’ শব্দটাও আলাদা বসবে। ২০১০ সাল পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এ রীতিতেই পাঠ্যবই প্রণয়ন করেছে। ভাষাবজ্ঞানী ড. হুমায়ুন আজাদ তার সমস্ত লেখায় এ রীতি মেনেছেন।

কিন্তু ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’-এ বলা হয়েছে, ‘না-বাচক না এবং নি-এর প্রথমটি (না) স্বতন্ত্র পদ হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি (নি) সমাসবদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। যেমন; করি না, কিন্তু করিনি।’

এই যে ব্যাখ্যা হিসেবে বলছে ‘নি’ না-বাচক শব্দ; তবে সমাসবদ্ধ হিসেবে শব্দের সাথে বসবে। উদাহরণও দিয়েছে। ‘না-বাচক’ শব্দটা সমাসবদ্ধ হলো কীভাবে? একবারও কি ভেবেছেন কেউ? ‘করিনি’, ‘যাইনি’-এসব কি সমাসবদ্ধ শব্দ? অব্যয় পদ সমাসবদ্ধ শব্দ হয়ে গেল? একবার ভাবুন তো? যদি সমাসবদ্ধ শব্দই হয়, ‘করিনি’-এর ব্যাসবাক্য কী? জানাতে পারবেন কেউ? অন্তত আমি ‘করিনি, পড়িনি, যাইনি’ – ইত্যাদি এসব শব্দের কোনো ব্যাসবাক্য পাই নি। আমি তো তাহলে ‘সমাসবদ্ধ শব্দ’ হিসেবে মানতে পারি না।

দু’টোই বাংলা একাডেমির বানানরীতিগত ব্যাখ্যা। কে কোনটা মানবে তাহলে? অতএব এখানে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো না? আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয় ‘নি’ আলাদা বসাটা। তাই আমি আমার লেখায় ‘নি’ আলাদা লিখি। কেউ একসাথে লিখলে আমি তর্কে যাই না। ‘আমার লেখাটা ভুল’- এমনটা বললেও তর্কে যাই না।

এবার বুঝুন বাংলা একাডেমির দ্বৈত নীতি। আমাদেরকেই বিভ্রান্ত করছে ওরা।

এ তো গেল বাংলা একাডেমি সংক্রান্ত সমস্যা। এবার আমাদের ব্যাপারে আসি।

আমরাও কখনো কখনো অবচেতনভাবে বিতর্ক তৈরি করি। এই যেমন ‘অপপ্রয়োগ’কে ‘ভুল’ অর্থবোধ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করছি। ‘অপপ্রয়োগ’ আর ‘ভুল’ একই অর্থ প্রকাশ করে না। ‘অপপ্রয়োগ’ অর্থ শব্দটি ভুল নয়; কিন্তু ব্যবহার সঠিক নয়। ‘অপপ্রয়োগ’-এর আভিধানিক অর্থ ‘অনুচিত ব্যবহার’। সে হিসেবে ‘গোরু’ ও ‘গরু’ দু’টো শব্দই সঠিক; কিন্তু গরু ব্যবহার অনুচিত। তাই ‘গরু’ শব্দের পর ‘অপ্র’ সংকেত ব্যবহার করা হয়েছে।

যদি ‘গরু’ শব্দটি ভুল হতো তবে অভিধানে ‘ভুক্তি’ হিসেবে সংযুক্ত হতো না। কিংবা ভুল বা অশুদ্ধ কিন্তু প্রচলিত- এমন কিছু হলেও; সংকেত হিসেবে লিখা থাকতো ‘অশু>অশুদ্ধ’ বা ‘অশুপ্র>অশুদ্ধ কিন্তু প্রচলিত’ এসব কিছু। এর কোনাটাই ‘গরু’ শব্দের বেলায় নেই। তাহলে সহজেই ধরে নেওয়া যায় ‘গরু’ শব্দটি ভুল নয়, অশুদ্ধ নয়। একটি উদারণ দিয়ে আরও স্পষ্ট করছি- ‘ভূল’ এটা অশুদ্ধ বানান। অথচ আমাদের সমাজে অনেকেই দীর্ঘ-কার (ূ) দিয়ে ‘ভূল’ লিখে থাকেন অহরহ।

অভিধানে কি ভুক্তি হিসেবে ‘ভূল’ যুক্ত হয়ে ব্র্যাকেটে ‘অপ্র, অশু, অশুপ্র’ সংকেত দিয়েছে? না, ‘ভূল’ শব্দটাই অভিধানে নেই। অভিধানে শুধুমাত্র কোনো ভুল কোনো শব্দ থাকতে পারে না। কিন্তু ‘গরু’ আছে। এটা শুদ্ধ শব্দ বলেই আছে, ভুল হলে থাকতো না। তবে ‘গরু’ ব্যবহার বা প্রয়োগ অনুচিত- বড়জোড় এটুকু বলা যেতে পারে। আজ যারা ‘গরু’ শব্দ ভুল বলছেন- তারা নিজেরাই ভুল।

বিতর্ক অবসানে নিজের বোধ দিয়ে একটি ভাষায় শব্দের ভাষাগত, ব্যবহারগত, উৎপত্তিগত, গঠনগত- ইত্যাদি বিষয়াদি পূর্বাপর জানা আবশ্যক।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।