ভিঞ্চি দা: খুনের গল্প, প্রতিশোধের গল্প, মনোগ্রাহী গল্প

সকাল সকাল ভিঞ্চিদা দেখলাম। ভালো মন্দ মিশিয়ে আমার মোটের উপর মন্দ লাগেনি। বরং ভালোই লেগেছে। স্বাদ বিস্বাদ দুইই আছে। স্বাদ চেখে আর বিস্বাদ চেটে একটু কাটাছেঁড়া করা যাক চলুন। আমার মতো করে।

গল্পটা মোটামুটি অনেকেই জানেন। রুদ্রনীল একজন প্রস্থেটিক্স মেকআপ আর্টিস্ট, অর্থাৎ সুন্দরী কে কুৎসিত, ছোঁড়া কে বুড়ো, ছেলে কে মেয়ে করে ফেলতে পারে। তারই নাম ভিঞ্চিদা। ঋত্বিক একজন সিরিয়াল কিলার গোছের লোক। আর সোহিনী হচ্ছে রুদ্রর প্রেমিকা। একটু তোতলানোর হ্যাবিট আছে সোহিনীর। এই তিনজনই হচ্ছে প্রধান চরিত্র গল্পে।

  • প্লট

ভিঞ্চিদা টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির কাছে বিশেষ পাত্তা পায়না। তার শিল্প কলা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। তাই ভিঞ্চিদার কাছে বিশেষ কাজও থাকেনা। এমতাবস্থায় একদিন ভিঞ্চিদার কাছে ঋত্বিক আসে একটা সিনেমা বানানোর জন্য কিছু মেকআপ লাগবে, তারই অর্ডার নিয়ে, আর তা ভিঞ্চিদা লুফে নেয়। তারপরই শুরু হয় শহরে পরপর খুন। কিভাবে সেইসব খুনে ঋত্বিক জড়িত বা ভিঞ্চিদা জড়িয়ে পড়ে, সেইসব নিয়ে এই সিনেমা।

  • গল্প, চিত্রনাট্য ও চরিত্রায়ন

গল্পটা বেশ ভালো। এটাই এই ছবির সবচেয়ে বড় স্ট্রং পয়েন্ট বলা চলে। লিনিয়ার ন্যারেটিভ স্টাইলে একটা থ্রিলার গল্প বলা চললেও তার মধ্যে যে কিছু টুইস্ট আছে, তা চিত্রনাট্যের ক্ষমতার জন্যেই। চিত্রনাট্য সামগ্রিকভাবে ভালো। কিছু খামতি ব্যক্তিগত ভাবে চোখে পড়েছে। সবার প্রথমে রুদ্রর চরিত্র। যে ভাবে সে সুত্রধর হিসাবে গল্পের প্রথমে নিজেকে ও বাকি সবার আলাপ করায় দর্শকের সাথে, সেখানে তার ভয়েস ওভার এ যে ‘টোন’ ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন দৃপ্ত ব্যবহারিক জীবনে, তেমনই লাজুক প্রেমিক হিসাবে, তা এক ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়।

অথচ ঋত্বিকের যুক্তির সামনে তার যে আত্ম সমর্পন করা, এই যে ভোলেটাইলিটি, সেটা আবার প্রথম অবস্থান থেকে সরিয়ে আনে রুদ্রকে। আমার মনে হয়েছে, এই পরিবর্তন পরিচালক সচেতন ভাবে রাখতে চেয়েছেন চরিত্রের একটা ডিলেমা বোঝাতে, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে তা হয়তো অনেকের চোখে বা মনে লাগবে। সেক্ষেত্রে একই ধরণের মেজাজ যদি চরিত্রে রাখা যেত (বোকা বোকা টাইপ গোবেচারা একটা চরিত্র), তাহলে হয়তো আরও পরিস্ফুট হত বিষয়টা। দ্বিতীয়ত, রুদ্রনীল এর নাম ভিঞ্চিদা কিভাবে হলো তা দেখাতে গিয়ে ক্যান্টিনে যে তর্ক বিতর্ক তা অপ্রয়োজনীয় লেগেছে, গল্পের বাকি কন্টেক্সট এর তুলনায়। এবং সেখানে রুদ্রের অগাধ জ্ঞান ও বাকিদের অজ্ঞান কিছুটা বাড়াবাড়ি লেগেছে যুক্তির নিরিখে।

সোহিনীর তোতলানোর ব্যাপারটা চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়েছে। তোতলারা জেনারেলি তোতলায় না। বরং তোতলামি ঢাকতে একটা বিশেষ ভাবে কথা বলে। একটু টেনে টেনে। সেটা এখানে বিরাজমান নয়। সোহিনীর চরিত্রায়ন এর আরেকটি তাৎপর্যপূর্ন খারাপ দিক যেটা লাগলো সেটা হচ্ছে তার সিম্পলিসিটি এর চিত্রায়ন। রুদ্র যখন তার কাছে এসে নিজের অসহায়তা বলে এবং সোহিনী যখন রুদ্রের কথা গুলো বুঝতে পারেনা, তখন সে যে রুদ্রকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে, খুলে বলতে, সেখানে সোহিনীর সিম্পলিসিটি কম এর ঘুমজড়ানো গলা বেশি ফুটে উঠেছে!

আধো আধো ভাবে কথা বললে মাঝে মাঝে গোবেচারা লাগে বটে, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত হলে কানে আর চোখে দুটোতেই লাগে। সৃজিত এর একটা হিচকক টাইপ স্টাইল করার প্রবণতা আছে। নিজের সবকটা ছবিতেই প্রায় কোনো না কোনো একটা ছোট ক্যামিও রোল উনি করবেনই। কিন্তু যেহেতু উনি অভিনয় পারেননা, অন্তত আমার তাই মনে হয়, তাই এই ক্যামিও করার বিষয়টা ছবির চলনকে আঘাত করে। প্রিন্সিপাল এর ওই ৫ মিনিটের চরিত্র আরো একটু ভালো ভাবে করানো যেত হয়তো, আমার বিশ্বাস।

বাচ্চা যে ছেলেটা ধুপ বিক্রি করতে আসে, তার উচ্চারণ এত স্পষ্ট আর অভিনয়ে এত জড়তা যে ওই দুই তিন মিনিট মনে হচ্ছিল স্বপন সাহা বা হরনাথের কোনো ছবি দেখছি। এমনকি বাচ্চাটার মায়েরও ওই একটা ডায়ালগ ‘পয়সা লাগবেনা, ধুপ চাইলে নিয়ে যান’ কতটা ইমপ্যাক্ট ফুল, কত ভালো ভাবে করানো যেতে পারতো। কিন্তু মায়ের ওই এক্সপ্রেশনলেস মুখ পুরো জল ঢেলে দিল।

এসব বাদ দিলে বাকি পুরো ছবিতে রুদ্রনীল বেশ বেশ ভালো। বাকি সবাই ও ঠিক ঠাক। অনির্বান জাঁদরেল পুলিশ অফিসার। টাইটেল পোদ্দার। ওই নামেই পরিচিত। যতটুকু করেছে বেশ ভালো। যদিও তালি কুড়োনোর জন্য অনেক গালাগালি ব্যবহার হয়েছে বলে আমার মনে হলো। মানে সৎ, বলিষ্ঠ, নির্ভীক এবং রাগের মাথায় গালাগাল দেওয়ার মতো কঠিন এক পুলিশ অফিসার হাই প্রোফাইল কেস তদন্ত করতে গিয়ে হুট করে প্রায় বাপের বয়সী একজন লোককে তুই তোকারী করে বাপ মা তুলে খিস্তি মারবে, ওটা ফিল্মের খাতিরে সস্তা চটক ছিল যা বাদ দিলেও ছবিটা খারাপ হতোনা।

ঋদ্ধি সেনের ওই একটা ছোট রোল। অনেকেই বলেছেন ইমপ্যাক্টফুল। আমার লাগেনি একমাত্র ‘মা কে ছাড়’ ওই ডায়ালগ টা ছাড়া। নাটকীয় মনে হলো। তাই চিপস খেতে খেতে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্রাইমের বই পড়াটা একটু বাড়াবাড়ি লাগলো। আরও একটা চরিত্র বলি। একজন মা যে তার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার স্বামীর অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে চলেছে, সে হঠাৎ একটা দুর্ঘটনায় ছেলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে (পরিচালকের যুক্তি অনুযায়ী – ‘মা ভয় পেয়ে গিয়েছিল’), কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

গল্পের নায়ক আমার কাছে ঋত্বিক। এবং দুরন্ত তার অভিনয়। ওই অভিনয় অভিনয় নয়। ‘ফাটিয়ে দিয়েছো গুরু’ যাকে বলে সেইটা। কোনো খামতি চোখে পড়েনি। শুধু একটা জায়গা। নিউজ রিপোর্টার যখন আইনের ৫ টা ধারা একটা একটা করে টিভিতে বলছে, ঋত্বিক ও একই ভাবে ওই ৫ টাই কিভাবে বলে গেল, সেটা বোধহয় পরিচালকের ওই ‘পোয়েটিক লিবার্টি’ টাইপের কিছু। কিন্তু চোখে লাগলো।

  • গান

দুই ঘণ্টার এই ছবিতে তিনটে গান আছে ফলে ছবিটা গান বাদ দিলে দৈর্ঘ অনুযায়ী যথার্থ। পাভেলের ‘তোমার মনের ভিতর’ আর অনুপমের ‘শান্ত হও’ আমার বেশ ভালই লেগেছে, বিশেষ করে গল্পের শেষে ‘শান্ত হও’-এর চিত্রায়ন। যদিও ক্লাইম্যাক্স এর শেষে গান ‘বাইশে শ্রাবণ’ বা ‘চতুষ্কোণ’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। পরিচালকের এই একই গতে বাঁধা ছক থেকে বেরোনো উচিত মনে হয়।

‘তোমার মনের ভিতর’ গানটি আমার খুব পছন্দ হলেও তার চিত্রায়ন বেমানান মনে হয়েছে। কারণ ঋত্বিকের একটা হোমওয়র্কের ব্যাকগ্রাউন্ডে এই গান মনে হয়েছে অপ্রাসঙ্গিক। পরিচালক ওই হোমওয়ার্ক অন্যভাবে দেখাতে না পেরে গানের আশ্রয় নিয়ে কাট শটে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিনা জানিনা, তবে ‘গ্যাস বেলুন’-এর চিত্রায়ন সেই তুলনায় ভালো। মির্চির চার্টবাস্টারে তিনটে গানই ভালো চলছে আপাতত।

  • অন্যান্য

টানটান এডিট। কোথাও খারাপ লাগেনি। বিশেষ করে বিরতির আগে নীল আলোয় গেঞ্জি পড়া রুদ্র আর তার ঘাড়ে থুতনি রেখে ঋত্বিক। ওই ছবিটা অনন্য। রুদ্রের চোখ থেকে তখন পড়া জলের ফোঁটা ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভালো একটা শট। গল্পের শেষটা ঠিক পরিস্কার হয়নি আমার কাছে। কেউ ইনবক্স এ বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়। নাহলে সেটা নিয়েও বিস্তর কাটাছেঁড়া করার স্কোপ ছিল। কিন্তু করলে স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই বিরত রইলাম। সেট ডিজাইন, আর্ট, মেকআপ সব গুলোই ভালো লেগেছে। ঝকঝকে লেগেছে। মনোগ্রাহী লেগেছে।

তাই সব শেষে বলবো ছবিটা দেখতে পারেন। এটা সৃজিত এর ৩ নম্বর থ্রিলার। বাইশে শ্রাবণ আর চতুষ্কোণ-এর পর। আমার পছন্দ অনুযায়ী চতুষ্কোণ আজও এক, বাইশে শ্রাবণ দুই আর ভিঞ্চিদা তিনে। তবু দেখতে পারেন। অনেক খামতি আমার লাগলেও এগুলো হচ্ছে খুঁটিয়ে দেখা জনিত খামতি। এবং সেটাও নিজের মতো করে। অনেকেই এত খুঁটিয়ে নাই ভাবতে পারেন, বা তাদের মত করে ভাবতে পারেন।

ছবিটার সামগ্রিক ফিডব্যাক ভালই। গেল সকালেও মোটামুটি অনেক হল ফুল না হলেও ভালোই ভর্তি আছে। গান গল্প অভিনয় চমক নিয়ে মসলা ছবি। অত্যন্ত ভারী ভারী অনেক রিভিউ দেখছিলাম সিনেমাটা দেখার আগে। আমার অভ্যাস সিনেমা দেখার আগে অনেক রিভিউ পড়া।

বড় বড় কাগজ গুলো কত কিছু লিখেছে। ন্যায়, অন্যায়, সৎ, অসৎ, আইন, আইনের ফাঁক, বোধ, বিচার বুদ্ধি এতসব কিছু আমার লাগেনি। বরং খুব সাধারণ একটা গল্প অন্য রকম ভাবে দেখানো হয়েছে। যা নিঃসন্দেহে পরিচালকের মুন্সিয়ানার পরিচয়। তাই ভিঞ্চিদা দেখুন। হয়ত ভালো লাগবে। খুনের গল্প। প্রতিশোধের গল্প। মনোগ্রাহী গল্প। ছবিটাকে দশে আমি সাত দেবো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।