বিজয় রাজ: মুগ্ধতা ছড়িয়েও তিনি রয়ে যান আড়ালেই

২০১৯। কঠিন জীবনের সরলতাকে বড়পর্দায় আনতে, গলির এক জীবনকে বেছে নিলেন পরিচালক জোয়া আখতার। নির্মাণ হলো ‘গাল্লি বয়’। সিনেমা হল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সমালোচকদের থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক। সকলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ চলচ্চিত্রের গল্প, নির্মাণ আর ‘জীবন্ত চরিত্রগুলো’। পাশাপাশি চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তোলা সেই মানুষগুলোও হলো প্রশংসার ভাগীদার।

মুরাদ, সাফিনা, এমসি শের’রা যেখানে আলোর মাঝে সকলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইলো, সেখানে কোথাও যেন আধারেই চুপ করে বসে রইলেন মুরাদের বাবা। অথচ জীবনের গতিপথে চলার পথ দেখানো সেই বাবা, চড় দিয়ে নিজের সাথে লড়াই করতে শিখিয়েছিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বিজয়ী মুরাদকে দেখে আনন্দে চোখের জল ফেলেছিলেন আফতাব শেখ। আর স্বল্প সময়ের তাঁর সেই অভিনয়ের জাদু দেখে দর্শকরা হয়েছিলো মুগ্ধ!

তবুও যেন আধারেই রয়ে গেলেন আফতাব শেখ, আড়ালে রয়ে গেলো বহু আন্ডাররেটেড অভিনেতাদের একজন । চেহারাটা খুব পরিচিত হলেও সকলের কাছে, নামটা সে তুলনায় অতটা না। তিনি বলিউডে বহু আড়ালে থাকা মানুষগুলোর একজন এই বিজয় রাজ।

এলাহাবাদ। ভারতের উত্তর প্রদেশের এই অঞ্চলেই জন্ম হয়েছিলো বিজয় রাজের। সালটা ছিলো ১৯৬৯, আর দিনটি ছিলো জুলাই মাসের ১৭ তারিখ। এই জেলাতেই লেখাপড়া আর খেলাধুলায় বেড়ে ওঠা বিজয় রাজ, পান্নালাল গিরধারলাল দায়ানান্দ অ্যাংলো ভেডিক কলেজ আর ইউনিভার্সিটি অব দিল্লী থেকেই করেছেন শিক্ষালাভ।

জীবনের কোনো কিছুকেই কখনো কঠিন করে দেখতেন না বিজয়, সবকিছুই যেন সহজভাবে চলছে, চলবে।

কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিদিনের মতোই একদিন বন্ধুদের নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ক্যান্টিনে। চলবে কড়া করে চা এর সাথে জম্পেশ আড্ডা। পাশেই ছিলো কয়েকজন কলেজ থিয়েটার গ্রুপের কিছু সদস্য। কি মনে করে কে জানে! হঠাৎ বিজয় তাদের বলে দিলো, ‘আমি তোমাদের থিয়েটারে কাজ করতে চাই !’

সিনেমা বা অভিনয়ের প্রতি একটা মায়ার টান, এধরণের কিছুই ছিলো না বিজয়ের। তবুও ইচ্ছে জাগলো আর, কাজ করা শুরু করলো সেই কলেজ থিয়েটারে। মান্ডি হাউজের ‘সাক্ষী কালা মঞ্চে’ও অবশ্য কাজ করেছেন কিছুদিন। কিন্তু খামখেয়ালি বিজয়ের কাছে আসলে যে অজানা ছিলো তখনও, ভাগ্যবিধাতার লেখা গল্পে এমনটাই হওয়ার কথা!

স্নাতক লাভের পর, নিজের ইচ্ছেকেই পুঁজি করে পাড়ি দিয়েছিলেন, স্বপ্ন গড়ার এক প্রতিষ্ঠানে। সেটা দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা (এনএসডি)। সেখানেই হাতেখড়িকে পাকাপোক্ত করা, আর অভিনেতা হিসেবে নিজেকে পরিপূর্ণ করা।

জীবনের প্রথম চরিত্রটা ছিলো একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসেবে, ‘পাগলাগার’ নাটকে। কিন্তু কোনোভাবেই যেন সংলাপ মুখস্ত হচ্ছিলো না। তবে বিজয় রাজ খুব উপভোগ করছিলো বিষয়গুলো। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জীবনে যদি ভালো কিছু করতে হয়, অভিনয়টাকে করতে হবে নিখুঁতভাবে।

সর্বদা একজন প্রতিভাবান মানুষই পারেন আরেকজনের প্রতিভাকে মূল্যায়ন করতে। বিজয় রাজের বেলায়ও যেন তেমনটাই হলো। বলিউড ইতিহাসের অন্যতম একজন গুণী অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহ সাহেব, বিজয়কে কোনো এক চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছিলেন এনএসডিতে। তখন হয়তো বুঝেছিলেন, কিছু একটা তো আছে এর মাঝে!

নাসির সাহেবই সুপারিশ করেছিলেন তার সিনেমা ‘ভুপাল এক্সপ্রেস’ এর জন্যে। মহেশ মাঠাইয়ের সেই চলচ্চিত্রে ‘বাদ্রু’ হয়েই বড়পর্দায় পথচলা শুরু বিজয়ের এবং সেটা সাল ১৯৯৯ তে। তারপরের বছর, রাম গোপাল ভার্মার ‘জাঙলি’ তে ছোট্ট একটি চরিত্র।

তারপর আরো দুয়েকটি কাজ করার পর, ২০০১-এ ক্যারিয়ারের মোড়ে যেন একটি বাঁক নিয়ে আসে ‘মনসুন ওয়েডিং’। পরিচালক মিরা নায়ারের এই চলচ্চিত্রে ‘পিকে দুবে’ করা বিজয় যেন সকলের কাছে আরেকটু ভালোভাবে পরিচিত হয়ে যায়। আর এই চরিত্রের কারণেই, জি সিনের মতো অ্যাওয়ার্ড শো’তে সেরা কমেডি চরিত্রে নমিনেশন পেয়ে যান বিজয়।

তারপর একে একে, কোম্পানি, লাল সালাম, শক্তি-দ্য পাওয়ার, রোড, মুম্বাই ম্যাটিনি-সহ বহু চলচ্চিত্রের ছোট বড় বহু চরিত্রে কাজ করা বিজয় রাজের, সকলের কাছে বেশ জনপ্রিয় একটি মুখ হয়ে ওঠার পিছনে যে ‘নর্দমায় ভেজা’ ও ‘কাউয়া বিরিয়ানি’ খাওয়া সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে, সেই ‘রান’ সিনেমায় ‘গণেশ’ চরিত্রে কাজ করেন ২০০৪ সালে। আর ক্যারিয়ারে ভিন্নতা এনে দেয়া, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা ‘রাঘু রোমিও’-র প্রধান চরিত্রে কাজ করা কিন্তু সেই বছরই।

বলিউডের চলচ্চিত্রের পথচলা শুরু ‘ভুপাল এক্সপ্রেস’ দিয়ে হলেও, তামিলে ২০১৫-এর ‘কাকি সাত্তাই’ ও মালায়লামে ‘মনসুন ম্যাঙগোস’ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ক্যারিয়ারে দিওয়ানে হুয়ে পাগাল, ধামাল, বোম্বে টু গোয়া, দিল্লি সিক্স, দিল্লী বেল্লি-সহ বহু সিনেমায় অভিনয় করা এই অভিনেতার পরিচালক হিসেবে হাতেখড়ি ২০১৪ সালের ‘কিয়া দিল্লি অর কিয়া লাহোর’ সিনেমা দিয়ে।

মাঝে সহজ সরল জীবনযাপনকে, কঠিন রূপও দিয়েছেন নিজের দোষেই। ২০০৫ এর ফেব্রুয়ারিতে, আবুধাবির এয়ারপোর্টে মাদকসহ আটক হয়েছেন আর কিছুটা অন্ধকারকেও যেন স্বাগত জানিয়েছেন ক্যারিয়ারের কথা না ভেবেই।

তবে একপর্যায়ে এসে সবই ঠিকঠাক রেখেছেন। কাজ করে যাচ্ছেন নিজের সেরাটা দিয়ে। জীবনসঙ্গিনী কৃষ্ণা রাজকে নিয়ে পার করা বসন্তগুলোই এখন সব ভালোবাসা জুড়ে। পরিশ্রম করা ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে দিনশেষে একমাত্র কন্যা তানিষ্কা রাজ এর হাসিই যেন যথেষ্ট বিজয়ের কাছে।

সিনেমার যে কোনো চরিত্রে স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও, বিজয় রাজের মতো অভিনেতারা জাদু ছড়াতে পারেন। প্রায় ৮০-র অধিক সিনেমায় অভিনয় করা এমন দারুণ অভিনেতাকে তবুও কেন জানি ধরতে হয়, আন্ডাররেটেডদের একজন হিসেবেই। ভালো কাজের জন্য বেশি আলোচনায় তো থাকতেই দেখা যায়না, এমনকি কখনও পুরষ্কারকেও স্পর্শ করা হয়নি,বেশ কয়েকবার নমিনেটেড হয়েও । এখনো অনেকের কাছেই যেন পরিচিতিটা শুধু ‘কাউয়া বিরিয়ানি’ দ্বারাই, অথচ মানুষটি চমৎকার কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু সেই প্রথম থেকেই৷

বিজয় রাজ’রা কাজ করে যান নিয়মিত, দিয়ে যান নিজের সেরাটা। রেখে যান অভিনয়ের একরাশ মুগ্ধতা। স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার এই বলিউডে বিজয় রাজরা তৈরি করে যান স্বল্প সময়ের জন্য এক বিস্ময়, আর পর্দায় হাজির হয়ে নিজেদের রেখে যান তবুও, আলতো করে ‘আড়ালে’!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।