টেলিফিল্ম ‘ভিক্টিম’: বিষয়াদির গভীরে রেখাপাত

– তবে কি ভিক্টিমই এখন অব্দি আশফাক নিপুণের সর্বাপেক্ষা সূক্ষ্ম এবং জটিল কাজ?

চলচ্চিত্র শিল্প এবং সাহিত্যে অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থকতা নামে একটা বিষয় আছে। সচরাচরই যে এই জিনিসের দেখা মেলে তাও না। দায়সারাভাবে এটার ব্যবহারও করা যায় না। এই দুই মাধ্যমে, অস্পষ্টতার ব্যবহার যখন করা হয় তখন গোটা সিনেমাটা কিংবা বইটা আলাদা একটা ওজন পায়। তবে অস্পষ্টতা শুধু যোগ করে দিলেই হয় না, কতটা যৌক্তিক উপায়ে যোগ করা হচ্ছে; সেটা কিন্তু গুরুত্ব রাখে।

দর্শককে বিভ্রান্ত করতে পারা মানেই কিন্তু দ্ব্যর্থকতা নয়, বরঞ্চ একাধিক সম্ভাবনাকে প্রত্যেকটির নিজ জায়গা থেকে একাধিক উপসংহারের দিকে টেনে কোনটা সর্বাপেক্ষা যৌক্তিক এবং সংগতিপূর্ণ, সেটা দর্শকের উপর ছেড়ে দিতে পারাটাই দ্ব্যর্থকতা এবং এর সফলতা। উদাহারণ হিসেবে; সাহিত্যের ক্ষেত্রে নেওয়া যেতে পারে সাহিত্যিক হেনরি জেমসের নাম। তাঁর ‘দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রিউ’ নভেলাটি এই দ্ব্যর্থক প্রকৃতির জন্যই বিখ্যাত এবং আলোচিত। আবার চলচ্চিত্রে হালের কোয়েন ব্রাদার্স, ক্রিস্টোফার নোলানদের সিনেমার প্রকৃতি বিশ্লেষণেও সেটা পাওয়া যাবে।

যাকগে, এই আলাপ আর দীর্ঘ না করি। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, এই কথাগুলো বাহুল্য দোষে দূষিত। তবে ব্যাপারটা তেমন না। আমাদের দেশীয় কোন কাজে তাও আবার একটা টিভি নাটকে/টেলিফিল্মে (যেখানে রাজ্যের সীমাবদ্ধতা) ‘অস্পষ্টতা’র প্রকৃতি নিখুঁত রেখে একটা কাজ হয়ে গেল, সেটা ভাবতে গেলেই ব্যাপারটা চমকপ্রদ মনে হয়। আর দেখার পর যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি বলে একটু গভীরে টান দেওয়া, বক্তব্যে নাটকীয়তা যোগ করতেও বলতে পারেন।

আশফাক নিপুণের ভিক্টিম যখন শুরু হলো, শুরুর মিনিট বিশেক দেখে এর বাকিসময়ের গতিপ্রকৃতি আন্দাজ করা যায়নি। সকালে, নাস্তার আসরে, বাবার কুবুদ্ধি নিয়ে ছোট মেয়ের পেট ব্যথার নাটক করে স্কুল কামাই দিতে চাওয়া; মায়ের চোখের সে ফাঁকি ধরে ফেলা; দাদার হাত ধরে বেজার মুখ করে নাতনীর স্কুলে যাওয়া- এসব, কমনীয়তায় ভরা একটা ফ্যামিলি ড্রামার অনুভূতিই দিচ্ছিল।

তারপর আরেকটা দৃশ্যে; পরদিন ছুটির দিন বলে স্বামী, স্ত্রীর অন্তরঙ্গ স্পর্শ চাচ্ছে। স্ত্রী ঘুম পাচ্ছে বলে বিছানায় ওপাশ ফিরে মুচকি মুচকি হাসছে। ক্যামেরা তখন স্ত্রীর মুখের মুচকি হাসি ক্লোজ আপে ধরতে ব্যস্ত। ব্লার ব্যাকগ্রাউন্ডে স্বামী বেচারা অনেক শব্দের জালে মূল কথাটা বোঝানোর ক্রমাগত চেষ্টা করে চলছে। স্ত্রীর খুঁনসুটি তো এই দৃশ্যে আছেই, সাথে আছে এমন এক মায়া আর টুকরো ভালোবাসা, যা স্পর্শনীয়।

স্পর্শনীয় হয়েছে পরিচালকের যত্ন আর সূক্ষ্মতার ছোঁয়ায়। তো এমন দুষ্টু-মিষ্টি মুহূর্ততে ভরা নাটকে ২০ মিনিট পার হওয়ার পরই যে ‘যৌন হয়রানি’র মতো এত সংবেদনশীল আর জটিল একটা বিষয় যুক্ত হয়ে যাবে, সেটা ভাবতে পারা যায় না। একটা চাপা অস্বস্তি সেই মুহূর্ত থেকে পরবর্তীর গোটা সময়টায় বিরাজ করে। তখনই ভিক্টিমের আসল প্রকৃতিটা সামনে আসে।

আলোচিত ‘মি-টু’ মুভমেন্ট নিয়ে হলিউডে, বলিউডে অনেক কাজই হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ঘটনা যে আমাদের দেশে নেই, তা নয়। ভুরিভুরি আছে। প্রতিনিয়ত হচ্ছে। তবে তেমন কাজ হয়নি। হয়েছে দু-একটা নাটক। কেন হয়নি বা হচ্ছে না, ভেতরটা জানা থাকলে তা অবশ্য আন্দাজ করতে পারা যায় তবে যে দুই-তিনটা হয়েছে তারমাঝে সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সন্দেহাতীতভাবেই জটিল হলো এই ভিক্টিম।

এই মি-টু মুভমেন্টকে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের ঘটনাও সামনে এসেছে। অনেকের হিপোক্রেসিও সামনে এসেছে। এশিয়া আর্জেন্তো, যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ, যিনি এই মুভমেন্টের নেতৃত্ব দানকারীর মাঝে অন্যতম ছিলেন। সেসব কথা আসছে কারণ ভিক্টিম একসাথে অনেককিছু নিয়েই ডিল করেছে।

ভিক্টিম চাইলেই কাগজেকলমে যে ভিক্টিম, তার দৃষ্টিকোণ ধরে এগোতে পারতো। কিন্তু না। ভিক্টিম ধরেছে স্ত্রীর দৃষ্টিকোণ। এবং সেখানেই চমৎকারিত্বের পরিচয়টা দিয়েছেন আশফাক নিপুণ। কারণ এই চরিত্রটার দৃষ্টিকোণ ধরেছে বলেই মানবচরিত্রের চিরাচরিত দ্বন্দ্বটা অভিঘাতী হয়ে ধরা পড়েছে এই নাটকে। স্ত্রী অপির দ্বিখন্ডিত সত্ত্বাটা তুলে ধরেছে এই নাটক। একদিকে তার জেগে উঠা নারীসত্ত্বা আবার আরেকদিকে ১০ বছরের সংসার, ভালোবাসা আর বিশ্বাসে যেটা গড়া।

ভিক্টিম নাটকে ভিক্টিম শুধু যে হয়রানির স্বীকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে সে নয়, অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগ অব্দি যার উপর অভিযোগ আনা হয়েছে সে এবং তার পরিবারও ভিক্টিম। প্রমাণের আগে যেই মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়, সেটা উঠে এসেছে এই নাটকে। মানসিক আঘাতটা পরিবারকেন্দ্রিক করে গোটা নাটকটাকে গ্রাউন্ডেড পর্যায়ে এনে আরো বাস্তবিক রূপ দিয়েছেন, নিপুণ।

স্ত্রী অপির দ্বন্দ্বের জায়গা থেকেই মনস্তাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে ভিক্টিম। রেস্টুরেন্টের টেবিলে উকিল বন্ধুর সাথে অপির ওই দুটো কথোপকথনের চিত্রই তার ভেতরকার দ্বন্দ্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেয়। উকিল বন্ধু যখন বলে, ‘এখনো এটা একটা অভিযোগ। একটা সাইড না দেখে দুটো সাইড দেখো’ – তখনই তার দ্বন্দ্বটা পরিষ্কার।

আর বিশ্বাসটা যে তার নড়বড়ে হয়ে গেছে, নারীসত্ত্বার দিকটা যে তাকে একমাত্রিকভাবে ভাবতে বাধ্য করছে সেটার পরিচয় পাওয়া উকিল বন্ধুর সাথে দ্বিতীয় আলাপের দৃশ্যে। বন্ধু বলে, ফোনটা চেক করে তুমি কিছু পাওনি। এতে তোমার আশ্বস্ত হবার কথা। কিন্তু মনে হচ্ছে, তুমি ডিজাপয়েন্টেড। তাহলে কি তুমি কিছু পাবে বলে আশা করেছিলে? বিশ্বাসটা কি তবে হারিয়েই ফেলেছো?’ অভিযোগ তদন্ত করে একটা ফলাফল তো শেষ অব্দি আসে কিন্তু যেই দ্বিখন্ডনটা স্ত্রীর ভেতরে হয়ে গেছে সেটা আর জোড়া লাগবে কীভাবে? টেনশনটাকে একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে রেখে, অস্বস্তিকে বাড়িয়ে শান্ত গতিতে এগিয়ে চলা ভিক্টিম সবকিছু অশান্ত করে দেয় যখন সবকিছুর শেষে স্ত্রীর অবস্থা এবং অবস্থানটা ভাবতে যাওয়া হয়।

ভিক্টিম অ্যাকশনটা রেখেছে অফ-স্ক্রিনে। কী ঘটেছে সেটা না দেখিয়ে বরং দুই ব্যক্তির দিক থেকে জানানো হয়েছে, সেটাও এমন করে যেখানে সন্দেহ প্রকাশ করার যথাযথ কারণ আছে। সেখানেই অস্পষ্টতার মূল বীজটা প্রোথিত। স্ত্রী অপি করিমের দ্বন্দ্ব দিয়েই অস্পষ্টতার প্রকৃতিকে গাঢ় করেছে ভিক্টিম। সূক্ষ্মভাবে অনেক প্রশ্ন, বক্তব্য রেখেছেন আশফাক নিপুণ। কোনটা স্বাভাবিক আচরণ আর কোনটা ইঙ্গিতপূর্ণ, কোনটায় কিছু হতেও পারার সুযোগ থাকে আর কোনটায় এটা আসলে এমনও হতে পারে; সেসবকিছুর বয়ান রেখেছেন। এবং এইসবকিছু চড়াওরূপে নয়, সূক্ষ্মরূপে দেখিয়েছেন। জটিলতার পাড়টায় তখনই ঘেঁষে যায় ভিক্টিম।

অপি করিমের চরিত্রকে নিজের মাঝে ধারণ করা অভিনয়ে, আফরান নিশোর পরিমিত ও সূক্ষ্ম অভিনয়ে এবং আশফাক নিপুণের ত্রুটিহীন বয়ানভঙ্গীমা আর নির্দেশনায় ‘ভিক্টিম’ তার বিষয়াদিতে সর্বাপেক্ষা দক্ষ, প্রাসঙ্গিক এবং দূরদর্শী কাজ। টিভি প্রোডাকশনে এমন সাহস দেখানোয় সম্মান এবং সাধুবাদ দুটোরই দাবিদার আশফাক নিপুণ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।