সেকালের তারকা, একালের আক্ষেপ

সাফল্য কখনোই চিরস্থানীয় হয়। অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে এই কথাটা যেমন সত্য, বলিউডেও তেমনি সত্য। বলিউডে বা টেলিভিশনের জগতে এক কালে অনেক সাফল্য পাওয়া অনেকেই শেষ বয়সে ‍খুব দু:খ, জরা আর দারিদ্রে জীবন যাপন করেছেন। অনেকে পরিস্থিতির শিকার হয়ে স্টারডম হারিয়েছেন, সাদামাটা জীবন যাপন করছেন। অনেকে আবার মিশে গেছেন অপরাধ জগতের সাথে।

  • আনু আগারওয়াল

তিনি ছিলেন হিট সিনেমা ‘আশিকি’র নায়িকা। ‘তুমি তো স্টার!’ – আনুকে প্রথম দেখার পর এই কথাটাই বলেছিলেন সিনেমা নির্মাতা মহেশ ভাট। কেবল আনুর কথা মাথায় রেখেই সিনেমার স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত লিখেছিলেন খ্যাতনামা এই পরিচালক।

আশিকি’র পর খলনায়িকা, কিং আঙ্কেল – ইত্যাদি সিনেমা করেন অনু। সবগুলোই বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৯৯ সালে তিনি মুম্বাই ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। এর জন্য ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাকে ২৯ দিন কোমায় থাকতে হয়।

আনু এখন বিহারে থাকেন। এখনো বিয়ে করেননি। বিহারের মুঙ্গারে একটা যোগ ব্যায়ামের স্কুলে নিয়মিত ব্যায়াম করেন। ২০১৫ সালে নিজের আত্মজীবনি লেখেন ‘আনুজিয়াল – মেমোইর অব আ গার্ল হু কেম ব্যাক ফ্রম দ্য ডেড’-এ নতুন জীবন ফিরে পাওয়া আনু’র লড়াইয়ের গল্পটা জানা যায়।

  • পারভিন ববি

আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও সাহসিকতার অনন্য এক দৃষ্টান্ত ছিলেন পারভিন ববি। যদিও, একই সাথে তিনি ছিলেন ছন্নছাড়া। মেগা স্টার অমিতাভ বচ্চনের সাথে তিনি দিওয়ার, নামাক হালাল, আমার আকবর অ্যান্থনি ও কালাপাহাড় সিনেমা করেন। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ১৯৭৬ সালে। সেবারই তিনি হাজির হন বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের কভারে।

তিনি নেতিবাচক কারণে খবরের শিরোনামে আসেন আশির দশকের শেষে। তিনি বোম্বের হাই কোর্টে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। যাদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেন, নামগুলো শুনলে রীতিমত আকাশ থেকে পড়বেন। তাঁর সন্দেহের তালিকায় ছিলেন বিল ক্লিনটন, আল গোরে, প্রিন্স চার্লস, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকার, ভারতের বিজেপি সরকার, রোমান ক্যাথলিক চার্চ, গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই, সিআইএ, কেজিবি ও মোসাদ।

এমনকি স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনও বাদ যাননি। এমন ছেলেমানুষী পিটিশন আমলেই নেয়নি আদালত। ১৯৮৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে পারভিন ববি বলেন, ‘অমিতাভ বচ্চন একজন সুপার ইন্টারন্যাশনাল গ্যাঙস্টার। ও আমার জানের পেছনে লেগেছে। ওর গুন্ডারা আমাকে কিডন্যাড করে একটা নির্জন দ্বীপে নিয়ে যায়, সেখানে সার্জারি করে আমার কানের নিচে একটা ট্রান্সমিটারও লাগিয়ে দেয়।’

২০০৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর মৃত্যু হয়। সেবার ২২ জানুয়ারি জুহুতে তাঁর প্রতিবেশিরা লক্ষ্য করলেন তিনদিন হল তিনি দুধ কিংবা খবরের কাগজ নিতে বের হচ্ছেন না। তাঁরা ভবনটির সেক্রেটারিকে খবর দেন। সেক্রেটারিই পুলিশ ডেকে আনেন। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের তালা খোলা হল। পাওয়া গেল এক কালের জনপ্রিয় এই নায়িকার মৃত দেহ!

  • অরুণ গোভিল

১৯৮৬ সালে তাঁকে অনেক শক্তিমান একজন অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হত। কার তিনি তখন ‘রামায়ন’-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘রামানান্দ সাগর জি’ সিরিয়ারে রামের চরিত্রটি করছিলেন। ভারতীয়রা তখন পারলে তাঁরই উপাসনা করে।

পরবর্তীতে এই সিরিয়ালে সিতার চরিত্র করা দীপিকা ও রাবনের চরিত্র করা অরবিন্দ ত্রিবেদী নির্বাচন করে সংসদ সদস্য বনে যান। অরুন আটকে থাকেন টেলিভিশনেই। এরপরও অনেকগুলো সিরিয়াল করেছেন, হিন্দি-বাংলাসহ ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক সিনেমাগুলোতে কাজ করেছেন। কিন্তু, কখনোই আগের মত খ্যাতি পাননি।

পরবর্তীতে সহঅভিনেতা সুনিল লাহিরির সাথে মিলে একটা প্রোডাকশন হাউজও খুলেছিলেন তিনি। কিন্তু, কখনোই সেখান থেকে কোনো বড় সাফল্যের খবর আসেনি।

  • মমতা কুলকার্নি

মমতা মাত্র ২০ বছর বয়সে বলিউডে যোগ দেন। ‘আশিক আওয়ারা’ সিনেমায় সাইফ আলী খানের বিপরীতে তাঁর অভিষেক।  সাইফ ও মমতা দু’জনই সেরা নবাগতের পুরস্কার জিতে যান। সাফল্যের সিঁড়িতে তর তর করে উপরে উঠে যাচ্ছিলেন মমতা। শাহরুখ, আমির, সালমান – তিন খানের সাথেই ক্যারিয়ারের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই কাজ করে ফেলেন তিনি।

১৯৯৮ সালে রাজকুমার সন্তোষী মমতাকে তাঁর ছবি ‘চায়না গেট’ থেকে মাঝপথে বের করে দেন । পরে আসে আন্ডাওয়ার্ল্ড ছোটা শাকিলের ফোন। তাঁর হুমকিতেই নাকি ফের মমতাকে ছবিতে ফিরিয়ে নেন রাজকুমার। বলা হয়, এই ঘটনাই বলিউড থেকে দূরে ঠেলে দেয় মমতাকে। সিনেমা ফ্লপ হয় আর প্রযোজক-নির্মাতাদের কাছে একটা খারাপ ভাবমূর্তি  তৈরি হয় তাঁর।

 

২০০২ সালে গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে একেবারেই হারিয়ে যান মমতা। মমতার শেষের দিকের কাজগুলো হল – সেন্সর (২০০১), ছুপা রুস্তম (২০০১) ও কাভি হাম কাভি তুম (২০০২)। বলিউডে ১০ বছরের ক্যারিয়ারে মমতা করেন মোট ২২ টি ছবি।

সর্বশেষ তিনি কুখ্যাত ড্রাগ ডিলার ভিকি গোস্বামীর সাথে সম্পর্ক থাকার সুবাদে আলোচিত হন। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তাকে কেনিয়াতে কুখ্যাত সব ড্রাগ মাফিয়াদের সাথে বৈঠক করতে দেখা যায় ভিকির সাথে।  ক্রাইম ব্রাঞ্চের কর্মকর্তারা মুম্বাইয়ের ভারসোভায় মমতার বাড়ি স্কাই এনক্লেভের দরজায় গ্রেফতারি পরোয়ানা লাগিয়ে দিয়ে এসেছে। যদিও, তার খোঁজ মেলেনি। তাঁকে ‘পাকারনা মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যায়’!

  • এ কে হাঙ্গাল

তিনি হিন্দি সিনেমায় নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন ৫০ বছর বয়সে। অনেকগুলো হিট সিনেমায় করেন করেন তিনি। পাঁচ দশকের অভিনয় জীবনে ২০০ টির বেশি সিনেমায় কাজ করেন তিনি।

সর্বশেষ তাঁকে দেখা যায় আমোল পালেকারের পাহেলি সিনেমায়। সেখানে তাঁর সহ অভিনয় শিল্পীরা ছিলেন স্বয়ং শাহরুখ খান, অভিতাভ বচ্চন ও রানী মুখার্জী। ২০০৬ সালে হিন্দি সিনেমায় অবদান রাখার জন্য তাঁকে ২০০৬ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

দারিদ্রতার কারণে ২০১১ সালে তিনি আবারো খবারে আসেন। তাঁর ছেলে বাবার চিকিৎসার খরচ যোগাতে ব্যর্থ হন। তখন অমিতাভ বচ্চন, বিপুল শাহ, মিঠুন চক্রবর্তী, আমির খান, সালমান খানরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

২০১২ সালের ২৬ আগস্ট হাঙ্গাল মারা যান। তাঁর শেষকৃত্যে বলিউডের জনপ্রিয় কাউকেই দেখা যায়নি। কেবল বলিউডের অভিনেতাই নন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় দেশভাগের আগে তাঁকে তিন বছর জেলও খাটতে হয়েছিল।

– এন্টারটেলস অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।