মাঠ কাঁপানো ফুটবলার, বীর মুক্তিযোদ্ধা

ছিলেন একজন তারকা ফুটবলার, ষাটের দশকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের দেশবরেণ্য ফুটবল দলের গোলরক্ষক। ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ জমিনে ছিল তাঁর বিচরণ। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা দর্শকদের তুমুল হর্ষধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হতো তাঁর তারকাখ্যাতি। খেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে। কিন্তু ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার ডাক তিনি এড়াতে পারেননি।

যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। ফুটবল ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। তারকাদ্যুতির চাকচিক্যকে পায়ে ঠেলে রণাঙ্গনের রণ দামামায় তিনি হয়েছেন উদ্বেলিত। ফুটবল ছেড়ে বেছে নিয়েছেন সৈনিকের জীবন। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে সেই সৈনিকের জীবনেই হয়েছেন থিতু।

জন্মভূমির স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) খোন্দকার মো. নূরুন্নবী। তাঁর রচিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে সেক্টর আট’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক অজানা তথ্য ও সুত্র এ বই থেকে পাওয়া যায়।

এক তীব্র ক্রোধ তাঁকে যুদ্ধে নিয়েছিল। চোখের সামনে দেখেছিলেন ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নিধনযজ্ঞ। প্রিয় ঢাকা স্টেডিয়ামের বারান্দায় দেখেছিলেন গরীব-ছিন্নমূল মানুষের রক্তাক্ত মৃতদেহ। স্বজাতির অপমান আর অবরুদ্ধ-পরাধীন জীবন তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। ফুটবলের চেয়ে জীবন যে অনেক বড়, সেদিন খোন্দকার নূরুন্নবী তা বুঝতে পেরেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। তাই তো দেশমাতৃকার কাতর আহ্বান তাঁকে উদ্যত করেছিল শত্রু-নিধনে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে তিনি বিসর্জন দিয়েছিলেন তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার। দেশপ্রেমে ভাস্বর হয়ে তিনি কেবলমাত্র দেশের প্রয়োজনে সেদিন বেছে নিয়েছিলেন সৈনিকের গর্বিত অথচ শৃঙ্খলিত জীবন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত উঠে করেছেন দেশের সেবা। মেজর জেনারেল (অব.) খোন্দকার মো. নূরুন্নবী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য সেনানী, যিনি এই দেশে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দেশপ্রেম আর ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকবেন আমাদের মাঝে।

১৯৬৫ সালে খোন্দকার নূরুন্নবী যোগ দিয়েছিলেন মোহামেডানের মতো ক্লাবে। যে দলে খেলাটা যেকোনো ফুটবলারের জন্যই ছিল স্বপ্নের মতো, সেই স্বপ্ন পূরণের ছয় বছরের মাথাতেই তিনি বিসর্জন দিয়েছিলেন তাঁর ফুটবলার জীবন। ব্যাপারটি নিয়ে কোনো আফসোসই নেই এই বীর মুক্তিসেনার; বরং জীবনের এই পরিণত পর্যায়ে এসে পেছন ফিরে তাঁকালে তিনি অনুভব করেন প্রচণ্ড গর্ব।

দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া দেশের সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন প্রথম ব্যাচে কমিশন পেয়েছেন। দেশসেবার পোশাক গায়ে জড়িয়ে দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালীন সময়ে রেখেছেন অবদান। এ সবকিছুই আজ এত বছর পর তাঁকে দেয় এক অনাবিল তৃপ্তি, অনির্বচনীয় এক আনন্দ। যে আনন্দের সত্যিই কোনো তুলনা হয় না।

১৯৭০ সাল, খোন্দকার নূরুন্নবী তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জনটি হাত দিয়ে ছুঁয়েছিলেন। সুযোগ পেয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে। খেলতে গিয়েছিলেন ইরানে। পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ককে নিয়ে তখন আয়োজিত হতো আরসিডি ফুটবল প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় খেলতে গিয়েই তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তানিরা আসলে বাঙালিদের কী ধরনের বৈষম্যের চোখে দেখে। ওই সময়ে তাঁর হৃদয়ের রেখাপাত পরিণতি পেয়েছিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

ফুটবলার হিসেবে পেয়েছিলেন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের চাকরি (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক)। সারা দিন অফিসে কাজকর্ম, বিকেলে ফুটবল। প্রথম বিভাগে মোহামেডানের মতো দলের খেলোয়াড় হিসেবে পারিশ্রমিক আর ন্যাশনাল ব্যাংকের বেতন, এই দুই মিলিয়ে বেশ সচ্ছল ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবন।

নিজের টাকায় কিনেছিলেন একটা ভেসপা। তাই নিয়ে ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াতেন। খেলা, অফিস, ঘোরাঘুরি আর আড্ডা, সব মিলিয়ে একটা আনন্দময় জীবনই কাটিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৭১ সাল যেন খোন্দকার নূরুন্নবীর জীবনে এক উন্মাতাল ঢেউ হয়ে নাড়া দিল। মাত্র কয়েকটি ঘটনা, তাঁর জীবনকে বদলে দিল আমূল।

একাত্তরে বাঙালির স্বাধিকারের সংগ্রাম সবার মতো খেলোয়াড়দেরও নাড়া দিয়েছিল। কোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ না থাকলেও খোন্দকার নূরুন্নবীও এর বাইরে ছিলেন না। প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক বিজয়ের। সত্তরের নির্বাচনের পর বাঙালির স্বাধিকারের প্রতিনিধি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্রে তিনিও প্রমাদ গুনেছিলেন, আশঙ্কা করছিলেন খারাপ কিছুর। কিন্তু সেই খারাপ যে স্বজাতির ওপর বর্বর আক্রমণ হয়ে দেখা দেবে, সেটা তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের থমথমে রাতেও তিনি অনেক রাত অবধি কাটিয়েছেন ঢাকা স্টেডিয়ামের প্রিয় আঙিনায়। তখনো ভাবতে পারেননি কী এক মনুষ্য-সৃষ্ট দুর্যোগ সওয়ার হচ্ছে বাঙালির জাতীয় জীবনে।সেদিন বাসায় ফিরে কিছু মুখে দিতেই তিনি সাক্ষী হন ইতিহাসের নৃশংসতম দুর্বিপাকের। বুলেট, বোমা, মেশিনগানের বিকট, কান ফাটানো আওয়াজ আর মানুষের আহাজারির মধ্যে ঢাকার আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা তাঁকে বুঝিয়ে দেয় তাঁর প্রিয় স্বদেশ আক্রান্ত।

সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কোলকাতা গিয়ে তাঁর দেখা হয় পাকিস্তান জাতীয় দলের সতীর্থ মেজর হাফিজউদ্দিনের সঙ্গে। মেজর হাফিজকে পেয়ে খোন্দকার নূরুন্নবীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার বাসনা পূরণ হয়।

সেখান থেকে তিনি যান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ শিবিরে। প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে সেক্টর আটের অধীনে কুষ্টিয়া অঞ্চলে তিনি অস্ত্র হাতে নেমে পড়েন মাতৃভূমির মুক্তিযুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তিনি রাখেন অসামান্য ভূমিকা।

স্বাধীনতার পরে তিনি খেলোয়াড়ি জীবনে ফিরে যেতে পারতেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম যুদ্ধকালীন ব্যাচে তাঁর সহযোদ্ধাদের অনেকেই যুদ্ধশেষে ফিরে গেছেন নিজেদের আগের পেশায়। কিন্তু খোন্দকার নূরুন্নবী সেনাবাহিনীতে থেকেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের সেরা সময়গুলো। তিনি বিফল হননি। ঢাকা স্টেডিয়ামের চৌহদ্দিতে তিনি যেমন সফল ছিলেন, স্বাধীন দেশের মাটিতে সেনাবাহিনীর জীবনেও তিনি সফল।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম কমিশন প্রাপ্ত অফিসারদের অন্যতম, খোন্দকার নূরুন্নবী সেনাবাহিনীতে একটি করে ধাপ অতিক্রম করে পৌঁছেছেন শীর্ষ শিখরে। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বিভিন্ন স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব সামলেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের। সীমান্তরক্ষী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) রাঙামাটি সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি সেনাবাহিনীতে ঢাকার লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার হয়ে (লগ এরিয়া) সর্বশেষ আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক হিসেবে ২০০১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। যে ফুটবল জীবন তিনি ছেড়ে এসেছিলেন ৪২ বছর আগে, সেই ফুটবল জীবনের স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন ২০০২ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে।

২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর তাঁকে আমরা চিরদিনের মতো হারিয়েছি। একের পর এক চলে যাচ্ছেন মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকা মানুষগুলো। গেরিলা ১৯৭১ পরিবার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) খোন্দকার মো. নূরুন্নবী’র আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করছি।

– সৌজন্যে গেরিলা ৭১

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।