উত্তম কি সুপ্রিয়াকে বিয়ে করেছিলেন?

পর্দায় উত্তর কুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটির সাথে অন্য কোনো কিছুকেই তুলনা করতে পারে না বাঙালি। তবে, উত্তম কুমারের হৃদয়ের রানী ছিলেন সুচিত্রা দেবী। তাঁরা ছিলেন বাস্তব জীবনের সত্যিকারের জুটি।

সুচিত্রা সেন ছাড়াও উত্তম কুমারকে ভাবতে পারতো ওই আমলের পরিচালকরা। তাইতো, সুচিত্রার মত প্রায় সমান ভাবেই আলোচিত ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী – আরেক কিংবদন্তিতুল্য নায়িকা। সোনার হরিণ থেকে তাদের জুটির এক সাথে পথচলা শুরু। এরপর তারা একে একে উত্তরায়ণ, কাল তুমি আলেয়া, সন্যাসী রাজা, বন পলাশীর পদাবলী, বাঘ বন্দীর খেলা’র মত জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেন।

সুপ্রিয়া দেবীর প্রথম স্বামী ছিলেন বিশ্বনাথ চৌধুরী। ১৯৫৪ সালে এই দম্পতির বিয়ে হয়। তবে এই দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ছিলেন সোমা। চার বছর সংসার করার পর তাঁরা আলাদা হয়ে যান। বিয়ে করে সিনেমা ছাড়লেও বিচ্ছেদের পর আবারো পর্দায় ফিরে আসেন সুপ্রিয়া।

উত্তম ও সুপ্রিয়া

তখন থেকেই উত্তম কুমারের সাথে তাঁর ঘণিষ্টতার সূচনা। তখন অবশ্য তিনি বিবাহিতই ছিলেন। স্ত্রী ছিলেন গৌরী দেবী। এরপরও সহশিল্পী হিসেবে সুপ্রিয়া দেবীর সাথে বন্ধুত্ব হয় তারা। দু’জন একে ওপরের ওপর একটু একটু করে নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। প্রচণ্ড বিশ্বাস আর আস্থা ছিল তাঁদের মধ্যে।

শোনা যায়, একটা সময় শ্যুটিং থেকেও এক সাথে যাওয়া আসা করতেন এই জুটি। সেটা নিয়ে মনোক্ষুণ্ন ছিলেন উত্তমের স্ত্রী গৌরী দেবী। কথা কাটাকাটি থেকে সেই বিষয়টা থেকে দাম্পত্য কলহ চরম আকার ধারণ করে। অন্যদিকে সুপ্রিয়ার মধ্যে মহানায়ক খুঁজে পান বিশ্বস্ত বন্ধু, নির্ভরযোগ্য সহকর্মী এবং তার শিল্পী সত্তার অনুরাগীকে।

উত্তম কুমার তাই গৌরী দেবীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ফলাফল, ১৯৬৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর গিরীশ মুখার্জি রোডের পৈতৃক বাসভবন থেকে উত্তম কুমার চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা রোডের ফ্ল্যাটে। জীবনের বাকি সতেরটি বছর তিনি সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেই অতিবাহিত করেন। তবে, গৌরী দেবী কখনোই উত্তম কুমারকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ডিভোর্স দেননি।

সুপ্রিয়ার মেয়ে সোমার বিয়েতে উত্তম কুমার।

সুপ্রিয়া দেবী তাঁর স্মৃতিকথা বিষয়ক বই ‘আমার জীবন আমার উত্তম’ – নিজেদের বিয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবী করেন ১৯৬২ সালে দুই ডিসেম্বর সকল ধর্মীয় ও আনুষ্ঠানিক বাঁধা মেনেই সাত পাঁকে বাঁধা পড়েছিলেন এই দুই কিংবদন্তি।

বিয়েতে সুপ্রিয়ার বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উত্তম কুমারের কয়েকজন বন্ধুও ছিলেন। এরপর পাঁচ ডিসেম্বর তারা বিবাহত্তোর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন যেখানে চলচ্চিত্র জগতের প্রচুর অতিথির সমাগম হয়।

তবে গৌরী দেবীর সঙ্গে আইনগতভাবে বিচ্ছেদ না হওয়ায় তারা রেজিস্ট্রি করতে পারেননি। স্বামী হিসেবে উত্তম নাকি ছিলেন খুব রোমান্টিক এবং কখনও কখনও বেশ ঈর্ষাকাতর। উত্তমের বারণ মেনেই হিন্দি ছবির জগত ত্যাগ করেন সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া খুব সংসারি ছিলেন। তাঁর রান্নার হাত ছিল দারুণ। উত্তম ছিলেন সুপ্রিয়ার রান্নার সবচেয়ে বড় ভক্ত।

সপ্তপদী সিনেমার একটি দৃশ্য

বাড়িতে প্রযোজক ও পরিচালকদের বেশি আসা-যাওয়া এবং সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে আড্ডা একেবারেই পছন্দ করতেন না তিনি। তবে উত্তমের নারী সহকর্মী, ভক্ত কিংবা উঠতি নায়িকাদের মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাতেও ঈর্ষা বোধ করতেন না সুপ্রিয়া।

কারণ তিনি জানতেন উত্তম এদের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। এমনকি সুচিত্রা সেনকেও ঈর্ষা করেননি। পর্দায় সুচিত্রা-উত্তমের রোমান্টিক দৃশ্য দেখেও তিনি বুঝতেন সেটা নিছক অভিনয়।

মৃত্যুর আগ অবধি দু’জনের মধ্যে এই দারুণ বোঝাপড়া টিকেছিল। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মারা যান উত্তম। এর পর থেকে জীবনের শেষ দিন অবধি স্বামী, পরমবন্ধুর স্মৃতিচারণা করেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন সুপ্রিয়া।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।