উত্তমের মহিমান্বিত ক্যারিয়ারের ‘কলংক’

নায়ক হিসেবে সম্ভবত একবারই বাঙালি তাঁর স্বপ্নের নায়ককে নিয়ে হতাশ হয়েছিল। এবং সেই হতাশা থেকে তাঁকে হতে হয়েছিল ‘অ্যান্টাগনিস্ট’। কিন্তু, তাও সেটা নিজের দায়ে নয়। একপ্রকার বাধ্য করা হয়েছিল তাঁকে কাজটা করতে, যেখানে তাঁর মহানায়কোচিত ইমেজকে ব্যবহার করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সালটা ১৯৭৬।

১৯৩২ সাল থেকে আকাশবাণীতে মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আবৃত্তি করে আসছিলেন নাট্যকার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পুরো পাণ্ডুলিপিটি লেখা বাণীকুমার ভট্টাচার্যের। নির্দেশনা তথা পরিচালনায় ছিলেন সুবিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক পঙ্কজ মল্লিক।

দুর্গা পূজার আগে, বেতারে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ না শুনলে বাঙালির সর্বজনীন উৎসবের গায়ে গৌরচন্দ্রিকা পড়েনি বলেই মনে করা হতো! এতোটাই হৃদয়ের কাছাকাছি ছিল এ অনুষ্ঠান। আর এ আয়োজনে তাঁর আবৃত্তিগুণের কারণে বীরেন ভদ্র হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ‘রেডিও আইকন’। আহ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের আবৃত্তির কণ্ঠ — আজও মনে হয়, বাংলাভূমে এঁর তুল্য কিছু নেই!

ব্যত্যয় ঘটল ওই ১৯৭৬ সালে। কলকাতা-মুম্বাইয়ের ফিল্মি তারকারাজি দিয়ে সাজানো হলো বিকল্প এক অনুষ্ঠান, নাম ‘দেবী দুর্গতিহারিণীম’। এর স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের তৎকালীন প্রধান ড. গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়। পরিচালনা করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আবৃত্তি করলেন বাঙালির ‘ম্যাটিনি আইকন’ উত্তম কুমার।

নতুন এ আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু মূলত ছিলেন উত্তম কুমারই। নতুনত্ব আনার প্রচেষ্টা থেকেই তাঁকে চিন্তা করে আকাশবাণী মাঠে নেমেছিল। কিন্তু, ৪৪ বছর ধরে যে ভদ্র ও মল্লিকের সফল প্রোডাকশন ছিল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, তাঁদের একবারও জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি বেতার কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে, উত্তম প্রস্তাবটা পেয়ে শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় নিজেকে তিনি ভাবতেই নারাজ ছিলেন। ঠিক এ জায়গায় উত্তম শিল্পী হিসেবে কতটা সৎ ছিলেন, তা বোঝা যায়।

হৃদয় চাইছে না, মস্তিষ্কও সায় দিচ্ছে না। তবুও, কাজটা করতে একপ্রকার বাধ্যই হলেন উত্তম। বাংলার অবিসংবাদিত বাচিকশিল্পীর জুতো পায়ে গলাচ্ছেন বলে নিজের ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমা চাইতে, তীব্র গ্লানি নিয়ে উত্তম ছুটে গেলেন বীরেন ভদ্রের বাড়িতে। ভাবা যায়, উত্তম কুমার, তখন তিনি বাঙালির হৃদয়ের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বরপুত্র, অথচ, কী বিনয়াবনত!

উত্তমের অনুষ্ঠান ফ্লপ!

সমালোচনা। ভাঙচুর। গালাগালি। সব কিছুর অভিজ্ঞতা হলো আকাশবাণীর। পরের বছর ফের ফিরে এলেন ভদ্র-মল্লিক জুটি৷ কিন্তু, আদৌ কি এন্টাগনিস্ট হলেন উত্তম?

এই ঘটনার চার বছর পর ১৯৮০ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মহাপ্রয়াণ ঘটল মহানায়কের। আহা, অকালে প্রস্থান হলো বাঙালির নন্দদুলালের! ব্যথিত সত্যজিৎ রায় বললেন — ‘এই মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ আলাের মৃত্যু। তাঁর মতো নায়ক নেই, হবেও না।’

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কি কোনদিনও ভেবেছিলেন তাঁকে আরও বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে? ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রস্থানের শবযাত্রায় বাঙালি প্রথম বীরেন ভদ্রের কণ্ঠে শুনেছিল শোক-ধারাবিবরণী… রবী গেল অস্তাচলে! ঠাকুর গিয়েছিলেন পরিণত বয়সে।

৩৯ বছর পর উত্তম গেলেন অকালে। ধারাবাহিকতা মেনে শোক-ধারাবিবরণীর কণ্ঠে সেই বীরেন ভদ্র, উত্তমের চেয়ে যিনি ২১ বছরের বড়। সেদিন, বীরেন ভদ্রের ধারাভাষ্যে, চোখের জল নয়, যেন মহাসমুদ্রের বাঁধ ভেঙে পড়েছিল বাঙালির! উত্তমের শেষযাত্রা পরিণত হয়েছিল জলস্রোতে!

আহা, মৃত উত্তম সব ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে গেলেন যেন! একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ফ্লপ হয়েছিল। বাঙালির অনুভূতি কেমন চূর্ণ হয়েছিল, তা তো বুঝেইছিল আকাশবাণী। উত্তমও কি বোঝেননি? চাঁদেও কলংক থাকে যেমন, উত্তমের মহিমান্বিত ক্যারিয়ারে ‘কলংক’ হয়তো ছিল এ কাজটাই, যেটা তিনি করতেই চাননি। কিন্তু, ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই সেসব ধর্মবোধ লুপ্ত হয়ে কোথায় যেন কর্পূরের মতো উবে গেল! শুধু রয়ে গেল সেই অমর বাণী – ‘তুমি রবে নীরবে’!

উত্তম চলে গেলেন নায়কোচিত আবহে। বাঙালির প্রাণের নায়কের প্রস্থানে ওসব ধর্মবোধ ঠুনকো হয়ে পড়ে রইল এককোণে। আজ ৪০ বছর পর এসব ভাবা এক বিরল ব্যাপার বৈকি! নাকি, নামটি উত্তম কুমার বলেই, বাঙালি আর এসব ফালতু বেহিসেবের অংক কষেনি?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।