বিশ্বকাপের অঘটননামা: অতিমানবীয় সব ম্যাচের গল্প

বিশ্বকাপ মানেই রুদ্ধশ্বাস লড়াই, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের যুদ্ধ। সেখানে ছোটবড় দল বিচার করতে গেলেই পড়তে হয় বিপদে। গত আসরগুলোতে বেশ কিছু দল শিকার হয়েছিল ক্রিকেটে বহুল প্রচলিত শব্দ ‘আপসেট’-এ।

  • ফাইনাল ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৮৩

আসরের শুরুর দিকে ভারতকে কেউ গোণায় ধরেছিল কিনা সন্দেহ! যে দলকে অনেকে ফাইনালে ওঠা তো দূরে থাক, গ্রুপ পর্ব পেরোবে কিনা এ ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন , সে দলই ফাইনালে চরম শক্তিশালী দলকে হারিয়ে জিতেও গেল বিশ্বকাপ!

তবে গ্রুপস্টেজে দুর্দান্ত পারফর্ম এবং নকআউট ম্যাচগুলোতে অকুতভয় ক্রিকেট খেলা ভারত ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল তখনকার ওয়ানডে ক্রিকেটের অবিসংবাদিত সম্রাট ক্যারিবিয়ানদের।

সবাইকে চমকে দিয়ে সে দলকে হারিয়েই ভারত জিতে নেয় নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ। প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই সুনীল গাভাস্কার ফিরে যাওয়ায় ভারতের শুরুটা ভাল হয়নি। তারপর ইনিংসের হাল ধরে শ্রীকান্ত ও যশপাল শর্মা এগোতে থাকেন।

যদিও ক্যারিবিয়ান বোলারদের ঐতিহ্যবাহী আগ্রাসী বোলিংয়ে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ স্বস্তিবোধ করছিলো না। শেষ পর্যন্ত ভারত ৫৪.৪ ওভারে ১৮৩ রানে থেমে যায়। ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলার এন্ডি রবার্টস নেন তিন উইকেট  যখন দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হচ্ছে, ক্যারিবিয়ানদের দিকেই বাজির পাল্লা ছিল ভারী।

অন্তত যখন ভিভ রিচার্ডস ক্রিজে ছিলেন, অনেকেই ভেবেছিলেন ম্যাচটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৫ ওভারেই জিতে নিবে। কিন্তু ভারতীয় দলপতি কপিল দেব দারুণ এক ক্যাচ নিয়ে ভিভকে ফিরিয়ে ঘোরান ম্যাচের মোড়, কিন্তু ম্যাচ তখনো দোলাচলেই বহমান ছিল।

কিন্তু ভারতীয় বোলারদের চতুর বোলিং বাকি ব্যাটসম্যানদের ভাল শুরুর পরও ইনিংসটা গড়তে দিচ্ছিল না। মাইকেল হোল্ডিংকে এলবিডব্লিউ করে ইনিংসের যবনিকা পতন করেন মাহিন্দর অমরনাথ, ভারত পেল ৪৩ রানের অপ্রত্যাশিত ও অতিমানবীয় জয়। কপিল দেবের হাতটা ট্রফিটাকে উচিয়ে ধরার পরই উৎসবপ্রিয় দেশটার উন্মাদনায় নতুন করে যোগ হলো এক উপাদান – ক্রিকেট!

  • গ্রুপ পর্ব, অস্ট্রেলিয়া বনাম জিম্বাবুয়ে, ১৯৮৩

১৯৮৩ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ে সবচেয়ে বড় অঘটনগুলির মধ্যে একটি ছিল নবীন জিম্বাবুয়ের অস্ট্রেলিয়াবধ। নটিংহ্যামে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামা জিম্বাবুয়ে ভাল শুরু করলেও অচিরেই ৯৪/৫ এ পরিণত হয়।

কিন্তু, তারপর অধিনায়ক ডানকান ফ্লেচার, কুরানকে সঙ্গে নিয়ে ৭০ রানের জুটি গড়ে বিপর্যয় সামাল দেন, ফ্লেচারের হার না মানা ৬৯ রান ও আরো কয়েকটি ছোট ছোট ইনিংসের কল্যাণে ৬০ ওভার শেষে জিম্বাবুয়ে স্কোরবোর্ডে ৬ উইকেটে ২৩৯ রান তোলে, যা সে সময়ে বেশ চ্যালেঞ্জিং স্কোর।

জবাবে অজিরাও ভাল শুরু করে, কিন্তু ধীরগতিতে রান তোলার কারণে মাঝপথে এসে খেই হারিয়ে ফেলে। ব্যাট হাতে ঝলমলে ইনিংসের পর অধিনায়ক ডানকান ফ্লেচার বল হাতেও ছিলেন সরব, টপ ও মিডল অর্ডারের উইকেটগুলো তুলে প্রতিপক্ষকে কার্যত দুর্বল করে দিয়েছেন তিনি।

হেসেলসের ৭৬ এর পর , বাকিরা খুব বেশি অবদান রাখতে পারেননি বরং অনেক বল খেলে চাপ বাড়িয়ে রেখে গেছেন। তাই ১৬৮ রানের মাথায় ৬ষ্ঠ উইকেট হিসেবে অ্যালান বোর্ডার ফিরে যাবার পর রডনি মার্শের সর্বাত্মক চেষ্টাও কাজে দেয় নি। অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ২২৬/৭, ৬০ ওভার শেষে।

রডনি মার্শ ৪২ বলে ৫০ রান করে অপরাজিত থাকেন, হেসেলস করেন ১৩০ বলে ৭৬। ডানকান ফ্লেচার নেন চার উইকেট। বাটচারট ও কুরান একটি করে উইকেট নেন। জিম্বাবুয়ে ১৩ রানে ম্যাচটি জিতে নেয়। ফ্লেচার হন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। তখনকার একেবারেই নবীন জিম্বাবুয়ের অসিবধ কাব্য সে আসরের অন্যতম বড় অঘটন তা বলতেই হবে।

  • গ্রুপ পর্ব, কেনিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৯৬

টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে এরকম কিছুর কথা ভেবেছিল কি কেউ? ওয়েস্ট ইন্ডিজ আমুদে মেজাজ নিয়েই সেদিন কেনিয়ার বিরুদ্ধে নেমেছিল তাঁদের পয়েন্ট রক্ষা এবং নেট রানরেট আরেকটু বাড়িয়ে নিতে।

উদ্বোধনী ইনিংসে কেনিয়ানদের সংগ্রহ সবার অনুমিত ফলাফলকেই সমর্থন করছিল। কেনিয়ার ইনিংস শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৬৬ রানে, স্টিভ টিকোলো করেন সর্বোচ্চ ২৯। ছোট টার্গেটের জবাবে ব্যাটিংয়ে নামা ক্যারিবিয়ানদের ভাল শুরুর আশা থমকে দিল কেনিয়ান বোলারদের দুর্দান্ত বোলিং।

মুহুর্মুহু উইকেটপতনে ওয়ানডে ক্রিকেটের আদিরাজাদের ইজ্জতরক্ষাই মুখ্যচিন্তা হয়ে উঠে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না, ক্যারিবিয়ানরা মাত্র ৯৩ রানে গুটিয়ে গিয়ে ৭৩ রানে হেরে গিয়ে আসরের সবচেয়ে বড় অঘটনের শিকার হলো। সেদিন থেকেই যেন ক্যারিবিয়ান সাম্রাজ্যের সোনালী দিনের অলিখিত পতন ঘটতে শুরু করলো।

  • গ্রুপ পর্ব, শ্রীলঙ্কা বনাম কেনিয়া, ২০০৩

২০০৩ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচ। নাইরোবি জিমখানা গ্রাউন্ডে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মুখোমুখি সেই অঘটনঘটনপটিয়সী কেনিয়া এবার স্বাগতিক। ঘরের মাঠে হয়তো চমক দেখানোর অপেক্ষাতেই ছিল আফ্রিকার এই দারিদ্রপ্রবন দেশটির ক্রিকেটাররা।

প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামা কেনিয়া কেনেডি ওটিয়েনোর ১২২ বলে ৬০ রানের উপর ভর করে ৫০ ওভার শেষে নয় উইকেটে ২১০ রান স্কোরবোর্ডে জমা করে।

শ্রীলঙ্কা জবাব দিতে নেমে যেন হতচকিত হয়ে গেল, কেনিয়ানরা যেমন দুরন্ত বোলিং করছিল, তেমনি উড়ন্ত ফিল্ডিংও দেখাচ্ছিল। প্রতিটি ডেলিভারি, ফিল্ডিংয়ে মিশেছিল হার না মানা আক্রমণের সুর!

সাথে ঘরের মাঠে দর্শকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা, খেলোয়াড়দের মধ্যে যেন আরো অনুপ্রেরণা এনে দিল। ১৯৯৬-এর ক্যারিবিয়ানবধের সেই অঘটনের ম্যাচের সাক্ষী মার্টিন সুজি জ্বলে উঠলেন, জয়াসুরিয়াকে ফিরিয়ে জয়ের প্রথম সোপানে পা রাখলেন। তবে মূল কাজটি করেছিলেন অফ স্পিনার কলিনস ওবুইয়া, ২৪ রানে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে লংকান মিডল অর্ডার ধসিয়ে দিয়ে দলকে এনে দিয়ে ছিলেন জয়।

আরো একটি অঘটন দেখল ক্রিকেটবিশ্ব, তবে সেবার আরো বেশ কটি দলকে হারিয়ে দিয়ে সবার চোখ কপালে তুলে সেমিফাইনালে উঠে পড়েছিল কেনিয়া। কে জানে হয়তো সেবারের দুরন্ত ভারতের সামনে না পড়লে কোথায় গিয়ে থামত তাঁদের এই অবিশ্বাস্য পথচলা!

  • গ্রুপ পর্ব, আয়ারল্যান্ড বনাম পাকিস্তান, ২০০৭

এশিয়ার উপর যেন ভাগ্যদেবী বিরূপ হয়ে দেখা দিয়েছিলেন সেবার, নয়তো কি এশিয়ার দুই পরাশক্তি প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেয়! তাও আবার একদিনে!

১৭ মার্চ দিনের প্রথম ম্যাচে এক গ্রুপে পোর্ট অব স্পেনে বাংলাদেশ হারালো ভারতকে, আর দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে অন্য গ্রুপে জ্যামাইকার সাবিনা পার্কে পাকিস্তানকে হারালো আইরিশরা। প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামা পাক ব্যাটিং লাইনআপকে সম্মলিতভাবে প্রথম থেকে চেপে ধরে আইরিশ বোলিং আক্রমণ।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে হারাতে মাত্র ১৩২ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। কামরান আকমল সর্বোচ্চ ২৭ রান করেন। বয়েড রযাঙ্কিন নেন ৩ উইকেট, বাকি বোলাররা সবাই অন্তত একটি উইকেট নিয়েছিলেন।

নিল ও’ব্রায়েনের দুর্দান্ত ৭২ রানের ইনিংসে ১৩৩ রান চেজ করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি আইরিশদের। আজহার মাহমুদকে ছয় মেরে কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন অধিনায়ক ট্রেন্ট জনসন।

এটিও ক্রীড়ামোদীদের চমকে দেয়া দ্বিতীয় অঘটন ছিল আসরের। ম্যাচটি অন্য কারণেও সবার কাছে পরিচিত, এই ম্যাচ শেষেই কোচ বব উলমারকে মৃত অবস্থায় হোটেলরুমে উদ্ধার করা হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ আজও রহস্যাবৃত।

  • গ্রুপ পর্ব, ইংল্যান্ড বনাম আয়ারল্যান্ড, ২০১১ বিশ্বকাপ

ভারতের বিপক্ষে একটি নাটকীয় টাই হওয়ার পরে ইংল্যান্ডের পয়েন্ট টেবিলে সাম্যাবস্থা ফিরে পেতে পূর্ণ পয়েন্ট দরকার ছিল। তাই তাঁরা আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটির দিকে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত দেশটি যে এভাবে হতাশ করবে ইংরেজদের, তা কেইবা জানতো! প্রথমে ব্যাট করা ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপ চেন্নাইয়ের চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের পাটা পিচে স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩২৭ রান সংগ্রহ করে ফেলে, যার জবাব দেয়া আইরিশদের কাছে পাহাড় আরোহণের সমান।

ব্যাটিংয়ে নেমে ১১১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেললে আয়ারল্যান্ডের জন্য কাজটি আরো কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু ক্রিজে থাকা ব্রায়ান ব্রাদার্সের কনিষ্ঠতম কেভিন ও’ব্রায়েন যেন মিরাকল ঘটাতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন । কুসাককে সঙ্গে নিয়ে অবিশ্বাস্য ১৬২ রানের জুটি গড়ে দলের জয়ের পথ সুগম করেন। নিজেও করেন আসরের দ্রুততম সেঞ্চুরি। তারপর মুরে মারকাটারি ফিনিশিং দিলে প্রথমবারের মত আইরিশরা ইংরেজ পরাভূত করার স্বাদ পায়। এত রান তাড়া করে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আয়ারল্যান্ড আসরের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।