সৌন্দর্য্যে বিশ্বজয়ী পার্বতী, নন্দিনী কখনো বা বিনোদিনী!

শত শত ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট জ্বলে উঠছে ক্লান্তিহীনভাবে। একটু সামনেই, ঝকঝকে লাল গালিচাটা বিছানো। উৎসবমূখর পরিবেশে দেশ বিদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের নানান পরিচিত মুখের আনাগোনা এই কান ফেস্টিভ্যালে নিয়মিত। বহু সুন্দরী অভিনেত্রীদের ভিড়েই, হৃদয় কেড়ে নেয়া সৌন্দর্যের আভা নিয়ে একজনের আগমন সেই ভারত থেকে। লাল গালিচায় পা রাখার সাথে সাথেই, ক্যামেরাগুলো ঘুরতে শুরু করেছে তাঁকে লক্ষ্য করে। হাত উঁচু করে সে দাঁড়িয়ে আছেন,আর পরনে বৈচিত্র্যময়ী সুন্দর জামাটি দেখলেই মনে হয় অন্য কেউ থাকলে যেন একদমই হতো বেমানান, হঠাৎ করেই তার পক্ষ থেকে ছুড়ে দেয়া হলো হাসিমুখে এক উড়ন্ত চুমু।

সাল ২০০২ থেকেই কান উৎসব হতে শুরু করে পুরো বিশ্ববাসী স্বাক্ষী হয়ে রইছে বলিউড এই সুন্দরীর লাল গালিচায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধমাখা সেই হাসির। অভিনয়গুণে সকলের হৃদয়ে স্থান করে নেয়া সেই হাসিটা শুধু যে একজনের হতে পারে, তিনি সৌন্দর্যে বিশ্বজয় করা করা রূপবতী ঐশ্বরিয়া রায়!

কর্ণাটকের মঙ্গালুরুতে জন্ম। আরিয়া বিদ্যামন্দির হাইস্কুল, জয়হিন্দ কলেজ, কিংবা মাটুঙ্গার ডিজি রূপারেল কলেজ – সবখানেই পরিচয়টা মেধাবী ছাত্রী হিসেবেই। উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলটা ছিল ৯০ শতাংশেরও বেশি। মা-বাবা ভ্রিন্দা ও কৃষ্ণারাজ চাইতেন দুটি সন্তানই তাদের নিজের ইচ্ছেকেই প্রাধন্য দিক। সঙ্গীত ও নৃত্যের প্রতি আগ্রহর কারণে ঐশ্বরিয়া ৫ বছরের হাতেখড়িও করেছেন।

ভাই আদিত্য রায় যেখানে ইঞ্জিনিয়ার হবার ইচ্ছে প্রকাশ করলো, সেখানে ঐশ্ব্যরিয়ার ছোট্ট মনে প্রাণীবিদ্যা নিয়ে পড়ার ইচ্ছে দমন হয়ে উঁকি দিয়েছিলো ‘স্থপতি’ হবার বাসনা। তবে একটি পর্যায়ে এই বাসনা আর টিকেনি। রচনা সংসদ একাডেমি অব আর্কিটেকচারে কিছু সময় পার করার পরই সে ইচ্ছেকে আর ধরে রাখা যায়নি। মন তখন ছুটে চলতে চায় মডেলিংয়ের দিকে!

সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির সেরা জীবের মাঝেও উপহার দিয়ে গড়ে তুলেছেন বহুজনকে সৌন্দর্যের উদাহরণ হিসেবে। ঐশ্বরিয়া রায় যেন তারই একটি প্রতিক। ছোট্টবেলার সেই মায়াবী মুখখানিই যে কবে, রূপবতীর রূপের অলংকার হয়ে গেলো, বোঝাই যায়নি! তবে যখন ঠিক বুঝতে পেরেছে নিজের গুণকে লক্ষ্য হিসেবে, তখন বয়স কুড়ি পেরিয়ে একুশে! সাল তখন ১৯৯৪।

মিস ইন্ডিয়ায় ২য় স্থান অর্জন করে বহুদিনের যাত্রা পেরিয়ে, মিস ওয়ার্ল্ডের চূড়ান্ত মঞ্চে এসে থমকে গিয়েছে ফলাফল। সান সিটির ফাইনালের মঞ্চে, এই সেরাদের থেকেই একজন হবে সর্বসেরা। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরীদের মাঝে, যখন মাইক্রোফোনে ফুটে উঠলো ‘ভারত থেকে ঐশ্ব্যরিয়া রায়’, তখন চারদিকে শুধু আতশবাজি আর করতালির শব্দ। বিজয়ী সেই মেয়েটির আনন্দে দিশেহারা দেখেই ভারতবাসী মেতে উঠেছিলো, রূপের মুগ্ধতায় মুগ্ধ তখন পুরো বিশ্ববাসী। মাথার মুকুটটি ছিনিয়ে নামের পাশে বিশ্বসুন্দরীর তকমা নিয়েই সবার প্রিয় হয়ে ওঠার এক সূচনা করে নিলেন ঐশ্বরিয়া রায়।

এক বিজ্ঞাপন থেকে আরেক বিজ্ঞাপন, জনপ্রিয়তা বেড়েই যাচ্ছে। বড়পর্দায় আগমনের অপেক্ষা। হাতের কাছেই সিনেমার প্রস্তাব আর প্রস্তাব। খুব ভেবে চিন্তে বাছাই করে অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান গুণী পরিচালক মনিরত্নমের তামিল ‘ইরুভার’ দিয়ে ১৯৯৭-এ। ঐবছরই বলিউডে যাত্রা শুরু
‘অওর পেয়ার হো গায়া’র মাধ্যমে। কিন্তু বানিজ্যিক সফলতাটা এনে দেয় ১৯৯৮ ‘জিন্স’ এর মতো তামিল রোমান্টিক ড্রামাই। ঋষি কাপুর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘আ আব লওট চালে’- ও তেমন সফলতার মুখ দেখেনি।

বিশ্বসুন্দরীর রূপের রাজকীয়তার আবির্ভাব করতে পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভানসালীর পক্ষ হতে একটি প্রস্তাব এসে পরে। সিনেমার নাম ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’। নায়ক, নন্দিনীর লম্বা চুলের বেণী ধরে মন কেড়ে নিয়েছিলো সিনেমার মাঝে। সেই সাথেই পরিচালকের ‘ওকে শর্ট ডান’ বলার পর অফ ক্যামেরাতেও সালমান-ঐশ্বরিয়ার মন দেয়া-নেয়ার খুনসুটি কিন্তু কারো আড়ালেই থাকেনি।

বছর শেষে এ সিনেমাই ফিল্মফেয়ারের ব্ল্যাকলেডিকে চুমু দিতে সহায়তা করেছে। যদিও তিনি এবছরই ‘তাল’ এর সাথে তাল মিলিয়ে পুরোদমে সফল বলা যায়। পরবর্তীতে যশ রাজ সাহেবের ‘মোহাব্বাতে’র মাঝে মৃত্যুর কাছে ঢলে পড়েও ক্ষনে ক্ষনে ভালোবেসে নায়ক শাহরুখের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে = ‘এই ভালোবাসা কেমন হয়?’

মাঝে বহু সফল-অসফলের পর, আবার সেই সঞ্জয় লীলা বনসালীর ডাক। ‘দেবদাস’ এর পার্বতীর প্রস্তাব। ঐশ্বরিয়া অভিনয় করলেন। রূপ ও অভিনয়ের মায়ায় জড়িয়ে সবাইকে বলতে বাধ্য করলেন এ যেন শরৎবাবুর কলমে গড়া পার্বতী-ই! ভূয়সী প্রশংসার সাথেই সেরা অভিনেত্রী হিসেবে ফিল্মফেয়ার নিজের করে নিলেন।

২০০৩ এ মায়ের লেখা গল্পে ও ভাইয়ের প্রযোজনায় করলেন ‘দিল কা রিশতা’। রোহান সিপ্পির ‘কুছ না কাহো’ তে অভিষেক বচ্চনের সাথে জুটি হিসেবে করলেন। বচ্চন পূত্র তখন তার রূপে মোহিত হতে শুরু করেছিলেন মাত্র।

বাংলার মাটিতে ঘুরে এলেন সে বছরই। বিশ্বকবির গল্পে এবার বিশ্বসুন্দরী। রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’-তে হাজির করলেন আরেক গুণী পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ। বিনোদীনি হিসেবে চমক দিলেন ঐশ্বরিয়া খুব সুন্দর ভাবেই। পরবর্তীতে ‘খাকি’তে এসে নায়ককে ধোঁকা দিয়ে মেইনস্ট্রিম হিন্দিতে আবার আগমন।

ক্যারিয়ারের আগে-পরে পুরোটা জুড়েই ‘জোশ’, ‘রেইনকোট’, ‘ধুম টু’, ‘উমরাওজান’, ‘গুরু’, ‘যোধা আকবর’, ‘রাব ‘, ‘অ্যাকশন রিপ্লে’, ‘সরকার রাজ’ সহ বহু সিনেমায় মনে রাখার মতোন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘হাম তুমহারে হ্যায় সানাম’, ‘মেলা’, ‘বান্টি অর বাবলি’, ‘শক্তি’র মতো সিনেমাগুলোতে ক্যামিও বা ‘কাজরা রে’, ‘ইশক কামিনা’র মতো আইটেম গান রয়েছে তার।

জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন সংস্থার দূত হিসেবে কাজ করছেন। দৌলতপুরের মতো উত্তপ্রদেশের ছোট্ট গ্রামে শিক্ষায় সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের জন্য স্কুল নির্মাণ করা তার বিভিন্ন সামাজিক সেবার সহায়তায় এগিয়ে আসার উদাহরণ মাত্র।

বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ডের, পণ্যের অ্যাম্বাসেডর বা মডেল হয়ে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছেন কিন্তু সবার প্রিয় ‘এ্যাশ’ই। একমাত্র তিনিই পেপসি ও কোকাকোলার হয়ে কাজ করতে পেরেছেন একইসাথে। ল্যাকমে, লরিয়াল প্যারিস সহ নানান পণ্যের লাকি চার্ম তিনি। লাক্স কন্যা বলতেই যেন তার হাসিমুখ স্বরণে আসে। ‘মাদাম ত্যুসো মিউজিয়াম’-এ ঠাঁই করে নিয়েছে তার মোমের মূর্তি। দু’বার ফিল্মফেয়ার, ভারত সরকার থেকে পদশ্রী সম্মাননাসহ, বহু পুরষ্কার ও সম্মাননা নিজের করেছেন।

হলিউডের বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘প্রোভোকড’ বা ‘পিংক প্যান্থার’ – কাজগুলোর আগ্রহই কি বলিউড থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গেলো কিনা তা জানা নেই, তবে সুপারস্টার লেডির তকমা হাতছাড়া হয়েছে অমনোযোগীতার কারণেই।

বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে মনমালিন্য সৃষ্টি হয়েছিলো আমির খানের সাথে। যদিও এখন ভালো বন্ধু। সালমান খানের সাথে সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে নাটকীয়তা গড়ে তুলেছিলো। সালমান,বিবেক ওবেরয় সহ জানা অজানা বহু অভিনেতাই হয়তো তাকে না পেয়ে নিজের মনকে স্বান্তনা দিয়েছে দিনশেষে, আর সবার আফসোসের সুর কিন্তু এখনও স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

কাজের ফাঁকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন যাকে, তিনি অভিষেক বচ্চন। বলিউডের অ্যাংরি ইয়াং ম্যানের পূত্রবধুর পরিচয়টা ২০০৭ সালে হয়ে যায় তখন ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন।

‘জাজবা’ দিয়ে ফিরে এলেও সিনেমায় স্থায়ী হচ্ছেন না তেমন। ‘সার্বজিত’-এ দুর্দান্ত কাজ করেছেন। ‘অ্যায় দিল হ্যা মুশকিল’-এ ভালো করলেও, সর্বশেষ ‘ফ্যানি খান’ গিয়েছে ফ্লপের তালিকায়। কম সংখ্যক কাজ করার পেছনে কারণ হতে পারে, সংসার ও একমাত্র কন্যাসন্তান আরাধিয়া বচ্চনকে নিয়ে ব্যস্ততাই।

তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, রূপের জাদুকরী, অভিনয়ের কারিগরি দিয়ে বিভিন্ন অভিনেতা কিংবা হাজারো সাধারণ তরুণ, যুবকের হৃদয়ে ঝড় তোলা বিশ্বসুন্দরীর তকমা পাওয়া অভিনেত্রীটির মায়া এমনভাবেই ছড়িয়েছে সময়ে সময়ে যে, রবি ঠাকুরের বিনোদিনী হোক কিংবা শরৎবাবুর পার্বতী, চোখ বুঝলেই রূপের ঝলক ছুঁয়ে যায় ঐশ্বরিয়া রায়ের স্থীরচিত্র।

ঐশ্বরিয়া রায়

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।