অমিতাভ বচ্চন: শাহেনশাহ’র উত্থান-পতন ও প্রত্যাবর্তন

‘পরিবর্তন জীবনের একটা নিয়ম, কিন্তু চ্যালেঞ্জ জীবনের লক্ষ্য। সুতরাং সর্বদা পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করো। চ্যালেঞ্জকে পরিবর্তন করো না।’

– অমিতাভ বচ্চন

  • সুচনা লগ্নের যুদ্ধ

দুটো জিনিস স্বপ্নের জগতে প্রবেশের মুখেই তাকে বাঁধাগ্রস্ত করেছিল। একটি তারঁ উচ্চতা ও ছিপছিপে গড়ন, অন্যটি তার গলার স্বর। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি হওয়ার ফলে চলচ্চিত্র নির্মাতারা অনায়াসেই তার মুখের ওপর ‘না’ বলে দিচ্ছিলেন। কেউই তাঁর ওপর সামান্যতম ভরসা রাখতে পারছিলেন না। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একটি ভয়েস অডিশন দিয়েছিলেন; লাভ হয়নি, বরাবরের মতোই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন।

বলছি অমিতাভ বচ্চনের কথা, তিনি ‘বিগ বি’, বলিউডের ‘শাহেনশাহ’। সত্তরের দশকের  ‘অ্যাংরি ইয়াং হিরো’। এত প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও তিনি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সেই স্থানটা আজো ধরে রেখেছেন, যার স্বপ্ন সবাই দেখেন কিন্তু কেউই ছুঁতে পারেন না। তাঁর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কেই বা হতে পারে!

  • রুপালি রিলের শাহেনহাশ

১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ নামক ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন, যদিও ছবিটি ওই অর্থে বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, তবুও তিনি এই ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেতা হিসেবে তাঁর প্রথম জাতীয় পুরস্কার জিতে নেন। যদিও, আরেকটি বড় সুযোগের জন্য তাকে আরও দুই বছর সংগ্রাম করতে হলো। এরপর ‘আনন্দ’, ‘জাঞ্জির’ নামে দুটো সিনেমা তার চলচ্চিত্র জীবনে একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসে। রাতারাতি সাফল্যের মই তার পায়ে এসে ধরা দিলো, তিনি ক্রমাগত মই বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন।

যাই হোক, জীবন কিন্তু মোটেও পুষ্পশয্যার নয়। ১৯৮২ সালে একবার অমিতাভের প্রায় মৃত্যুর অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হলো। ‘কুলি’ সিনেমার শুটিং-সেটে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর ডাক্তার ও তার পরিবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু ভক্তদের প্রার্থনা-ই সম্ভবত তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। কিছুদিন পর ম্যাস্থেনিয়া গ্রাভিস নামক জটিল রোগ তাকে আঁকড়ে ধরে, যেটা মানুষকে খুবই দুর্বল করে দেয় কিন্তু তিনি এটিও কাটিয়ে উঠলেন।

  •  পতন থেকে প্রত্যাবর্তন

৫৭ বছর বয়সে তার জীবনে অন্য একটি বড় দুর্যোগ নেমে আসে। ২০০০ সালে যখন তাঁর ছবিগুলো বক্স অফিসে ফ্লপ হচ্ছিলো, তখন তিনি তার জীবনের আরেকটি বড় আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন, যেখানে তিনি প্রায় সবকিছুই হারিয়ে ফেলেন। এই ধরনের পরিস্থিতি এবং বারবার অবনতির পর যে কেউ এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হারাতে পারেন।

কিন্তু, শাহেনশাহ ঠিকই ফিরে আসেন। টিভি শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ এবং ‘মহব্বতে’ ছবির মাধ্যমে একটি নতুন জীবনের সূচনা করেন। একজন সিলভার স্ক্রিন সুপারস্টারের টিভি শো করা নিয়ে যখন তার স্ত্রী জয়া বচ্চনও কিছুটা উপহাস করতে লাগলেন, যখন তিনি বলেছিলেন, ‘ভিক্ষুকদের এত বাছবিচার করার সুযোগ কোথায়!’

  • জীবনের জন্য শিক্ষা

অমিতাভ একবার বলেছিলেন, ‘দূর্ভাগ্য হয় তোমাকে ধ্বংস করবে নয়তো বাস্তবিকভাবে তুমি যেমন তোমাকে তেমনি গড়ে তুলবে।’

কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও দৃঢ় সংকল্প-ই তার মূলমন্ত্র, যেখানে আগের দিনগুলোতে উচ্চতা ও কণ্ঠের কারণে তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। অথচ, আজ এসব গুণের কারণেই তিনি অসীম সাফল্য ও গৌরবের অধিকারী!

তিনি তার ব্যর্থতাকে মেনে নেন এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাগুলো মোকাবেলা করেন। যা তাকে সামনে এগুতে সাহায্য করে। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘যা হয়েছে তা তো হয়েই গেছে! আমি কেবল এটা মনে রাখি যে, আমার এখন অতীতের ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।’

তার থেকে যা শেখা উচিত, যদি আমরা অতীত বিষয়ে ভাবি তাহলে সীমাবদ্ধতার জালে আটকা পড়বো এবং হতাশা আমাদের ঘিরে ধরবে। এই অবস্থায় যদি এটা আমরা মেনে নিই তাহলে সেই জাল থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবো। সুতরাংএভাবেই আমরা ফিরে আসতেপারি এবং ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করে সংশোধনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।

একজন ব্যক্তির জীবনযাত্রায় ব্যক্তিগত এবং পেশাদার জীবনে বারবার অন্ধকার থেকে ফিরে আসার এক আদর্শ উদাহরণ হলেন অমিতাভ। এখনো তিনি সংগ্রাম করে চলছেন, তাই তিনি যেকোনো পেশার মানুষের জন্যই একটি নিখুঁত মডেল। আর যে চলচ্চিত্র তারকা হতে চায় শুধু তাঁর জন্য তো তাকে অনুসরণ না করে কোনো উপায়ই নেই!

বচ্চন সাহেবের ক্যারিয়ারের স্ট্রাগল নিয়ে রীতিমত উপন্যাস অবধি লেখা যাবে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও তাই। এক জীবনে এতবার যুদ্ধ করা যায় না। বিগ ‘বি’ হওয়া তাই মুখের কথা নয়। সবাই তাই তাঁকে ছুঁতে পারে না, কেবল তাঁর মত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।