বিবেকের উত্থান পতন ও বলিউডের কানাগলি

বিবেক ওবেরয়ের বলিউডে আবির্ভাবে প্রচলিত ঘরানার চিত্তাকর্ষক কোনো ব্যাপার ছিল না। সুন্দরী নায়িকাদের বিপরীতে রোম্যান্টিক গান তিনি এড়িয়েই চলতেন। হাওয়াই মিঠাই হাতে গাছ লাতাপাতার চারপাশে তিনি নাচানাচি করতেন না। বিবেক ক্যারিয়ারে ওপরে ওঠার জন্য কঠিন সিঁড়িটাই বেছে নিয়েছিলে। সেই সিঁড়ির নাম অভিনয়।

আর সেই সিঁড়ি মুহূর্তে মধ্যেই তাঁকে চূড়ায় তুলে দিয়েছিল। ‘কোম্পানি’, ‘সাথিয়া’, ‘যুব’র মত সিনেমা একটা সময় করলেও ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত পতনও দেখেছেন বিবেক। সেই পতনের ঝাপটা সামলে আবারো এগোবার পথ খুঁজে পাওয়া বাকিদের জন্য কষ্টকর হলেও বিবেকের জন্য নয়। কারণ, তিনি তো অভিনয় জানেন। কিন্তু, বলিউডে তো অভিনয় জানাটাই শেষ কথা নয়!

বিবেকের বলিউডে যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে। রাম গোপাল ভার্মার ‘কোম্পানি’ সিনেমা দিয়ে তিনি ফিল্মফেয়ারে সেরা নবাগত অভিতোর পুরস্কার জিতে নেন। সিনেমাটিতে গ্যাঙস্টারের চরিত্র করেছিলেন বিবেক। আর এই ঘরানায় তিনি এতটাই দক্ষতার পরিচয় দেন যে তিনি পরবর্তীতে ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’ ও ‘রাখত চারিত্রা’তেও গ্যাঙস্টারের চরিত্রে ছিলেন বিবেক।

বিবেক ‍শুধু গ্যাঙস্টার জনরাতেই নয়, অন্য জনরাগুলোতেও সাফল্য পেয়েছেন। তিনি রোম্যান্টিক সিনেমা ‘সাথিয়া’, হরর সিনেমা ‘কাল’ ও ‘ডারনা মানা হ্যায়’, কমেডি ‘মাস্তি’ ও ‘গ্র্যান্ড মাস্তি’ ও রাজনৈতিক থ্রিলার ‘যুব’-তে সুনাম কুড়িয়ছেন।

বিবেক এতটাই সব্যসাচী একজন অভিনেতা যে তাকে রীতিমত হলিউড থেকে ডাবিংয়ের প্রস্তাব করা হয়। সিনেমাটি ছিল ‘দ্য অ্যামাজিং স্পাইডারম্যান ২’। ক্যারিয়ারে তখন এতটাই ছন্দ ছিল যে, মনে করা হত খানদের রাজত্ব শেষে বিবেকই হবেন ‘দ্য নেক্সট বিগ থিঙ’।

বিবেক ওবেরয় সম্পর্কে যেকোনো লেখায় সালমান খান ও ঐশ্বরিয়া রায়ের কথা আসতে বাধ্য। ভাইজান ও সাবেক বিশ্বসুন্দরীর মধ্যে তখন অনেক জল ঘোলার পর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ঐশ্বরিয়ার জীবনে তখন আসেন বিবেক।

রীতিমত একটা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে সালমান খানের বিরুদ্ধে বলেছিলেন বিবেক ওবেরয়। তিনি বলেছিলেন, তাদের সম্পর্কে অ্যাশের সাবেক প্রেমিক সালমান বাঁধার সৃষ্টি করছেন। এরপর ইন্ডাস্ট্রি থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করেন বিবেক। এরপর অনেকবার সালমান খানের কাছে ক্ষমা চাইলেও এখনো দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের জট খোলেনি। ইন্ডাস্ট্রিতে খানদের সাথে গণ্ডগোল বাঁধালে যা হয় আর কি!

বিবেকের বাবা অভিনেতা সুরেশ ওবেরয়। মা হলেন যশোধারা ওবেরয়। মায়ের নামে বিবেক একটা দাতব্য সংস্থা চালান। ব্যবসায়ী বিবেকের প্রতিষ্ঠান কেএআরআরএম ইনফ্রাস্ট্রাকচার শহীদদের কল্যানে ২৫ টি ফ্ল্যাট দান করেছে। বিবেকের হাউজিং স্কিমের সুবাদে এখন মহারাষ্ট্রের সাহাপুরে ১৫ হাজার পরিবার স্বল্পমূল্যে নিজেদের ফ্ল্যাট কিনতে পারছে।

অ্যাসিডদগ্ধ ললিতা বেনবাসির বিয়েতে বিবেক একটি ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে বিবেকের বাবা-মা বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও ক্যান্সার রোগীদের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছেন। বিবেক নিজেও তাঁদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। বৃন্দাবনে তিনি একটা স্কুল চালান, যেখানে কেবল গৃহহীন মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

বলা যায়, বলিউডে বিবেকের ক্যারিয়ারটা একরকম থমকেই আছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ‘গ্রেট গ্র্যান্ড মাস্তি’ ও ‘ব্যাংক চোর’ সিনেমায় অভিনয় করেন। সাফল্য আসেনি। এরও তিন বছর আগে তাঁকে দেখা গেছে ‘কৃশ ৩’ ও ‘গ্র্যান্ড মাস্তি’ সিনেমায়। যদিও, ২০১৭ সালের ওয়েব সিরিজ ‘ইনসাইড এজ’-এ বিবেক নিজের অভিনয় সামর্থ্যের সেরা প্রয়োগটাই ঘটিয়েছিলেন নেতিবাচক চরিত্রে।

তবে, বিবেক এখন দক্ষিণী সিনেমার নিয়মিত মুখ। ২০১৭ সালে তামিল সিনেমা ‘বিবেগাম’-এ জুটি বেঁধেছিলেন অজিত কুমারের সাথে। মালায়ালাম সিনেমা ‘লুসিফার’ মুক্তি পাবে ২০১৯ সালে। এছাড়া এই বছরই কান্নাড়ার নিজের অভিষেক সিনেমা ‘রুস্তম’-এ পুলিশের চরিত্রে আবির্ভূত হবেন তিনি।

সম্প্রতি তিনি বড় একটি তেলেগু সিনেমায় কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এখানেও তিনি ভিলেন। সাথে আছেন রাম চরণ ও কিয়ারা আদভানি। পরিচালানা করবেন বোয়াপাতি শ্রীনু। কে জানে, দক্ষিণী সিনেমায় কাজ করতে করতেই হয়তো একদিন বলিউডে হারানো জায়গাটাও ফিরে পাবেন বিবেক!

বিবেক সম্প্রতি রাজনীতিবিদ নরেন্দ্র মোদির বায়োপিকের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। নি:সন্দেহে এটা তাঁর জন্য বড় সুযোগ, বলিউডে টিকে থাকার শেষ লাইফলাইনও বটে।

বিবেকের চোখে জীবনের যেকোনো সমস্যা একজন মানুষকে দুই ভাবে মোকাবেলা করতে পারে – হয় শক্ত থেকে সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করো, না হয় সমস্যাগুলোকেই জীবনটা নষ্ট করতে দাও। বিবেক প্রথম পথটা গ্রহণ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আপনার যদি ক্ষমতা থাকে তাহলে মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলেন, যাতে করে সবার উপকার হয়। আমার পরিবার আমাকে এই শিক্ষাটা দিয়েছে। হ্যা, কখনো কখনো খুবই ভেঙে পড়তাম। তবে, হাল ছেড়ে না দিয়ে আমি নিজেকে শক্ত রেখেছি। যেকোনো সমস্যায় আপনি চাইলে শক্ত থেকে মোকাবেলা করতে পারেন, চাইলে সমস্যাগুলোকে আপনার জীবনকে গ্রাস করতে দিতে পারেন। আমি প্রথম পথে হেঁটেছি, নিজেকে শক্ত রেখেছি।’

এই শক্ত থাকার মানে অবশ্য এই না যে বিবেকের ক্যারিয়ারে কোনো আক্ষেপ নেই। আক্ষেপ আছে, আক্ষেপ আছে ইন্ডাস্ট্রির গ্রুপিং নিয়েও। তিনি বলেন, ‘সাফল্য বা ব্যর্থতা যাই আসুক না কেন, আমি কখনো ইন্ডাস্ট্রি ছাড়তে চাইনি। তবে, ক্যারিয়ারের একটা সময় মনে হত আমি স্রেফ পরিস্থিতির শিকার। আমি পরিস্থিতির শিকার হয়েছি, কারণ আমি কোনো নির্দিষ্ট লবির অধীনে ছিলাম না, অন্য কারো ছাতার নিচে কখনোই আমি নিজেকে সপে দেইনি। আমি নিজের আলাদা একটা অস্তিত্ব গড়তে চেয়েছিলাম, সেজন্যই আমি পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। ইন্ডাস্ট্রিতে এত গ্রুপিং থাকলে এসব তো হবেই। এখানে যখন যে ক্ষমতায় থাকবে সে চাইলে আপনার ক্যারিয়ারকে ধসিয়ে দিতে পারবে। ব্যাপারটা খুবই দু:খজনক।’

তবে, ইন্ডাস্ট্রির ভাল দিকটাও অস্বীকার করছেন না তিনি। বরাবরই স্মরণ করেন নিজের বিপদের বন্ধুদের কথা, ‘ইন্ডাস্ট্রিতে আমার অনেক বন্ধু আছেন, যাদের সমর্থকন আমি পেয়েছি। যেমন হৃত্বিক (রোশন), আমার যেকোনো বিপদে ওকে আমি পাশে পাবো। আক্কি (অক্ষয় কুমার) ও অজয়রাও (অজয় দেবগন) আমার পাশে থাকে। তাই এই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে যখন কথা বলবো, তখন মানতেই হবে এখানে যতটুকু অসততা ও নেতিবাচকতা আছে, তাঁর দ্বিগুণ পরিমান ইতিবাচকতাও আছে।’

– কইমই ও স্টারডাস্ট অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।