ফিনিক্স পাখি হয়ে ফিরে আসা রাজা

অপয়া নাকি ফিনিক্স?

বাংলা সিনেমার বদৌলতে সবচেয়ে বেশি বার শোনা এই শব্দটার সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। সেটার আর মর্মার্থ উদ্ধার করার দিকে না গিয়ে একটু টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির দিকে যাই যেখানে ওই অন্যতম সুদর্শন ও অভিনয় সমৃদ্ধ অভিনেতাকে একটা সময় এই অপবাদটা বেশি শুনতে হতো। অথচ তার লাস্ট কয়েক বছরের সিনেমার নাম গুলো নিলে ভ্যাবাচ্যাকা খেতে বাধ্য । অন্তত আপনি নিজেকেই বলতে বাধ্য হবেন কেন তাকে এই ‘অপয়া’ বলা হতো!

এই বছর এই অপয়া ছেলেটার হাতে এখন একাধারে বাংলা ( ঘরে বাইরে, ঊমা, এক যে ছিলো রাজা, মুখোমুখি, বসু পরিবার), হিন্দী( কঙ্গনার সাথে মণিকর্ণিকা, মহেশ মাঞ্জেকারের সাথে দেবীদাস ঠাকুর), তেলেগু ( এন.টি.আর এর বায়োপিক) সিনেমা রয়েছে। কাছের বা দূরের অনেকেই এখন বলছে, ‘ইয়ে সাল তো তেরা হ্যায়। হিন্দি, বাংলা, তেলেগু সবেতেই আছিস।’

অথচ একটা সময় কিন্তু সে এমন ছিলো না। ২০১৪ সালে সৃজিত যখন তাকে ‘জাতিস্মর’ সিনেমায় কাস্ট করেন তখন অনেকেই বলাবলি করেছেন যীশু তো অপয়া অভিনেতা ওকে নিলে সিনেমা শেষ। অথচ এরপর সৃজিতের করা নয়টি সিনেমার ছয়টি তেই ছিলেন এই যীশু। জুলফিকারের ভিলেন, উমাতে লিড রোলে বাবার চরিত্র, এবং শেষে এক যে ছিলো রাজা’তে নাম ভুমিকায় অভিনয় করেছেন টালিগঞ্জের এক সময়ের অনেকটাই অবাঞ্ছিত অভিনেতা। এটাকেই হয়তো ফিনিক্স পাখির প্রত্যাবর্তন।

কাজ ও নিজের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বলেন ‘আসলে জীবনকে কোন দিনও সিরিয়াসলি নেইনি। কাজটা ভালো করে করতে চাই। মেয়েদের ভালো করে মানুষ করতে চাই। আমি ভগবানে বিশ্বাস করি না হলে আমার ক্যারিয়ার এভাবে ফিরে আসার কথাই নয়। যে সব জঘন্য সিনেমা করেছি, কোনটাই অস্বীকার করি না। আমার সঙে যখন যারা ক্যারিয়ার শুরু করেছিলো, তারা আজ কোথায়! আমি ঋতুপর্ন ঘোষের ‘চিত্রাঙ্গদা’ করেছি, আবার যাত্রাও করেছি । সত্যি বলতে কি নিজের কাজটা করে গেলে আপনি একদিন না একদিন তার দাম পাবেনই। নিজেকে দিয়ে সেটা বুঝতে পারি।’

বাংলা চলচিত্রের অভিনেতা উজ্জল সেনগুপ্তের ছেলে হয়ে কি আর পড়াশোনা শেষ করে চাকুরী করবেন! তা কি করে হয়? সেটা হওয়ারও নয়, তাই অন্যসব বাদ দিয়ে চলে এলেন নিজের চলচিত্র দুনিয়ায়। শুরুটা করেছিলেন তিনি দূরদর্শনের সিরিয়াল ‘মহাপ্রভু’ তে অভিনয়ের মাধ্যমে এরপর সিলভার স্ক্রীনে আসেন পরিচালক দীনেন সেনগুপ্তের ‘প্রিয়জন’ সিনেমা দিয়ে।

যদিও সেই সিনেমা সমালোচক বা ব্যবসায়িক সাফল্য কোনটাই দিতে পারে নাই। অথচ অভিনয় জীবনের শুরুর দিকেই কাজ করেছেন অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ন ঘোষের সাথে কিন্তু ওই যে ব্যবসায়িক সাফল্য আসেনি সেভাবে। যেখানে ব্যবসায়িক সাফল্যই শেষ কথা সেখানে তিনি ব্রাত্য হয়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক।

মজার ব্যাপার কি জানেন? তার প্রথম ব্যবসায়িক সফল সিনেমা ছিলো বাংলাদেশের ‘মনের মাঝে তুমি’। তবে এই ছেলেটা কাজ করতে ভালোবাসতো তাই কোন কাজকেই তিনি ছোট করে দেখেননি। নিজের মতো করে কাজের যতটুকু পেয়েছেন তাতেই তার সবটুকু দিয়ে করে যেতেন। নায়কোচিত সব কিছু থাকার পরও কেন জানি যীশুকে কেউ লিড রোলে নিতে চাইতো না।

অভিনয় পারে ছেলেটা কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। শুরু করলেন সাপোর্টিং ক্যারেক্টার প্লে করা, কমেডি সিনেমা করা। এর মধ্যে বলিউডে অভিষেক হয়ে যায় শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত নেতাজীর বায়োপিকে। তারপরেও কেনো যেনো কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না।

এরই মধ্যে ভালোবেসে বিয়ে করেন নীলাঞ্জনাকে। নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের ও ভালো বন্ধু মনে করেন তিনি নীলাঞ্জনাকে। এইতো এক যে ছিলো রাজা সিনেমার লুকের জন্য সৃজিতের সাথে ঝগড়া! হচ্ছিলো যীশুর। লুকটা কেমন হবে, কিভাবে হবে এইসব নিয়ে । সৃজিত আর যীশু – এই দুই বন্ধুর ঝগড়া! কে থামায় বা মিলমিশ করে দেয় জানেন? যীশুর বৌ নীলাঞ্জনা। যা দেখে মাঝে মাঝেই সৃজিত খোঁচা দিয়ে বলে ‘তোদের দেখে বিয়ে করতে ইচ্ছে হয়।’

তাদের সম্পর্কটা কেমন সেটা না হয় যীশুর মুখেই শোনা যাক ‘নীলাঞ্জনা বা মেয়েরা যখন জিজ্ঞেস করে কবে ফিরছি, ওইটা খুব ধাক্কা দেয়। তবে ওরা জানে আমি কতটা ব্যস্ত। কিন্তু তা-ও একটা প্রত্যাশা থাকে।’ নীলাঞ্জনা বলে, ‘গুড লুকিং হাজ়ব্যান্ড থাকলে কী সমস্যা হয়, সেটা তুমি বুঝবে না।’ আর হাজ়ব্যান্ড যদি অভিনেতা হয়, তা হলে তো হয়ে গেল! তবে বিয়ের চৌদ্দ বছর পরেও যদি এটা থাকে, ভাল তো।’

ইন্ডাস্ট্রিতে লোকে বলে, যীশু ভয় পায় নীলাঞ্জনাকে। ওটা কিন্তু ভয় নয়, রেসপেক্ট। বন্ধুদের সঙ্গে যে ভাবে মিশি, সেখানে হুট করে নীলাঞ্জনা চলে এলে আমি সংযত হয়ে যাই। লোকে এটাকে ভয় ভাবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকলেই সম্পর্ক ভাল থাকে। এমন কত বার হয়েছে, নীলাঞ্জনা কোনও মেয়েকে দেখিয়ে বলেছে, ‘দ্যাখো, কী ভাল দেখতে’। আমি দেখে ভাল বললে আবার বলেছে, ‘হয়েছে এ বার চলো’। ওর এই অধিকারবোধটা আমার ভাল লাগে। সব পুরুষই চায়, বউ একটু পজ়েসিভ হোক। তবে হ্যাঁ, পজ়েসিভনেস যদি সন্দেহের জায়গা নেয়, তা হলে সমস্যা আছে। নীলাঞ্জনার ওসব নেই।’

যীশুর গল্পে তার ফ্যামিলির একটা বড় প্রভাব রয়ে গেছে। না হলে সেই ২০০২ থেকে শুরু হওয়া জার্নিটা কখনো থিতু হতে পারেনি কোথাও। তবে এই থিতু হওয়া বা না হওয়ার দোলাচলে একটা কিছু কিন্তু যীশুর জীবনে থিতু হয়ে গিয়েছিলো তা হলো তার স্ত্রী নীলাঞ্জনা।

শুধু তো পরিবারের সাপোর্ট হলেই তো ফিনিক্স পাখির মতো হওয়া যায় না তার জন্য লাগে প্রচন্ড পরিশ্রম ও কাজের নিজের প্রতি ডেডিকেশন। এইতো এক যে ছিলো রাজা সিনেমার শ্যুটিং করছিলেন ইন্দো-নেপাল বর্ডারে। সেখানে শ্যুটের সময়ে টেমারেচার থাকতো মাইনাস ফাইভ। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন আমাদের জয়া আহসান।

কয়েকদিন আগে জয়া আহসানের সাথে কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন যীশুর ডেডিকেশনের লেভেল সম্পর্কে । জয়া আহসান বলেন, ‘যীশুদা এই সিনেমাতে যা করেছে, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না। তীব্র শীতের সময় এই সিনেমার শুটিং হয়েছিল। সিনেমাতে নারীদের দেখা যাবে শাড়ি পরা অবস্থায় কিন্তু শাড়ির ভেতরেও আমরা আরও যত গরম কাপড় পেঁচিয়ে পরা যায়, সেগুলো পরেছিলাম। এরপরেও শীতে কাঁপছিলাম বলতে গেলে! কিন্তু যীশুদা? ও মাই গড! একটা নেংটির মতো পাতলা জিনিস পরে এই শীতে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ওর মেকাপ চলত, আর সেটা উঠাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই তীব্র শীতে নদীর পানিতে সৃজিত যীশুকে বলছিল – পানিতে ডুব দে । দিতে থাক। একটাবারও মুখে একটা শব্দও করেনি যীশু এই শীতে। সৃজিতের শট ওকে না হওয়া পর্যন্ত জাস্ট একটা নেংটি পরে সে এই কনকনে ঠাণ্ডা পানিতে ডুব দিয়ে গেছে!’ এই হলো ডেডিকেশন।

এতো কিছুর পরও যীশুর মনে আগামী প্রজন্মের জন্য ভাবনা কাজ করে। বললেন, ‘আমাদের এখানে চার-পাঁচ জন হিরোর মধ্যেই কাজ ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে। একটা জিনিস খারাপ লাগে, আগামী প্রজন্মের মধ্যে অনির্বাণ (ভট্টাচার্য) ছাড়া আর কেউ সে ভাবে উঠে এল না। কাউকে দেখলামও না, অন্য কিছু করার চেষ্টা করছে বা করলে তাকে বাকিরা সাহায্য করছে। কিছু পরিচালক ভাল কাজ করছে সৌকর্য ঘোষাল, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। কিন্তু এদের কেউ সে ভাবে সুযোগ করে দিচ্ছে না।’

নিজের জীবন ক্যারিয়ার দিয়ে দিয়ে বুঝেছেন বলেই তার এই চিন্তা। কেনোনা তিনি ভালো করেই জানেন সুযোগ পাওয়াটা কত বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে চলচিত্র জগতে। হয়তো একারনেই ইন্ডাস্ট্রির প্রতি একটা আলাদা ক্ষোভ থাকবে সেতাই স্বাভাবিক।

তাই হয়তো বলেন, ‘খুব ফেজের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি । কত ধরনের চরিত্র করতে পারছি । একটা বিষয় আলাদা করে বলব, তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে আমি অভিভূত। পেশাদারিত্ব বলিউডে দেখেছি, কলকাতায় দেখেছি। তেলুগুতে অভিনেতাদের যে সম্মানটা দেওয়া হয়, তা আর কোথাও পাইনি। কলকাতায় তো আমি ঘর কী মুরগি ডাল বরাবর! তার কারণ অবশ্য আমি সকলের সঙ্গেই বন্ধুর মতো মিশি। তেলুগুতে আমি সুপারস্টার অব বেঙ্গল। চরিত্র ছোট-বড় যাই হোক না কেন, সবাইকে স্যর বলে ডাকে ওরা।’

এই যে একজন শিল্পী এতো পরিশ্রম, ডেডিকেশন সবই কি শুধু ফেইম, টাকা এইসবের জন্য? না তা নয় । প্রত্যেকেই চায় তার কাজের মূল্যায়ন হোক, তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়া হোক। শুধুমাত্র পারস্পারিক সম্মানবোধের জন্যই প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত ও প্রফেশনাল জীবন সুন্দর ভাবে ধরা দেয় আর সেটা যীশুর মতো প্রত্যেকের একান্ত কাম্য।

এতো সাপোর্ট আর নিজের হার্ড ওয়ার্ক ও ডেডিকেশনের জন্যই এতোদুর এসেছেন, ব্রাত্য হয়েছেন, অপয়া নামক উপাধি! পেয়েছেন, একটা সময় শুধু উপস্থাপনা করে গেছেন, সেখান থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে জেগে উঠেছেন শুধুমাত্র নিজের কাজকে ভালোবেসে গিয়েছেন বলে। তাই আজ ক্যারিয়ারের এতো বছর পর এসে হলেও সাফল্য ধরা দিয়েছে যীশুর আপন হাতে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।