দু:সময়ের বেড়াজালে বন্দী এককালের সুপারস্টার

২০০২ সাল। মৃতপ্রায় টালিউড কিংবা অশ্লীলতার জোয়ারে ভাসতে থাকা ঢালিউডের কারণে যখন দর্শক বাংলা সিনেমা বিমুখ। ঠিক তখনই মরা নদীতে জোয়ার আনলো হরনাথ চক্রবর্তীর সিনেমা ‘সাথী’। ছবিটি যে শুধু ব্লকব্লাষ্টার হয়েছিল তা নয়, বাংলা ছবির গানের ক্ষেত্রেও একটা মাইলফলক।

‘ও বন্ধু তুমি শুনতে কি পাও’-এর সৌজন্যে বাংলাদেশের মফস্বলের ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে ওপার কলকাতার জ্যামেও চলতে থাকল বাংলা ছবির গান।বাংলা ছবির গান আবার বাজতে লাগলো দুর্গাপূজায় কিংবা ঈদের আনন্দে। বাংলাদেশে সিডি বাজারজাত হবার পর, সিডি ক্যাসেটের দোকানে ভিড় লেগে গেল, সেই সুযোগে তাঁরাও দাম বাড়িয়ে দিল।

তাতে কি, অপেক্ষমান দর্শকরা তাও লুফে নিল। গান, গল্প, অভিনয়শিল্পী সব দিক দিয়েই নজর কাড়ল ছবিটি। ভারতীয় বাংলা এই ছবি দিয়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের একক রাজত্বে ভাগ বসাতে আসা এই অবাঙালি নায়ক হয়ে গেলেন পরবর্তীতে বাংলা ছবির মহাতারকা,ওপার বাংলার মত এপার বাংলায় ও সৃষ্টি হল অনেক ভক্ত। তিনি ভারতীয় বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক জিৎ।

পুরো নাম জিতেন্দ্র মদনানী। বড় পর্দায় জিৎ-এর অভিষেক অবশ্য হয়েছিল তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। যদিও ‘চান্দু’ নামের সেই সিনেমাটি বক্স অফিসে ‍মুখ থুবড়ে পড়ে।

সাথী সিনেমার পরপরই উপহার দিলেন ‘সঙ্গী’র মত আরেক সাড়া জাগানো সিনেমা। জিৎ=-এর সিনেমা মানেই তখন বাঙালি মনে অধীর আগ্রহের ছবি। ‘বন্ধন’, ‘শুভদৃষ্টি’, ‘সাত পাকে বাঁধা’র মত যেমন পারিবারিক সিনেমা করেছেন তেমনি ‘হিরো’, ‘ঘাতক’, ‘জো ‘ কিংবা ‘বস’-এর মত অ্যাকশনধর্মী সিনেমাও করেছেন। বাণিজ্যিক নায়ক হয়েও ভিন্নধর্মী ‘দুই পৃথিবী’র মত সিনেমা করেছেন।

বঙ্কিমবাবুর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ অবলম্বনে ‘পিতৃভূমি’র মত সিনেমাতেও নিজের প্রতিভা দেখিয়েছেন, ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার‘ সিনেমায় হয়েছেন অন্যতম প্রাণ। সিনেমায় আসার আগে ডিডি বাংলার জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘জননী’তেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে।

‘ও বন্ধু তুমি শুনতে কি পাও’ দিয়ে যে জনপ্রিয় গানের বিশাল সূচনা হয়েছিল সেটি পূর্ণতা পেয়েছে ‘কখনো যদি মাথায় ঘোমটা দিয়ে’, ‘সে ছিল বড় আনমনা’, ‘খুঁজেছি তোকে রাত বিরাতে’, ‘ভালো লাগে স্বপ্নকে’ কিংবা ‘হার্ন্ডেড পার্সেন্ট লাভ’, ‘মন মাঝিরে’র সুরের মোহনায়। কোয়েল মল্লিকের সঙ্গে জুটি বেঁধে উপহার দিয়েছেন বহু হিট ছবি। প্রিয়াঙ্কা, ঋতুপর্ণা, শ্রাবন্তী, শুভশ্রী থেকে বাংলাদেশের মিম, নুসরাত ফারিয়ার সঙ্গেও ছবি করেছেন।

জিতের জন্ম ১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর। এক সময় স্বস্তিকা মুখার্জীর সাথে সম্পর্ক থাকলেও এখন সব চুকেবুকে গেছে। ২০১১ সালে বিয়ে করেছেন লখনৌ’র স্কুল শিক্ষক মোহানা রাতলানিকে।  এই দম্পতির একমাত্র কন্যার নাম নবান্ন।

জিৎ আজ অবশ্য খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই রিমেক সিনেমা করে আসছেন, তবে গত কয়েক বছর ধরেই দূর্বল রিমেক নিয়ে বেশ সমালোচিত। বাংলাদেশের সাথেও যৌথ প্রযোজনা করে বাণিজ্যিক সফলতা পেয়েছিলেন বটে। তবে সেটাও এখন আর হচ্ছে না।

২০১৮ সালের ‘ইন্সপেক্টর নটিকে’, ‘সুলতান দর্শকদের ভীষণ হতাশ করেছে। সর্বশেষ মুক্তি পেয়েছে ‘বাঘ বন্দী খেলা’, যেটায় আরো অভিনয় করেছে প্রসেনজিৎ, সোহম। ব্যাপার হল, টালিগঞ্জে সময় ও চাহিদার সাথে মিল রেখে প্রসেনজিৎ কিংবা দেব নিজেদের বদলাতে পেরেছেন, অভিনয় ঘরানায়, সিনেমার জনরায় পরিবর্তন এনেছেন, জিৎ তেমনটা পারছেন না। ফলে, দর্শকদের আগ্রহও কমে যাচ্ছে তাঁর প্রতি। এই পর্যায়ে এসে চিরাচরিত রিমেকের দিকে না ঝুঁকে সুন্দর গল্পের সিনেমায় অভিনয় করলেই বরং ক্যারিয়ারটা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন তিনি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।