ওম পুরি: একজন ‘অসম্ভাব্য’ নায়ক

বলিউডে তিনি ছিলেন আইকনিক ও অভিজাত এক বুড়ো। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দর্শকদের বিনোদন দিয়ে গেছেন নানা রূপে। বলিউড, হলিউড, ব্রিটিশ-আমেরিকান সব ধরণের সিনেমাই করেছেন। ভাল সিনেমা, অনেক ভাল সিনেমা, মন্দ সিনেমা, তৃতীয় শ্রেণির সিনেমা – সবাই করেছেন তিনি। বলছি ওম পুরির কথা। তিনি যে মানের অভিনেতা ছিলেন, সেই মানটা আর এখনকারদের মধ্যে দেখা যায় না বললেই চলে।

ওম পুরির ব্যাপারে চমকে দেওয়া এক তথ্য হল তার সঠিক জন্ম তারিখটা কেউ জানে না। তাঁর মা শুধু বলেছিলেন, দশমীর দু’দিন বাদে তাঁর জন্ম হয়। পুরির পরিবার থাকতো পাঞ্জাবের আম্বালায়।

স্কুলে ভর্তির আনুষ্ঠানিকতার জন্য পুরির চাচা ১৯৫০ সালের নয় মার্চ তারিখটা বেছে নিয়েছিলেন। তবে, পুরি যখন যখন মুম্বাই চলে আসেন তখন তারিখটা দেন ১৮ অক্টোবর। কারণ তিনি নাকি ততদিনে ১৯৫০ সালের ক্যালেন্ডার ঘুটে দশমীর সময়টা জেনে নিয়েছিলেন।

পুরির শৈশবটা কেবল অর্থাভাবে কেটেছে বললে ভুল বলা হবে, আসলে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রতিটা মুহূর্ত। বাবা রাজেশ পুরি রেলওয়েতে চাকরি করতেন। কিন্তু, একবার সিমেন্ট চুরির মামলায় যেতে হল জেলে। ওই সময় পুরির বয়স ছয় কি সাত। পরিবারের থাকার জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে একটা চায়ের দোকানে কাজ নিলেন। কখনো ধাবায় কাজ করেছেন, কখনা রেলওয়েয় কয়লা বিক্রি করেছেন – দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের জন্য কি না করেছেন।

ইতিবাচক ব্যাপার হল, এত কিছুর পরও কখনো পড়াশোনা বন্ধ করেননি পুরি। প্রাথমিক শিক্ষার পরই তিনি যোগ দেন দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে। এখানে তাঁর পরিচয় হয় নাসিরুদ্দিন শাহ’র সাথে। হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব। কালক্রমে এই দুই বন্ধু মিলে একটা সময় রাজত্ব শুরু করেন সিনেমার দুনিয়ায়। উপমহাদেশের ইতিহাস সেরা অভিনেতাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করলে এই দু’জনের নাম আসতে বাধ্য।

পুরি-নাসিরুদ্দিনের বন্ধুত্ব নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। একবার নাকি এক রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সারছিলেন দুই বন্ধু। ওই সময় নাসিরুদ্দিনের এক ব্যাচমেট জাসপাল এসে মাথায় একটা লাঠি দিয়ে আঘাত করে বসেন। রুখে দাঁড়ান পুরি। মারামারি কাটাকাটির পর জাসপাল চলে যান। ওইদিনটাই পুরি না থাকলে হয়তো জীবনটাই হুমকির মুখে পড়তো নাসিরুদ্দিনের।

নাসিরুদ্দিনের অনুপ্রেরণায় পুরি পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ায় ভর্তির ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। যদিও, ভর্তির জন্য ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে নাকাল হতে হয়েছিল পুরিকে। একজন তাঁকে দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি দেখতে হিরোদের মত নও, ভিলেন হিসেবেও তোমাকে মানায় না, কমেডিয়ান হিসেবেও তোমাকে চালানো যাবে না, ইন্ডাস্ট্রি তোমাকে দিয়ে করবেটা কি!’

তবে, সে যাত্রায় টিকে যান পুরি। পরে ইন্ডাস্ট্রিকে তিনি কি দিয়েছেন সেটা বোধকরি সবারই জানা। পরপর দু’বছর (১৯৮২ ও ১৯৮৩) সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে যাওয়া তো আর চাট্টিখানি ব্যাপার নয়।

 

পুনের ফিল্ম ইন্সটিটিউটে প্রথম ক’টা দিন মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল পুরির। কারণ, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন বলে তাঁর হাতে তেমন টাকা-পয়সা থাকতো না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ওই সময় আমার পরিবার এতটাই গরিব ছিল না, ইন্সটিটিউটে পরে যাওয়ার মত ভাল একটা শার্ট আমার ছিল না!’

ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পুরির রুম মেট কে ছিলেন শুনলে আকাশ থেকে পড়বেন! তিনি হলেন বলিউডের বিখ্যাত পরিচালক ডেভিড ধাওয়ান। নিজের সিনেমার ঘরানার মত ধাওয়ান ওই সময়ও ছিলেন বেশ রসিক মানুষ। কিন্তু, এত ‘রস’ পুরির সহ্য হত না। তিনি বাধ্য হয়ে রুম পাল্টে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছিলেন।

পুরি প্রায়ই ইন্সটিটিউটের টিউশন ফি দিতে পারতেন না। যখন খ্যাতিমান হয়ে গিয়েছিলেন, তখন ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে তাকে ২৮০ রুপি বাকি আছে বলে একটা নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। সেই দেনাটা অবশ্য তখন সামর্থ্য থাকার পরও পরিশোধ করেননি তিনি। কারণ, স্বয়ং পুনে ফিল্ম ইন্সটিউটিটে টিউশন ফি ‘বাকি’ রাখতে পারাটা তাঁর কাছে রোমাঞ্চকর একটা ব্যাপার ছিল।

রুপালি পর্দায় ওম পুরির অভিষেক হয় ১৯৭৬ সালে। মারাঠি ভাষায় সিনেমাটির নাম ছিলেন ‘ঘাসিরাম কোতওয়াল’। ওম পুরির ক্যারিয়ারে সবচেয়ে স্মরণীয় সিনেমা নি:সন্দেহে ১৯৮২ সালের ‘অর্ধ সত্য’। প্রতাপশালী পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তিনি দারুণ অভিনয় করেছিলেন। যদিও পরিচালক গোবিন্দ নিহালিনী প্রথমে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নিয়েছিলেন বিগ বি খ্যাত অমিতাভ বচ্চনকে।

তবে, কোনো ভাবেই শাহেনশাহ’র শিডিউল পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই পরে সুপারস্টারের আশা বাদ দিয়ে ওম পুরিকে নেন। ওম পুরি কেবল পরিচালকের আস্থাই জিতেননি, জিতেছিলেন দর্শকদের মনও। সিনেমাটি ব্যবসায়িক ভাবে দারুণ সাফল্য পায়।

পুরি অবশ্য ক্যারিয়ারে নিজের টার্নিং পয়েন্ট মানেন ‘গান্ধী’কে। হলিউডের এই সিনেমাটি অস্কারের ১১ টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে আটটিতেই জিতে। সিনেমাটিতে অল্প কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত ছিলেন পুরি। অথচ, তার মনে এটাই তার ব্যাপারে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে দেয়। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘গান্ধীতে আমি দেড় মিনিটের মত স্ক্রিনে ছিলেন। তবে, এই ছোট্ট চরিত্রটা আমার পেশাদার জীবনে দারুণ ভূমিকা রাখে। এটা আমি বিশ্বাস করি, কারণ অস্কারের অনুষ্ঠানে আমার অভিনয়ের ‍ওই ফুটেজটুকু দেখানো হয়েছিল। এটা ছিল আমার জন্য বিশাল সম্মানের ব্যাপার।’

স্টিফেন হপকিন্সের সিনেমা দ্য ঘোস্ট অ্যান্ড দ্য ডার্কনেস (১৯৯৬)

ওম পুরি ছিলেন পরিশ্রমী এক অভিনেতা। ১৯৯২ সালের সিনেমা ‘সিটি অব জয়’-এ তিনি ছিলেন একজন রিকশাচালকের চরিত্রে। এই চরিত্র করার জন্য তিনি দু’জন রিকশাচালকের কাছে থেকে রিকশাচালনা শিখেন। ঢাকার রিকশা নয় কিন্তু, কলকাতার টানা রিকশা। এখানেই শেষ নয়, নিয়ম করে খালি পায়ে রাস্তায় দৌঁড়ানোও শুরু করেন। কারণ অধিকাংশ রিকশাচালকই তখন পায়ে স্যান্ডেল-ট্যান্ডেল পরার মত সামর্থ্যবান ছিলেন না।

ওম পুরি জীবদ্দশায় মুম্বাইয়ের একটা অভিনয়ের স্কুলে ক্লাস নিতেন। সেখানে তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য হলেন অনিল কাপুর ও গুলশান গ্রোভার। ১৯৯০ সালে পুরি ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রীতে ভূষিত হন। ২০০৪ সালে তিনি ব্রিটিশ সম্মাননা ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’-এর সম্মানজনক অফিসারের মর্যাদা পান।

তার প্রসঙ্গে একটা ভুল না ভাঙলেই নয়। অনেকে মনে করেন আরেক প্রয়াত ও কিংবদন্তিতুল্য অভিনেত অমরেশ পুরির সাথে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক আছে। আসলে তা নয়। দু’জনের মধ্যে পারিবারিক কোনো সম্পর্ক নেই। কাকতালীয় ভাবে তাঁরা দু’জন একই পদবীর অধিকারী।

১৯৯১ সালে তিনি বিয়ে করেন অভিনেতা অনু কাপুরের বোন সীমা কাপুরকে। যদিও সেই সংসার আট মাসের বেশি টেকেনি। ১৯৯২ সালে বিয়ে করেন সাংবাদিক নন্দিতা পুরিকে। এই দম্পতির ইশান নামের একটি ছেলেও আছে।

টম হ্যাঙ্কসের সাথে চার্লি উইলসন্স ওয়ার (২০০৭) সিনেমায়

নন্দিতার সাথে বিচ্ছেদ না হলেও শেষ দিকে আলাদা থাকতেন। টানাপোড়েন ছিল। ২০০৯ সালে নন্দিতা স্বামীর বায়োগ্রাফি লেখেন। ‘আনলাইকলি হিরো: দ্য স্টোরি অব পুরি’ বইটা প্রকাশের সাথে সাথে ক্ষেপে যান পুরি। কারণ, সেখানে জীবনের আগের সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে খোলামেলা লেখা হয়েছিল। পুরি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটাকে সবার সামনে আনতে চাননি।

এখান থেকে দু’জনের মতভেদ শুরু হয়। ২০১৩ সালে নন্দিতা তাঁর স্বামী পুরির বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনে আলাদা থাকার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চান। আদালত সেই অনুমতির আবেদন মঞ্জুর করে।

উলফ (১৯৯৪)

এখান থেকে শুরু হয় পুরির একাকী জীবন। শেষ বয়সটাতে একদম ছন্নছাড়া জীবন যাপন করেছেন। কাজ ছাড়া বাকিটা সময় কখনো রান্না করতেন, কখনো বা বাগানে কাজ করতেন। এই ছিল পুরির জীবন।২০১৭ সালের গোড়ায় হুট করেই চলে যান জীবন নদীর ওপারে।

এর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় ভারতীয় সিনেমার একটি বর্নাঢ্য অধ্যায়ের। তিনি যে জায়গাটা রেখে গেছেন, সেটা নি:সন্দেহে অপূরণীয়!

পোসটোস্ট অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।