জানা কাহিনীর অজানা সিনেমা

প্রথমত আমি দেবী নিয়ে সিনেমা তৈরির সংবাদ শোনার পর একটু হলেও অখুশি হয়েছিলাম। সত্যি বলতে একটু না অনেকটাই। তার কারণ দুনিয়াতে কি গল্পের অভাব পড়েছে যে আমার তিনবার পড়া একটা বই নিয়ে সিনেমা বানাতে হবে?

হলে গিয়ে নতুন আর কি দেখবো! তারপরও ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখলাম। এবং আমিই বোধহয় একমাত্র মানুষ যে চঞ্চয়, জয়া বা হুমায়ূন আহমেদ নয়, সিনেমাটা দেখতে গিয়েছি শবনম ফারিয়ার জন্য। ক্রাশের প্রথম সিনেমা বলে কথা। এবং সিনেমা দেখতে বসেছিলাম সত্যি বলতে ফেসবুকে এর খুঁটিনাটি সমালোচনা করে একটা রিভিউ লেখার জন্য।

কিন্তু, হল থেকে বের হয়ে যখন বাইরের তীব্র আলো চোখে লেগে চোখ বন্ধ হয়ে যায় তখন আমি দেবী সিনেমার একজন পুরোপুরি ভক্ত। বন্ধুদেরকে বলতে পারি যাও দেবী দেখে আসো। ভালো লাগবে। হুমায়ূন আহমেদ যে উপন্যাসের মাধ্যমে মিসির আলী নামের অতি জনপ্রিয় একজন বুদ্ধিমান মানুষের সৃষ্টি করেছিলেন, এই সিনেমা দেখে একবারও মনে হবেনা উপন্যাসটাই ভালো ছিলো।

জানা কাহিনীর ভেতর অজানা একটা সিনেমা দেখতে পাবেন আপনি। দেবীর পরিচালক অনম বিশ্বাস যে আয়নাবাজীর চিত্রনাট্যকার সেটা বোঝা যাবে। গল্প বলার ধরন, দৃশ্যায়ন, দর্শককে গল্পে ডুবিয়ে রাখার ক্ষমতা, চরিত্রদেরকে নিজ হাতে পরিচালনা করা; এই সবকিছুতেই অনম বিশ্বাস অনন্য। দেবী দেখার পর থেকে শুধুমাত্র কোনো সিনেমার সাথে অনম বিশ্বাস নামটা থাকলেই আমি নিশ্চিন্তে ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো হলে গিয়ে বসবো।

দেবী উপন্যাস কখনোই হরর গল্প ছিলো না। কিন্তু পরিচালক সিনেমায় হরর আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন যেটা সেটা সত্যিই মনোমুগ্ধকর ছিলো। কারনটা হলে বসলেই আপনি টের পাবেন। হরর আবহটা ছাড়া সিনেমাটা সত্যিই পূর্ণতা পেত না। জয়া আহসান বা রানু যে কি পরিমান মানসিক অস্থিরতা ও ভয়ের মধ্যে আছে সেটা পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা গেছে।

জয়ার মানসিক চাপ হলে বসে আমরাও অনুভব করতে পেরেছি। এর পেছনে পরিচালকের সাথে সাথে ক্রেডিট অভিনেত্রী জয়া আহসানেরও অবশ্যই। এবং তিনি যে ওভিনয় জিনিসটা ভালো পারেন সেটা সেই ‘আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসেন’ নাটকের সময় থেকেই প্রমাণিত। দেবী সিনেমা দেখে নতুন করে এই জিনিস আবিস্কার করার কিছু নেই।

জবড়জং মেকাপহীন একদম সাদামাটা ভয়ার্ত মুখের সহজ সরল জয়া আহসান পুরোপুরি রানু হতে পেরেছেন। দশে দশ। আর চঞ্চল চৌধুরীকেও নিয়ে আসলে কিছু বলার নেই। তিনি মেথড এক্টর। তিনি মিসির আলী ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা না করে নিজেই মিসির আলী হয়ে গেছেন। সুতরাং বয়স কত, দেখতে কেমন, চুলের স্টাইল কি ছিলো মিসির আলীর, এসব ফ্যাক্ট নেই আর। চঞ্চল চৌধুরী মিসির আলী হয়ে গেছেন দিনশেষে এটাই সত্যি।

অনিমেষ আইচ যদিও সিনেমায় অতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না তারপরও উনাকে আমার অতো পারফেক্ট লাগেনি। কেন তার কারন জানিনা। বই পড়ার সময় রানুর স্বামীর চরিত্রে আমি হয়তো অন্যরকম কাউকে কল্পনা করেছিলাম। তবে ইরেশ জাকের ঠিকঠাক ছিলো। চেহারাটাই তো সাইকো সাইকো। আর শবনম ফারিয়ার কথা কি বলবো! ভাল লেগেছে।

সবশেষে স্পয়লার না দিয়ে যে কথাটা বলতে হয় সেটা হলো শেষটা একটু দ্রুত শেষ হয়েছে বলে মনে হলো। তবে পরিচালক রহস্য সম্পর্কে আমাদের যেটা বুঝিয়েছেন সেটা আমরা বিশ্বাস করেছি। মনে হয়নি যে এটা না হয়ে অন্যরকম হতো ভালো হতো। মনে হইছে রহস্যময় পৃথিবীতে সবকিছুর ব্যাখা থাকবে না এটাই সত্যি। সবকিছুর ব্যাখ্যা খুজতে যাওয়া বরং বোকামি। এই বিশ্বাসটা আমাদের মনে সৃষ্টি করতে পারাই দেবী সিনেমার সফলতা।

আরেকটা কথা বলতে চাই সেটা হলো দেবীর মত সিনেমাকে উৎসাহ দিন, দেখতে যান, হিট করুন। তাহলে জয়া আহসান আবারো অন্য একটা সিনেমায় টাকা ঢালার সাহস পাবে। আমরা দেবীর মত বা আরো ভালো কিছু পাবো। প্রডিউসার পাবে এরকম ভিন্নধারার সিনেমাগুলো। যেটা দিনশেষে আমাদের বাংলা সিনেমার জন্যই সুফল বয়ে আনবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।